সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর এ্যালিবাই ডিফেন্সঃ কিছু আইনী পর্যবেক্ষণ

0
570

প্রাথমিক বক্তব্যঃ  আপনারা সকলেই অবগত রয়েছেন যে মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে নানাবিধ আন্তর্জাতিক অপরাধ সংগঠনের প্রেক্ষিতে একটি মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল বাংলাদেশ-১ এ আসামী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে [সাকাচৌ] ৪ টি অপরাধে মৃত্যুদন্ড ও আরো ৫ টি অপরাধের প্রেক্ষিতে নানাবিধ সময়কালীন সাজা দেয়া হয় ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর।

আপনারা এও জেনে থাকবেন যে গত ২৯ শে জুলাই ২০১৫ তে ট্রাইবুনালের সেই রায়ের প্রেক্ষিতে যে আপীল করা হয়েছিলো বাংলাদেশ সূপ্রীম কোর্টের আপীলেট বিভাগে, সেখানেও আপীলেট ডিভিশান সাকাচৌ এর মৃত্যুদন্ড বহাল রাখেন এবং বাকি অপরাধে সাজাগুলোও প্রধানত একই রাখেন শুধু একটি অভিযোগ ছাড়া।

এই ট্রাইবুনালে কারো রায় হয়ে যাবার ঠিক পর পর কোনো এক অদ্ভুত কারনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সৌজন্যে আমরা প্রতিবারই এইসব অভিযুক্তদের পক্ষে নানান প্রচারণা দেখতে পাই। এসব প্রচারণাগুলো যেমন একদিক থেকে বিভ্রান্তিমূলক ঠিক তেমনি আইনী দৃষ্টিকোন থেকে হাস্যকরও বটে। উদাহরন স্বরূপ বলা যেতে পারে কাদের মোল্লার ফাঁসীর পর চারিদিকে একটি কথা চাউর হয়েছিলো যে, এই কাদের মোল্লা আসলে সেই কাদের মোল্লা নয় (মানে একাত্তরের খুন করা কাদের মোল্লা আর ফাঁসী প্রাপ্ত কাদের মোল্লা এক নয়। ভুল ব্যাক্তিকে সাজা দেয়া হয়েছে), কামারুজ্জামানের ফাঁসীর পর চাউর হোলো যে সে নাকি একাত্তর সালে নবীন ছাত্র ছিলো। কম বয়সী এমন কিশোর কি করে অমন খুন করতে পারে ইত্যাদি।

এসবের সূত্র ধরেই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রায়ের পর যে গুজব গুলো উঠেছে সেটির মোদ্দা কথা হচ্ছে, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (সাকাচৌ) একাত্তর সালের ২৯ শে মার্চ থেকেই পাকিস্তানের করাচিতে, লাহোরে ছিলো বলে তার সাক্ষীরা বলেছে সুতরাং সে আসলে নির্দোষ। তাকে ফাঁসানো হয়েছে রাজনৈতিক আক্রোশে।

এই কথা বলতে গিয়ে যে সূত্র গুলো থেকে রেফারেন্স দেয়া হচ্ছে সেগুলো তো আরো দু’কাঠি সরেশ। সেখানে বলা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান সাকাচৌ এর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছে (যদিও দেয়নি কিন্তু দেবার কথা ছিলো), বিচারপতি শামীম হাসনাইন সাক্ষ্য দেবার জন্য প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করে চিঠি লিখেছিলেন সেটা কেন য়াদালত গ্রহন করেনি, কাইয়ুম রেজা চৌধুরী যিনি আওয়ামীলীগের টিকেটে দুইবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছেন তিনি পর্যন্ত সাকাচৌ এর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন সাকা সে সময় পাকিস্তানে ছিলো, তিনি খোদ নিজে ২৯ শে মার্চে সাকাকে প্লেনে তুলে দিয়েছেন এই বলে কিংবা পাকিস্তান থেকে সাকাচৌ এর পক্ষে গোটা ছয়েক ব্যক্তি লিখিত সাক্ষ্য এফিডেভিট করে পর্যন্ত পাঠিয়েছে এটা নিশ্চিত করে যে সাকাচৌ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানেই ছিলো।

সুতরাং একদিকে এসব প্রশ্ন উত্থাপন করে এই বিচারের একটা সময় পুরো পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করে ফায়দা তোলা হচ্ছে আবার অন্যদিকে সাধারন মানুষকেও একটা বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দেয়া হচ্ছে। দু’দিন আগেও যিনি সাকাচৌকে রাজাকার ভাবতেন তিনি এসব পড়ে বা শুনতে পেয়ে খানিকটা হকচকিত হয়ে বিভ্রান্ত হয়ে গেছেন কিংবা সংশয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এই বলে যে, আসলেই কি সাকা তার বিরুদ্ধে আসা এসব উত্থাপিত অপরাধের সাথে জড়িত ছিলো?

এই পু্রো বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং এসব প্রশ্ন উত্থাপনের এমন পর্যায়ে এসেই আসলে আজকে আমার এই সুনির্দিষ্ট লেখাটির সূচনা। আমি এই লেখার মাধ্যমে আইনী দৃষ্টিকোন থেকেই এইসব উত্থাপিত বিভ্রান্তিগুলোর জবাব দিতে আগ্রহী।

সাকাচৌ এর বিরুদ্ধে আসা অভিযোগগুলো (যেগুলোতে সাকাচৌ এর শাস্তি হয়েছে) এবং সেটির প্রেক্ষিতে আদালতের রায়েরএকটি সিনোপসিসঃ

11813475_961856167191452_5124800274053792094_n

২ নম্বর অভিযোগ (প্রমাণিত) : প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আনা ২ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৬টার দিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে পাকিস্তানি সৈন্যরা চট্টগ্রামের রাউজানের গহিরা গ্রামে হিন্দু অধ্যুষিত পাড়ায় অভিযান চালিয়ে ওই এলাকার শতাধিক ব্যক্তিকে হিন্দু ডাক্তার মাখন লাল শর্মার বাড়িতে জড়ো করেন। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাকিস্তানি সৈন্যরা সেখানে তাঁদের ব্রাশফায়ার করে হত্যা করেন। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে ২০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

৩ নম্বর অভিযোগ (প্রমাণিত) : প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আনা ৩ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নির্দেশে পাকিস্তানি সৈন্যরা রাউজানের গহিরা শ্রী কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মালিক নূতন চন্দ্র সিংহকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এ সময় নিজে নূতন চন্দ্র সিংহকে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সাকাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

৪ নম্বর অভিযোগ (প্রমাণিত) : প্রসিকিউশনের ৪ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে নিয়ে হিন্দু অধ্যুষিত জগৎমল্লপাড়ায় অভিযান চালান। এ সময় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর দুই সহযোগীর ডাকে সেখানকার হিন্দু নর-নারী কিরণ বিকাশ চৌধুরীর বাড়ির আঙিনায় জড়ো হয়। সেখানে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে তাঁদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। এতে ৩২ জন নারী-পুরুষ মারা যান। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে ২০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

৫ নম্বর অভিযোগ (প্রমাণিত) : প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আনা পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল দুপুর ১টার দিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তাঁর অনুসারীদের নিয়ে চট্টগ্রাম জেলার রাউজানের সুলতানপুর গ্রামে হামলা চালান। সেনাসদস্যরা বণিকপাড়ায় প্রবেশ করে ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত হয়ে অভিযান চালিয়ে নেপাল চন্দ্র ধর, মনীন্দ্র লাল ধর, উপেন্দ্র লাল ধর ও অনিল বরণ ধরকে গুলি করে। এতে প্রথম তিনজন শহীদ ও শেষের জন আহত হন। হত্যাকাণ্ড শেষে বাড়িঘরে আগুন দিয়ে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তাঁর বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরী তাঁদের অনুসারী ও পাকিস্তানি সৈন্যদের নিয়ে সুলতানপুর গ্রাম ত্যাগ করেন। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

৬ নম্বর অভিযোগ (প্রমাণিত) : এ অভিযোগে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধকালীন ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল বিকেল ৪টায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে রাউজানের ঊনসত্তরপাড়ায় ক্ষীতিশ মহাজনের বাড়ির পেছনে পুকুরপাড়ে শান্তি মিটিংয়ের নামে হিন্দু নর-নারীদের একত্রিত করে পাকিস্তানি সৈন্যরা ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

৮ নম্বর অভিযোগ (প্রমাণিত) : এ অভিযোগে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধকালীন ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মোজাফফর আহম্মদ ও তাঁর ছেলে শেখ আলমগীরসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্য প্রাইভেটকারযোগে চট্টগ্রামের রাউজান থেকে চট্টগ্রামে শহরে আসছিলেন। পথে হাটহাজারী থানার খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি তিন রাস্তার মোড়ে পৌঁছামাত্র সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে থাকা পাকিস্তানি সৈন্যরা শেখ মোজাফফর আহম্মেদ ও তাঁর ছেলে শেখ আলমগীরকে গাড়ি থেকে নামিয়ে স্থানীয় পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাঁদের আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

১৭ নম্বর অভিযোগ (প্রমাণিত) : ১৯৭১ সালের ৫ জুলাই সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম জেলার কোতোয়ালি থানার হাজারী লেনের জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর পোড়োবাড়ী থেকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নিজাম উদ্দিন আহম্মেদ, সিরাজ ও ওয়াহেদ ওরফে ঝুনু পাগলাকে অপহরণ করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর গুডসহিলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দেড় ঘণ্টা তাঁদের শারীরিক নির্যাতন করা হয়। পরে ওই দিন রাত ১১/১২টার দিকে নিজাম উদ্দিন ও সিরাজকে চট্টগ্রাম কারাগারে নিয়ে গিয়ে কারারুদ্ধ করা হয়। সেখানে তাঁরা দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত বন্দি ছিলেন। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

১৮ নম্বর অভিযোগ (প্রমাণিত) : ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে তৃতীয় সপ্তাহে একদিন ভোর সাড়ে ৫টার দিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীর অনুসারীরা চট্টগ্রাম জেলার চান্দগাঁও থানার মোহারা গ্রামে আবদুল মোতালেব চৌধুরীর বাড়িতে যান। সেখানে গিয়ে তাঁরা সালেহ উদ্দিনকে অপহরণ করেন। এর পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গাড়িতে নিয়ে তাঁকে গুডসহিল নির্যাতন সেলে নেওয়া হয়। সেখানে বাড়ির বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে থাকা সাকা চৌধুরীর বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরী এবং ছোট ভাই গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন। ওই সময় সালেহ উদ্দিনকে উদ্দেশ করে ফজলুল কাদের চৌধুরী জানতে চান, তিনি সালেহ উদ্দিন কি না? এ সময় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এগিয়ে গিয়ে সালেহ উদ্দিনের বাঁ গালে সজোরে একটি চড় মারেন। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

9a91e8afb0f1186e5b0fef196bd9dce4-33

ছবি সূত্রঃ প্রথম আলো

সাকাচৌ এর বিচার পরবর্তী কি কি বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে?

সাকাচৌ এর রায় পরবর্তী যে গুজব, প্রশ্ন কিংবা বিভ্রান্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা ব্লগে ছড়িয়েছে সেগুলো সব গুলোকে এক সাথে করে কংক্রীট একটা অবস্থানে দাঁড় করানোটা কষ্টসাধ্য কাজ। নানা মুনির নানা মত এক সাথে করে সংক্ষেপ করবার মত মুনি আমি নই। তবে ডেভিড বার্গম্যান যে বিভ্রান্তি গুলো তৈরী করেছেন তার ব্লগে কিংবা সেসবের সূত্র ধরে আরো যারা এইসব বিভ্রান্তিকে চারিদিকে ছড়িয়েছেন তাদের উদ্দেশ্য সৎ নাকি অসৎ এই বিবেচনায় আমি আজ যেতে চাইব না বরং এসব নানাবিধ বিভ্রান্তমূলক প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তর গুলোর ফলে যদি কারও বোধগম্য হয় কিংবা বুঝবার পরিবেশ তৈরী হয় আমি তাতেই আসলে অধিক আনন্দিত হব।

যাই হোক, সাকাচৌ এর বিচার পরবর্তী সেসব উল্লেখ্য গুজব কিংবা প্রশ্নের একটা কংক্রীট সংকলন পেলাম ফেসবুকের একটা পেজের মাধ্যমে। আমি সেসবই নীচে তুলে দিচ্ছি-

১/ কেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ২৯ মার্চ করাচী যাত্রা এবং সেখানে অবস্থানের পক্ষে দেয়া তার প্রমানকে আমলে নেয়া হয়নি?

২/ কেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে মাত্র ৫জনের বেশি সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপনের সুযোগ দেয়া হয়নি? যেখানে রাষ্ট্রপক্ষের ৪১জন সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপনের সুযোগ দেয়া হয়েছে।

৩/ আদালতে সাক্ষী উপস্থাপনের সুযোগ না পাওয়ায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবীরা ছয়জন সাক্ষীর এফিডেবিট আদালতে উপস্থাপন করেছিলেন, যারা নিশ্চিত করেছেন যে যুদ্ধচলাকালীন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন। সেই এফিডেবিটগুলোকে ট্রাইবুনাল খারিজ করে দেয়নি, কিন্তু যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি এই অযুহাতে সেগুলো আমলে নেয়নি। কেন?

৪/ করাচীতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সাথে নিয়মিত দেখা সাক্ষাৎ করা বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাগরিক সালমান এফ রহমান এবং বিচারপতি শামিম হাসনাইনের সাক্ষ্য কেন গ্রহণ করা হয়নি, যেখানে ছয়জন সাক্ষী বলেছেন যে তারা করাচীতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন?

উপরের এই প্রশ্নগুলো ছাড়াও আমি সালাউদ্দিনের এই বিচার বিষয়ক, পার্টিকুলারলি তার সে সময় বাংলাদেশে না থাকা বিষয়ক দাবীর প্রেক্ষিতে আরো কিছু অবজার্ভেশন দেবার চেষ্টা করব।

উত্থাপিত গুজব, প্রশ্ন ও বিভ্রান্তির প্রেক্ষিতে আমার উত্তরঃ

আমার লেখার এই সুনির্দিষ্ট অংশটি এই লেখার মূল অংশ তা বলা বাহুল্য। লেখা শুরু করবার আগে একটি অনুরোধ আমি আমার সম্মানিত পাঠক ও পাঠিকাদের প্রতি করব যে, সাকাচৌ এর বিচার একটি আইনী প্রক্রিয়া। এখানে আসলে সাধারন সামাজিক জীবনের আবেগ, অনুযোগ বা কৌতূহলের রেশ ধরে বিচার করতে চাইলে আপনি সব সময়ই বিভ্রান্ত হবেন। যে কোনো বিচারের প্রাপ্ত ফলাফলকে যখন আপনি আইনী কাঠামোতে বিশ্লেষন করবেন তখন এর কাঠামো বা আইনী প্রক্রিয়াগুলো আপনার কাছে বোধ্য হয়ে উঠবে। যে ব্যাপারটিতে আপনি আপনার সাধারন জ্ঞানে কৌতুহলী হচ্ছেন দেখা যাবে আইনী আদলে চিন্তা করতে পারলে সেই ঘটনার আইনী ফলাফল টি আপনার কাছে মূর্ত হয়ে উঠবে ও সহজবোধ্য হবে।

একটা উদাহরন দিয়ে আমি ব্যাপারটা বোঝাই। আপনারা প্রায়ই সিনেমা বা টিভিতে দেখে থাকবেন যে নায়কের ফাঁসী হয়ে যাচ্ছে আর ঠিক একেবারে শেষ মুহূর্তে কেউ একজন এমন একটা প্রমান বা এমন কিছু নিয়ে হাজির হয়ে যাচ্ছেন যেটির ফলে সে ব্যাক্তির আর ফাঁসী হচ্ছেনা বা সে বেঁচে যাচ্ছে। সিনেমাতে এইসব নাটকীয় ব্যাপারগুলো ভালো লাগে। দর্শক হিসেবে আপনি হাত তালি দেন। কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটি ভিন্ন। বাস্তবে যদি কোনো ব্যাক্তির ফাঁসীর হুকুম হয় তবে সেটির প্রেক্ষিতে যদি কেউ কোনো পালটা নতুন প্রমাণ হাজির করতে চান যেখানে সম্ভাবনা রয়েছে এই প্রমাণ দাখিলের পর ব্যাক্তির ফাঁসী রহিত হবে তবে সেই প্রমাণ দাখিলেরও সুনির্দিষ্ট ও যথাযথ একটা নিয়ম রয়েছে, একটা প্রক্রিয়া রয়েছে। ধুম করে আপনি আদালতের দরজা দিয়ে ঢুকলেন আর ইয়া আলী বলে ঝাঁপিয়ে নায়ককে মুক্ত করে আনলেন, ব্যাপারটি একেবারেই তা নয়। সুতরাং আপনি এই জাতীয় বিচার বা তার প্রক্রিয়া বুঝতে গেলে যদি “সত্যের মৃত্যু নেই” জাতীয় চলচ্চিত্র মনে মনে স্বরণ করতে থাকেন তবে আগেই বলে রাখি যে, এই বিচার নিয়ে চিন্তা করাটা আপনার জন্য কেবল সময় নষ্ট। পুরো ব্যাপারটি আপনার জন্য দূর্বোধ্য থেকে দূর্বোধ্যতর হয়ে উঠবে ক্রমশ।

যাই হোক, মূল প্রসঙ্গে আসি।

শিরোনামে আপনারা দেখছেন যে আমি একটি শব্দ ব্যবহার করেছি “এ্যালিবাই ডিফেন্স” বলে। প্রথমেই আমরা জানব এই “এ্যালিবাই ডিফেন্স” ব্যাপারটি আসলে কি? এই ডিফেন্সের একেবারে আভিধানিক মানে লেখা যায় এই ভাবে-

“An alibi is a form of defence used in criminal procedure wherein the accused attempts to prove that he or she was in some other place at the time the alleged offense was committed”[সূত্রঃ১]

সহজ মানে দাঁড়ালো এমন যে একজন ব্যাক্তি যার বিরুদ্ধে এক বা একাধিক অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে এবং সে ব্যাক্তি সে অভিযোগের প্রেক্ষিতে দাবী করছে যে, সে সেই অপরাধের সংগঠনের সময় সেখানে ছিলোই না।

সাকচৌ তার অভিযোগের প্রেক্ষিতে জবাব দিতে গিয়ে ডিফেন্স হিসেবে ঠিক এই দাবীই মূলত করেছে। সাকাচৌ প্রমাণ করতে চেয়েছে যে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যে অপরাধ সংগঠিত হয়েছে এবং সে প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে সেটি সত্য নয় কেননা ১৯৭১ সালের ২৯ শে মার্চ তারিখেই সে বাংলাদেশ ছেড়ে পাকিস্তানের লাহোরের পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটিতে পড়ালেখা করতে চলে যায় সুতরাং এর পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে কোনো আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগ আনা যাবে না কেননা অপরাধ সংগঠনের সময় সে সেখানে ছিলোইনা।

আমরা লেখার এই পর্যায়ে এসে চলুন আগে একটু দেখে নেই এই “এ্যালিবাই ডিফেন্স” সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আইন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত রুলস এন্ড প্রসিজিওর এই ব্যাপারে কি বলছে। রুলস এন্ড প্রসিজিওরের ৫১ নাম্বার অনুচ্ছেদে যদি আমারা যাই তাহলে সেখানে লেখা রয়েছে-

51. (1) The onus of proof as to the plea of ‘alibi’ or to any particular fact or information which is in the possession or knowledge of the defence shall be upon the defence. 

(2) The defence shall also prove the documents and materials to be produced by them in accordance with the provisions of section 9(5) of the Act.

[3)  Mere failure to prove the plea of alibi and or the documents and materials by the defence shall not render the accused guilty. 

আবার ট্রাইবুনাল-১ সাকাচৌ এর ব্যাপারে যে রায় দিয়েছেন সেখানের ২৪৭ নাম্বার প্যারাতে  বলা রয়েছে-

  1. The accused is required to prove the following issues as to prove plea of alibi:

(1)Onus is entirely on the accused to prove the plea of alibi.

(2)The defence is to prove affirmatively that during the War of Liberation in 1971 the accused was continuously staying in West Pakistan since 29 March to 16 December, 1971.

(3)The defence is to prove that the accused was not present in Bangladesh in 1971, at the time when the occurrences took place in Chittagong.

উপরের এই দুইটি রেফারেন্স যদি আমি এখন একসাথে প্রয়োগ করে বর্ণনা করি তাহলে এটির মূল সারাংশ যেটি দাঁড়াবে সেটি হচ্ছে,

(১) সাকাচৌ এর উপরেই মূলত দায় বর্তায় প্রমাণ করবার ব্যাপারটি যে ১৯৭১ সালে সংগঠিত যে যে অভিযোগ ও যে যে সময়ের কথা বলা রয়েছে তার পুরোটা সময় জুড়েই নিরবিচ্ছিন্নভাবে সাকা সেখানে ছিলোনা এমনটা প্রমাণ করতে হবে। মানে, সাকা যে বলেছে সে ২৯ শে মার্চ ১৯৭১ সাল থেকে বিজয়ের আগ মুহুর্ত পর্যন্ত বাংলাদেশেই ছিলোনা, এই এতটুকু সময়কাল নিরবিচ্ছিন্নভাবে অকাট্য সাবুদ, প্রমান দিয়ে সাকাকেই প্রমান করতে হবে।

(২) এই প্রমাণ করবার জন্য আবার সাকাকে আইনে যেভাবে বা যে পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া বলা রয়েছে সেভাবে সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থিত করতে হবে, মানে আইনের ৯(৫) ধারা মোতাবেক।

এই যে উপরে আমি লিখেছি যে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ আন্তির্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালস আইনের ৯(৫) ধারা মোতাবেক পরিচালিত হতে হবে সেটি আসলে কি এখন আমরা তাই জানব। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালস আইনের ৯ এর উপধারা ৫ এ বলা রয়েছে-

(5) A list of witnesses for the defence, if any, along with the documents or copies thereof, which the defence intends to rely upon, shall be furnished to the Tribunal and the prosecution at the time of the commencement of the trial.

উপরের কথাগুলোর সহজ মানে দাঁড়াচ্ছে যে ডিফেন্স পক্ষ যদি তার পক্ষে কোনো সাক্ষীকে হাজির করতে চান তবে তাদের নাম সাক্ষ্য শুরুর আগেই, মানে বিচারের প্রাথমিক স্তরেই দিতে হবে। এই একই রীতি কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের জন্যও প্রযোজ্য যেটি আইনে স্পস্ট করে বলা আছে।

উপরে এতক্ষন সময় নিয়ে যারা আমার এই লেখাটি পড়লেন তাঁরা নিশ্চই এটি বুঝেছেন যে “এলিবাই ডিফেন্স” আসলে কি, এই ডিফেন্সে কি কি প্রমাণ করতে হয়, রায়ে এই ডিফেন্স প্রমাণ করতে হলে কি করতে হবে এবং আইনেই বা কি বলা রয়েছে। এবার আমরা মূল প্রশ্ন ও উত্তর পর্বের দিকে চলুন যাই-

মূল প্রশ্ন ও সেগুলোর উত্তরঃ

১ম প্রশ্নঃ

কেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ২৯ মার্চ করাচী যাত্রা এবং সেখানে অবস্থানের পক্ষে দেয়া তার প্রমানকে আমলে নেয়া হয়নি?

১ম প্রশ্নের উত্তরঃ

অভিযুক্ত সাকাচৌ এর ৩য় সাক্ষী কাইয়ুম রেজা চৌধুরী তার সাক্ষ্যে বলেছেন-  [ রায়ের ২৫০ নাম্বার অনুচ্ছেদ থেকে]

D.W. 3 Qayum Reza Chowdhury claimed that he met his Bhaiyra (wife’s sister’s husband) D.W. 4 Abdul Momen Chowdhury in the office of Asiqur Rahman at Karachi

আবার ঐ একই প্যারাতে আমরা জানতে পারি যে কি ভয়াবহ পার্থক্য এই বক্তব্যের সাথে অভিযুক্ত সাকাচৌ এর পক্ষে আসা ৪র্থ সাক্ষী আব্দুল মোমেন চৌধুরীর। এ বিষয়ে রায়ের ঐ একই প্যারাতে আদালত বলেন-

while D.W. 4 Abdul Momen Chowdhury testified that during his stay in Karachi at that time D.W. 3 Qayum Reza Chowdhury met him at his residence. The above contradiction as to place of meeting between D.W. 3 and D.W.4 is not ignorable which has, at least, weakened the plea of alibi.

এবার আসুন কাইয়ুম রেজা চৌধুরীর জবানবন্দী থেকে আরেকটু পড়ি-

কাইয়ুম রেজা চৌধুরী তার জবানবন্দিতে বলেন, ৭১-এর ২৮ মার্চ আমি, নিজাম আহমেদ ও শেখ কামাল ধানমণ্ডিতে অবস্থানরত পূর্বপরিচিত এক সুইডিশ পরিবারে আশ্রয় নিই। সে বাসার পাশেই ছিল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাসা। এ সময় আমাদের দেখা হয়। পরের দিন ২৯ মার্চ তিনি করাচিতে চলে যান। আমি নিজে তাকে এয়ারপোর্টে দিয়ে আসি।

তিনি জবানবন্দিতে আরও বলেন,

আমি করাচিতে থাকাকালে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আশিকুর রহমানের করাচির অফিসে আমার আত্মীয় আবদুল মোমেনের সঙ্গে দেখা করতে যাই। তখন তিনি আমাকে বলেন, তোমার খালাত ভাই সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে আমার পরিচয় ও দেখা হয়েছে। [সূত্রঃ৩]

কাইয়ুম রেজা চৌধুরী দাবী করছেন যে তার সাথে তার ভায়রার দেখা হয়েছে জনৈক আশিকুর রহমান সাহেবের করাচীর অফিসে অথচ ট্রাইবুনালের রায়ে আমরা জানতে পারলাম যে ভায়রা আব্দুল মোমেন দাবী করেছেন যে তার সাথে কাইয়ূম রেজা চৌধুরীর দেখা হয়েছে কাইয়ুমের বাসায়।

দুইজন সাক্ষ্যের ভাষ্যে কি ভয়াবহ পার্থক্য!!! খোদ আদালত তার রায়ের ২৫০ নাম্বার প্যারাতেই বলেছেন

“The above contradiction as to place of meeting between D.W. 3 and D.W.4 is not ignorable which has, at least, weakened the plea of alibi”

এই দুই সাক্ষ্যের জবানবন্দী থেকে আরো নানাবিধ সাংঘর্ষিক “গল্প” বের হয়ে আসে। যেমন আব্দুল মোমেন চৌধুরী ঠিক কোন সময়ে পাকিস্তানে ছিলেন সেটি পরিষ্কার করে তার জবানবন্দীতে উল্লেখ করেন নি। তিনি আনুমানিক অর্থে বলেছেন এপ্রিলের ২য় বা ৩য় সপ্তাহের কথা এবং পুরোটাই অনুমানের ভিত্তিতে।

আবার ঐদিকে কাইয়ুম রেজা চৌধুরী সাকার সাথে দেখা হবার কথাও সঠিক তারিখ নিরূপন করে বলতে পারেন নি। যেই কাইয়ুম রেজা তার জবানবন্দীতে ২৮ তারিখে কোন সুইডিশ ব্যাক্তিদের বাসায় গিয়েছেন, কি করেছেন, সাথে কে ছিলো এসব দিন কাল ধরে ধরে বলতে পেরেছেন সেই কায়ুইম রেজার বক্তব্য মূল ঘটনায় এসে দুই রকমের হয়ে যাচ্ছে। এইদিকে আব্দুল মোমেনের বক্তব্যের সাথে কাইয়ুমের বক্তব্য মূল স্থানে এসে সম্পূর্ণ আলাদা। [সূত্রঃ৪]

এই দুই সাক্ষীর এমন সাংঘর্ষিক সাক্ষ্যের পরে এটা কি বিশ্বাস করা কি আদৌ সম্ভব যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ২৯ শে মার্চ পাকিস্তানে গিয়েছিলো? পাঠক আপনারা যদি আরেকটি বিষয় এখানে লক্ষ্য করেন তাহলে দেখবেন যে, উপরে উল্লেখিত যেই দুইজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন তাদের মধ্যে আব্দুল মোমেন চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সময়েও পাকিস্তানের আজ্ঞাবহ হয়ে রাষ্ট্রদূত হিসেবে চাকুরী করেছেন। সুতরাং এটি বলা বাহুল্য যে তিনি সে সময় পাকিস্তান সরকারের একজন অনুগত কর্মচারী-ই ছিলেন।

একজন পাকিস্তানী কর্মচারী তার চাকুরীদাতার প্রতি সকল সমর্থন বজায় রেখেই চাকুরী করেন কিংবা বলা যেতে পারে সরকারের প্রতি সকল পরিপূর্ণ আনুগত্য এনেই তিনি চাকুরী করে গিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের সময়ে। যে ব্যাক্তি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকারের সেবাদাশ হয়ে আনুগত্য করে গেছেন সেই পাকিস্তানী কর্মচারী যখন এই ধরনের মামলায় একজন অভিযুক্তের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে আসেন তখন ব্যাপারটি কি দাঁড়াতে পারে এটিও কিন্তু এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত চিন্তনীয় ও বিবেচনাযোগ্য।

আবার এসব ব্যাতিরেকে যদি ফ্যাকচুয়াল টার্মসগুলোতে আমরা লক্ষ্য করি তবে দেখতে পাই যে যে যে সময়গুলোতে অপরাধের কথা বলা হচ্ছে, কাইয়ুম রেজা চৌধুরী বা আব্দুল মোমেন চৌধুরীর সাক্ষ্যেও সে সময়গুলো কিন্তু একেবারেই কাভার করেনি।

আবার আদালত তার রায়ের ২৫১ নাম্বার অনুচ্ছেদে বলেন-

But the fact remains that the defence did not produce any travel or residential documents to show the date of so-called visit to West Pakistan and staying therein during the War of Liberation of Bangladesh.

কোনো ধরনের দালিলিক তথ্যই আসলে আসামী পক্ষ হাজির করতে পারেনি। সে সময়কার পাসপোর্ট কিংবা ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত কাগজ বা পাকিস্তানে থাকবার সময়কালীন কোনো কংক্রীট দালিলিক প্রমাণ সাকাচৌ দাখিল করতে ব্যার্থ হয়েছেন। আর অন্যদিকে উল্লেখ্য ঐ দুই সাক্ষীর সাক্ষ্যের দুই রকম বক্তব্য। আর এসব সব কিছু মিলেই  আদালত সাকাচৌ এর যুক্তি আমলে নেননি সেটা বলাই বাহুল্য।

২ নং প্রশ্নঃ

কেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে মাত্র ৫জনের বেশি সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপনের সুযোগ দেয়া হয়নি? যেখানে রাষ্ট্রপক্ষের ৪১জন সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপনের সুযোগ দেয়া হয়েছে।

২নং প্রশ্নের উত্তরঃ

সাকাচৌ প্রথমে এই ট্রাইবুনালে ১১৫৩ জন সাক্ষীর একটা লিস্ট ধরিয়ে দেন ট্রাইবুনালের হাতে। এই লিস্ট ধরানো যে অসৎ উদ্দেশ্য এবং আইন মোতাবেক হয়নি সেটির সম্পর্কে জানা যায় দৈনিক প্রথম আলোর একটি রিপোর্ট থেকে। “সাকা চৌধুরীর পক্ষে ১১৫৩ সাক্ষী!” এমন একটি শিরোনামের লেখা যেটি প্রকাশিত হয়েছিলো ২১ শে মে ২০১২ সালে, সেখানে লেখা রয়েছে যে-

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য এক হাজার ১৫৩ জন সাক্ষীর নামের তালিকা ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সাক্ষীর তালিকায় রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, বিচারপতিসহ কিছু পরিচিত ব্যক্তিত্বের নাম আছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কাদের সিদ্দিকী, বদরুদ্দীন উমর, সিরাজুল আলম খান, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ, অলি আহমদ প্রমুখ। এ ছাড়া একাধিক বিচারপতির নামও রয়েছে বলে ওই সূত্র জানায়। বিধান অনুসারে সাক্ষীদের তালিকায় শুধু নাম উল্লেখ করা থাকে, অন্য কোনো পরিচয় বা ঠিকানা থাকে না। এই তালিকায়ও নামের বাইরে অন্য কোনো পরিচয় দেওয়া নেই।

সাক্ষীদের তালিকায় এসব ব্যক্তির নাম থাকার কথা স্বীকার করে ফখরুল ইসলাম বলেন, তিনি নিজে এসব ব্যক্তির নাম সাক্ষীদের তালিকায় লিখেছেন। সাক্ষীর তালিকায় নাম থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী কী করেছেন, তা আমি জানি না। তবে আগরতলা মামলা চলাকালে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে আমার নেতৃত্বে ঢাকার ধানমন্ডি ও জগন্নাথ কলেজে ছাত্রলীগের যেসব মিছিল হয়, সালাউদ্দিন কাদের তাতে অংশ নিয়েছিলেন। সে জন্যই হয়তো সাক্ষী হিসেবে আমার নাম দিয়েছেন।’

তবে ফোনে যোগাযোগ করা হলে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ, বদরুদ্দীন উমর ও কাদের সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, সাক্ষীর তালিকায় নাম থাকার বিষয়ে তাঁরা কিছুই জানেন না। বদরুদ্দীন উমর বলেন, ‘সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ভালো কাজ করেছেন কি মন্দ কাজ করেছেন, তার কিছুই আমার জানা নেই। কেন আমার নাম সাক্ষীর তালিকায়, সেটাও আমার জানা নেই।’

sakar 1153 witness list-1sakar 1153 witness list-2

উপরের এই রিপোর্ট পড়লেই বুঝতে পারা যায় যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পুরো ট্রাইবুনালকে কিংবা এর আইনকে এবিউজ করবার উদ্দেশ্যেই এমন একটি বিষ্ময়কর ও হাস্যকর কাজ করেছে। যেখানে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তার ক্ষেত্রে ডিফেন্স হিসেবে বলেছে যে তার বিরুদ্ধে আসা অপরাধের সময়ে সে বাংলাদেশেই ছিলোনা সেখানে এই একটি ঘটনা প্রমাণ করবার জন্য সে এমন সব মানুষের নাম সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করেছে যারা জানেন-ই না যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তাদেরকে সাক্ষী হিসেবে মানছেন। এভাবে না জানিয়ে, না বলে কিংবা অনুমতি না নিয়ে সাক্ষ্যের নাম লিপিবদ্ধ করাটা এই আইনী প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত ও প্রশ্নবিদ্ধ করবার-ই নোংরা অপঃপ্রয়াস।

আমরা যদি সাকার এই দীর্ঘ সাক্ষ্যের এই এমন একটি ঘটনা থেকেও সরে ফোকাস করি যে কেন সাকাচৌ এর ক্ষেত্রে ৫ জন সাক্ষীকে ট্রাইবুনাল এলাউ করেছে সেক্ষেত্রে আসলে ব্যাখ্যাটি অত্যন্ত সহজ বলেই আমার মনে হয়। কেননা সাকাচৌকে শুধু প্রমাণ করতে হবে যে ঘটনা সংগঠনের সময় সে বাংলাদেশে ছিলোনা আর একটিমাত্র ফ্যাক্ট প্রমাণ করবার জন্য ৫ জন সাক্ষীকেই আমার কাছে আসলে অত্যাধিক বেশী মনে হয় অথচ উল্টোদিকে তার বিরুদ্ধে আসা ২০ টি অভিযোগের প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য এসেছে মাত্র ৪১ জন যেখানে প্রতিটি ঘটনায় সাকার হাতে নির্যাতিত মানুষ হাজার হাজার। ২০ টি অভিযোগের ক্ষেত্রে যদি ৪১ টি সাক্ষী আনা হয় তবে গড়ে কতটি সাক্ষ্য হয় আদতে? প্রতি অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২টি বড়জোড়।

উপরের উদাহরনটি কেবলমাত্র একটি গানিতিক হিসেব। এটি একটা সাধারন জ্ঞান বা কম সেন্সিকাল পার্স্পেক্টিভ থেকেই মূলত বলা কিন্তু আইনী দৃষ্টিকোন থেকে যদি আমি বলতে যাই তবে এটিই বলা সমীচিন যে আদালত যখন অভিযুক্তের সাক্ষী আবেদনের প্রেক্ষিতে ৫ জন সাক্ষীর কথা সুনির্দিষ্ট করে দেন সেখানে আদালত তার ব্যখ্যা দিয়েই তা বলেছেন কেন তারা সাক্ষী সংখ্যা সংকুচিত করেছে।

আসামী যদি এলিবাই ডিফেন্স না দিয়ে প্রতিটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঐ উক্ত ঘটনায় জড়িত না থাকবার কথা উল্লেখ করত তবে হয়ত আদালত ঘটনাভিত্তিক ক্রম বিবেচনায় অভিযুক্তের পক্ষে যৌক্তিক পরিমানে সাক্ষীকে সাক্ষ্য দেবার জন্য অনুমতি দিতেন। সে সম্ভাবনা অতি-অবশ্যই ছিলো। কিন্তু যেহেতু আসামীর ক্ষেত্রে সোজা সাপটা বলাই হচ্ছে যে সে অপরাধ সঙ্গঠনের সময় ঐ স্থানেই ছিলোনা সুতরাং বিজ্ঞ আদালত সাকার একটি মাত্র ডিফেন্সের ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত-ই নিয়েছেন বলে আমি মনে করি।

এই ৫ জন সাক্ষীর ক্ষেত্রেও সাকাচৌ’র ব্যার্থতা আমরা দেখতে পাই। প্রথমত তার সাক্ষী সালমান এফ রহমান সাক্ষ্য দিতেই আসেনি আবার আরেকজন সাক্ষী সিটিং বিচারপতি শামীম হাসনাইন কে সাক্ষী করে সাকাচৌ ইচ্ছে করেই একটা গোলমাল লাগাবার চেষ্টা করেছে এটি জানবার পরেও যে সিটিং একজন বিচারপতি এই ধরনের মামলায় কোড এন্ড কন্ডাক্ট অনুযায়ী সাক্ষ্য দিতেই পারেন না। তাহলে কেন বিচারপতি শামীমকে সাক্ষী হিসেবে লিস্টে রাখা হয়েছিলো? আর যদি শামীম সত্য উদ্ঘাটনে এতই উৎকন্ঠিত, তবে তিনি কেন তার বিচারপতির চাকুরীটি ছেড়ে বিবেকের তাড়নায় সাক্ষী দিতে এলেন না? এসব প্রশ্ন রেখে যাচ্ছি এখানে।

সাক্ষী কমাবার এই রীতি শুধুমাত্র যে বাংলাদেশের এই আদালতে প্রচলিত তা কিন্তু একেবারেই নয়। ইউনাইটেড নেশন্স এর মূল পরিচালনায় পরিচালিত রুয়ান্ডা ট্রাইবুনাল কিংবা ইয়াগোস্লাভিয়া ট্রাইবুনালেও আমরা সাক্ষী লিস্ট কর্তন করবার  প্রক্রিয়ার দৃষ্টান্ত দেখতে পাই।

রুয়ান্ডা ট্রাইবুনালের THE PROSECUTOR v. Élie NDAYAMBAJE, Joseph KANYABASHI,Pauline NYIRAMASUHUKO,Arsène Shalom NTAHOBALI,Sylvain NSABIMANA, Alphonse NTEZIRYAYO [Case No. ICTR-98-42-AR73] এর ৩ নাম্বার প্যারায় বলা হচ্ছে-

The Appellant is being jointly tried with Élie Ndayambaje, Pauline Nyiramasuhuko, Arsène Shalom Ntahobali, Sylvain Nsabimana and Alphonse Nteziryayo. The trial of the Appellant and his co-accused commenced on 12 June 2001. On 5 October 2006, Trial Chamber II (“Trial Chamber”) issued a Scheduling Order which noted that the presentation of the Defence case for each of the accused was to be completed by “mid-2007” and that all efforts should be made to ensure the efficient conduct of the proceedings to comply with that deadline. It ordered the Appellant, Mr. Ndayambaje and Mr. Nteziryayo to significantly reduce the number of their respective witnesses, particularly those witnesses who were being called to prove the same facts, by 6 November 2006. At the time of the issuing of the Scheduling Order, the Appellant had listed 110 factual witnesses and seven expert witnesses, and no action was taken by the Appellant to comply with the Scheduling Order and reduce that number. On 9 November 2006, the Trial Chamber issued a second Scheduling Order, in which it considered that the Appellant should have been in a position to reduce the number of his witnesses and to file a revised list of witnesses and ordered that this be done by 4 December 2006. The Appellant subsequently indicated that he intended to call forty-nine witnesses from the original list and, additionally, call twenty-three new witnesses. Following this indication, the Trial Chamber issued a further Scheduling Order on 13 December 2006 in which it ordered the Appellant to further reduce the number of witnesses and file a final list of witnesses by 31 January 2007. The Appellant failed to comply with this order and additionally brought three motions seeking to vary his list of witnesses.

আবার একই অর্ডারের ৪ নাম্বারের প্যারায় আদালত বলেন-

In a decision rendered on 21 March 2007, the Trial Chamber denied the Appellant leave to expand his witness list and ordered him to file a “revised list of witnesses containing not more than 30 witnesses” by 5 April 2007.

১০  নাম্বার প্যারায় আদালত বলেন-

The Appeals Chamber considers that it is well-established in the jurisprudence of the Tribunal and that of the International Criminal Tribunal for the Former Yugoslavia (“ICTY”) that Trial Chambers exercise discretion in relation to the conduct of proceedings before them.

শুধু মাত্র রুয়ান্ডা ট্রাইবুনালেই নয়। ইয়াগোস্লাভিয়া ট্রাইবুনালে Orić মামলার একটি ডিসিশনে আদালত ৮ নাম্বার প্যারায় বলেন-

Rule 73 gives the Trial Chamber the authority to limit the length of time and the number of witnesses allocated to the defence case

উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে পরিশেষে বলা যেতে পারে যে বিজ্ঞ আদালত একটি মামলার মেরিট বুঝে, ফ্যাক্ট কিংবা ডিফেন্সের বক্তব্য বিশ্লেষন করেই একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হন। সাক্ষীর সংখ্যা কমানোর ব্যাপারটি যে শুধুমাত্র যে ডিফেন্সের ক্ষেত্রেই হয়েছে তা কিন্তু একেবারেই নয়। রাষ্ট্রপক্ষের ক্ষেত্রে প্রায় প্রতিটি মামলাতেই মাননীয় বিচারপতিরা নানান সময়ে সাক্ষীর সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন সেই একই জুরিস্প্রুডেন্স অনুসরন করে। উপরে আমি রুয়ান্ডা ট্রাইবুনাল, ইয়াগোস্লাভিয়া ট্রাইবুনাল ইত্যাদির নানাবিধ মামলার রেফারেন্স দিয়েছি শুধুমাত্র একটি কারনেই যে, সাক্ষী কমাবার এই প্রক্রিয়া মূলত এই জাতীয় মামলার ক্ষেত্রে অন্যান্য আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালেও প্রয়োগ করা হয় যৌক্তিক কারনেই।

৩ নং প্রশ্নঃ

 আদালতে সাক্ষী উপস্থাপনের সুযোগ না পাওয়ায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবীরা ছয়জন সাক্ষীর এফিডেবিট আদালতে উপস্থাপন করেছিলেন, যারা নিশ্চিত করেছেন যে যুদ্ধচলাকালীন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন। সেই এফিডেবিটগুলোকে ট্রাইবুনাল খারিজ করে দেয়নি, কিন্তু যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি এই অযুহাতে সেগুলো আমলে নেয়নি। কেন?

৩ নং প্রশ্নের উত্তরঃ

আমি আমার লেখার মধ্যে আগেই বলেছি, আইনে যে পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া বলা রয়েছে সেভাবে সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থিত করতে হবে, মানে আইনের ৯(৫) ধারা মোতাবেক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালস আইনের ৯ এর উপধারা ৫ এ বলা রয়েছে-

(5) A list of witnesses for the defence, if any, along with the documents or copies thereof, which the defence intends to rely upon, shall be furnished to the Tribunal and the prosecution at the time of the commencement of the trial.

উপরের কথাগুলোর সহজ মানে দাঁড়াচ্ছে যে ডিফেন্স পক্ষ যদি তার পক্ষে কোনো সাক্ষীকে হাজির করতে চান তবে তাদের নাম সাক্ষ্য শুরুর আগেই, মানে বিচারের প্রাথমিক স্তরেই দিতে হবে। এই একই রীতি কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের জন্যও প্রযোজ্য যেটি আইনে স্পস্ট করে বলা আছে।

কিন্তু এই যে গুজব ছড়ানো হচ্ছে সাধারন মানুষের মধ্যে কিংবা এই যে সন্দেহ তৈরী করা হচ্ছে সাধারন মানুষের মধ্যে এই বলে যে সাকাচৌ এর পক্ষে ৬ জন পাকিস্তানী নাগরিক এফিডেভিট করে সাক্ষ্য দিয়েছেন সেটা আসলে পদ্ধতিগতভাবে কতটা সঠিক? ট্রাইবুনাল তার রায়ের ২৫১ নাম্বার প্যারায় বলেন-

The defence in violation of the provision of section 9(5) of the Act submitted some documents before the Tribunal at the fag end of defence argument and intentionally refrained from proving those documents by recalling defence witnesses. As such the defence has miserably failed to prove its plea by documentary evidence that the accused stayed in West Pakistan during whole period of the Liberation War of Bangladesh.

যারা এ লেখা পড়ছেন তাঁদের কাছেই আমি সদয় বিবেচনার জন্য অনুরোধ করছি যে এইভাবে কোনো কথা বার্তা ছাড়া হুট করে কিছু লোকের এফিডেভিট নিয়ে জমা দেয়াটা কতটুকু আইনসম্মত। আমি যদি আইনের কথা বাদও দেই, মানবিক বা নৈতিক ভাবেই বা কতটা সঠিক এই জাতীয় প্র্যাকটিস? আমি আগেই বলেছি যে এই ধরনের একটি মামলার ক্ষেত্রে আইনী প্রক্রিয়াই হচ্ছে আপনি প্রথমেই সাক্ষী হিসেবে কাদের কাদের আনতে চান তাদের লিস্ট দেবেন আপনার প্রতিপক্ষ ও বিচারকদের এক কপি করে। সেই সাথে আরো দেয়া হয় যে সাক্ষীকে ডকে আনা হবে তার জবানবন্দী কিংবা যে সাবুদ আপনি উপস্থাপন করবেন সেগুলোর সবগুলোর একটি কপি। কেননা ডিফেন্স যখন একজন সাক্ষীর নাম দেন এবং পরবর্তীতে সে সাক্ষীর স্টেটমেন্ট দাখিল করেন এবং আরো যা যা প্রমান-পত্র হাজির করেন তখন সেগুলো নিয়ে গভীর অনুসন্ধান করে রাষ্ট্রপক্ষ। প্রসিকিউটররা সেসব তথ্য প্রমান পুংখানুপুংখভাবে যাচাই ও বাছাই করে তাদের জেরা করবার জন্য প্রশ্ন তৈরী করেন, তাদের বক্তব্য যাচাই করবার কৌশল নির্ধারন করেন।

কিন্তু অত্যন্ত বিষ্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে যারা গুজব ছড়াচ্ছেন এই বলে যে, ৬ জন পাকিস্তানী ব্যাক্তিরা সাকার পক্ষে সাক্ষ্য দেবার উদ্দেশ্যে এফিডেভিট দাখিল করেছে সেটা নাকি গরহন করা হয়নি। মামলার শেষ পর্যায়ে এসে কোনো কথা বার্তা ছাড়া এফিডেভিট দাখিল করা, সাক্ষ্য হাজির করা এগুলো অত্যন্ত আইনী এটিকেট বহির্ভূত কাজ। আইন বাংলা সিনেমার মত শেষ দৃশ্যে এসে প্রমান হাজির হবার মত করে চলে না। আইন আদালত চলে রাষ্ট্র কতৃক প্রণীত আইনেই। কিন্তু একটি কথা এই মিথ্যেবাদীরা কখনই বলেনি যে কোর্ট গত ২৩ শে জুলাই ২০১৩ সালের একটি অর্ডারের মাধ্যমে কিন্তু এই ছটি এফিডেভিট সাবমিট করবার যে আবেদন সেটি গ্রহন করেছেন। আদালত বলেন-

It is an admitted fact that there is no provision to file additional documents on behalf of the defence during trial. Despite of this fact, for the ends of justice, we are inclined to give permission to the defence to submit additional documents and accordingly, the defence is permitted to submit the additional documents as mentioned in the application and these documents be kept with the documents filed earlier by the defence. 

এই বক্তব্যের পর আর কি আদৌ নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সমীচিন? প্রসিজিওরাল রীতি বা আইন কাঠামো যদি মেনে নিতেই হয় তবে আইনী দৃষ্টিকোন থেকে বলা যেতেই পারে যে এইভাবে আসলে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপিত হবার রীতি নেই কোথাও। হোক সেটি দেশীয় আদালতে কিংবা আন্তর্জাতিক আদালতে। তারপরেও ন্যায় বিচারের স্বার্থে আদালত সে এফিডেভিট গ্রহন করেছিলেন।

প্রশ্ন উঠেছে আদালত কেন এই ছয়টি এফিডেভিটকে রায় ঘোষনার সময় বিবেচনায় আনেন নি। এই পার্টিকুলার স্থানে এসে আদালত যে বক্তব্য দিয়েছে বা আদালতের যে অবজার্ভেশন আমি সেটি আগেই উল্লেখ করেছি। ব্যাক্তিগতভাবে এই ছয়টি এফিডেভিট নিয়ে আমার ব্যাক্তিগত কিছু অভিমত রয়েছে-

ছয়জন সাক্ষীর এফিডেভিটঃ তাদের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আমার পর্যালোচনা

আম্বের হারুন সায়গলঃ

আম্বের এর এফিডেভিটে সুনির্দিষ্ট করে কিছুই বলা নেই যে কত তারিখ থেকে কত তারিখে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তাদের বাসায় ছিলো। ২৫ শে মার্চের আর্মির গণহত্যার পর তিন সপ্তাহর কথা বলা থাকলেও এই সঠিক করে বলা নেই কবে থেকে কবে সাকাচৌ সেই বাড়িতে থেকেছে বরং সেখানে বলা রয়েছে ওয়ান আফটারনুন। এই ওয়ান আফটারনুন ঠিক কবে থেকে আফটারনুন সেটা এফিডেভিটে সুনির্দিষ্টভাবে বলা নেই। পাকিস্তানী আর্মির গণহত্যার পরের তিন সপ্তাহর অনেক ধরনের মিনিং হতে পারে। এফিডেভিটে এও নিশ্চিত করে বলা নেই যে সাকাচৌকে আম্বের নিরবিচ্ছন্নভাবেই সে বাসায় সেই উদ্দিষ্ট সময়ে দেখেছেন কিনা সুতরাং এই এফিডেভিট অত্যন্ত দূর্বল।

ইসহাক খান খাকওয়ানিঃ

এই সাক্ষীর এফিডেভিট খানিকটা চতুরতায় ভরপুর। ইসহাক তার এফিডেভিটে অনেক ঘটনার বর্ণনা ক্যালেন্ডারের পাতার মত দিন তারিখ উল্লেখ করে দিলেও সালাউদ্দিন কাদেরের সাথে তার যখন দেখা হয় বা পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটিতে যখন সাকাচৌ ভর্তি হয় সে দিনটির ক্ষেত্রে ইসহাক শুধু এপ্রিল ১৯৭ কথাটি উল্লেখ করেছে। এপ্রিলের কত তারিখ সেখানে উল্লেখ নেই। সাকার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এপ্রিল মাসে রয়েছে সেটির ক্রম বিবেচনায় আমরা দেখতে পাই ৪/৫,১৩,১৭, এপ্রিলের কথা। কিন্তু ইসহাকের এফিডেভিটে উল্লেখ নেই যে ঠিক কত এপ্রিলের কত তারিখে সাকার সাথে তার দেখা হয় অথচ অন্য তারিখ বলতে গিয়ের তিনি সুনির্দিষ্টভাবে তারিখ উল্লেখ করেছেন ঐ একই এফিডেভিটে। এসব বিবেচনা করেই আমার কাছে এই এফিডেভিটকে দূর্বল ও মিথ্যে মনে হয়েছে পরিষ্কারভাবে।

ওসমান সিদ্দিকী

ওসমান সিদ্দিকী’র এফিডেভিট অনেকগুলো ঘটনা সন্নিবেশিত যেটি বিশ্বাস করতে গেলে সাকাচৌ এর পক্ষে আসা অনেক সাক্ষীই সরাসরি মিথ্যে প্রমাণিত হয়। যেমন ওসমান সাহেবের এফিডেভিটে বলা রয়েছে যে সাকা আর তিনি মিলে প্রায়ই একসাথে সালমান এফ রহমান, কাইয়ুম রেজা চৌধুরীর সাথে মোলাকাত করতেন, দেখা করতেন। অথচ কাইয়ুম রেজা চৌধুরী তার জবানবন্দীতে বলেছেন সাকাচৌ এর সাথে তার পাকিস্তানে গিয়ে দেখাই হয়নি। তাহলে কোন কথাটি সত্য? কার কথা সত্য? এছাড়াও তিনি সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারেন নি যে কবে থেকে কবে পর্যন্ত সাকাচৌ এর সাথে তার এক্সাক্টলি দেখা হয়েছে। একই সাথে বাংলাদেশ থেকে, একই ফ্লাইটে সাকা আর ওসমান পাকিস্তানে আসলেও ওসমান তার এই ভ্রমনের ক্ষেত্রে আর কোনো প্রমাণও সংযুক্ত করেন নি। কিছু মেজর ফ্যাকচুয়াল ঘটনার বৈপিরত্যের কারনেই ওসমান সিদ্দিকী’র এই এফিডেভিট বিশ্বাসযোগ্য নয় বলেই আমার মতামত।

 মোহাম্মদ মিয়া সুমরুঃ

এই এফিডেভিট ও মুলত সাকার ৩য় সাক্ষী কাইয়ুম রেজা চৌধুরীর বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক। এখানেও বলা রয়েছে যে সাকাচৌ যতদিন করাচিতে ছিলেন ততদিন তারা সব বন্ধুরামিলে মিট করতেন কাইয়ুম রেজা, সালমান ইত্যাদির সাথে। ঐদিকে কাইয়ুম রেজার সাথে সাকাচৌ এর পাকিস্তানে থাকতে দেখাই হয়নি বলে বলেছে কাইয়ুম রেজা তার জবানবন্দীতে। দুইটা দুই রকমের গল্পের রেশ আমরা পাই এই দুই স্টেটমেন্টে। উপরন্তু এই এফিডেভিটে তারিখও উল্লেখ নেই বরং শোনা কথার উপর ভিত্তি করে কিছু মন্তব্য করা হয়েছে। একদিকে আম্বের হারুন সায়গল বলছে সাকা তাদের সাথে তিন সপ্তাহ ছিলো সে হিসেবে সাকা তাদের সাথে ১৯ বা ২০ শে এপ্রিল পর্যন্ত থাকার কথা। এইদিকে এই এফিডেভিটে সাক্ষী বলেছে প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহের কথা যেটি এটবেস্ট ১৪-ই এপ্রিল পর্যন্ত হবার কথা। এই দুইটি বক্তব্যও এখানে আলাদা। আমাদের মাথায় রাখতে হবে এই মামলার প্রতিটিদিন, প্রতিটি সময় গুরুত্বপূর্ণ। সাকা ৪/৫,১৩, ১৭ এপ্রিলে যে তান্ডব চালিয়েছে বলে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে সে প্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট সময় ধরে সাকার সাথে নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগের নিশ্চয়তা কেউই কোনো এফিডেভিটে দিতে পারেন নি।

মুনিব আর্জমান্দ খানঃ

এই এফিডেভিট টিও সাকার সাক্ষী কাইয়ুম রেজা চৌধুরীর সাক্ষ্যের সাথে সাঙ্ঘর্ষিক। মুনিব সাহেবের এফিডেভিটে বলা রয়েছে যে সাকা আর তিনি মিলে প্রায়ই একসাথে সালমান এফ রহমান, কাইয়ুম রেজা চৌধুরীর সাথে মোলাকাত করতেন, দেখা করতেন। অথচ কাইয়ুম রেজা চৌধুরী তার জবানবন্দীতে বলেছেন সাকাচৌ এর সাথে তার পাকিস্তানে গিয়ে দেখাই হয়নি। তাহলে কার কথা সত্য?

ডক্টর আম্বরিন জাভিদ, চেয়ারপার্সন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ঃ

এই চিঠিটি আসলে কি কারনে দেয়া হয়েছে এটি আমার জন্য বোধগম্য নয় প্রথমেই। এই একটি চিঠি যেটি পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি থেকে ইস্যু করা হয়েছে যেখানে বলা রয়েছে যে সাকা অগাস্টে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইনাল পরীক্ষায় যোগ দিয়েছে। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে বলা নেই যে সাকা সুনির্দিষ্ট ঠিক কত তারিখে ইউনিভার্সিটিতে যোগ দিয়েছে, কতদিন ক্লাস করেছে কিংবা তার উপস্থিতির হারটাই বা কেমন। অনেকটা দায় সারা গোছের একটা এফিডেভিট এবং এটি আদতে কোনো কিছুই প্রমাণ করেনা আসলে। পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইটে গেলে এবং তাদের ওয়বসাইটে টেলিফোন নাম্বার লেখার যে প্যাটার্ন বা ঠিকানার যে প্যাটার্ন সেটির সাথে সংযুক্ত এই প্যাডের লেখাটি বানানো বলেই মনে হয়। যেখানে পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির PO BOX নাম্বার 54590 লেখা রয়েছে তাদের সাইটে সেখানে যংযুক্ত প্যাডের মধ্যে চিঠিটির মধ্যে এই কথাটি লেখা নেই, বরং লাহোর 54590 লেখা রয়েছে যা পোস্ট বক্স কথাটি বা ধারনার সাথে একেবারেই যায়না। মোট কথা এই চিঠিটি যথেষ্ট সন্দেহের জন্ম দেয়।

রিয়াজ আহমেদ নুনঃ

এই এফিডেভিট টিও মূলত নানা ধরনের তারিখগত ও ফ্যাকচুয়াল ঘটনার বর্ণনের ক্ষেত্রে অসম্পূর্ন। সালাউদ্দিনের নামে যে অভিযোগ রয়েছে ও সেসব ঘটনার যে সময়কাল বলা রয়েছে শুধু সে সব সময়কালের মাসের কথা রিয়াজ উল্লেখ করলেও অন্যন্য সময়ের বর্ণনায় রিয়াজ একেবারে সুনির্দিষ্ট দিনের কথা পর্যন্ত বলতে পারছে। এই বর্ণনাগুলো দেখলেই বুঝতে পারা যায় যে খুব চাতুরীর আশ্রয় নিলেও সুবিধা করতে পারেনি বরং মিথ্যের ছাপ শেষ পর্যন্ত থেকেই গেছে। এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয় সালাউদ্দিন কাদের এর ব্যাপারে নিরবিচ্ছিওন সময়ের কোনো রেফারেন্সই রিয়াজ নুন দিতে পারেন নি।

৪ নং প্রশ্নঃ

 করাচীতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সাথে নিয়মিত দেখা সাক্ষাৎ করা বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাগরিক সালমান এফ রহমান এবং বিচারপতি শামিম হাসনাইনের সাক্ষ্য কেন গ্রহণ করা হয়নি, যেখানে ছয়জন সাক্ষী বলেছেন যে তারা করাচীতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন?

৪ নং প্রশ্নের উত্তরঃ

প্রথমত, সালমান এফ রহমানের সাক্ষ্য গ্রহন করা হয়নি এই তথ্যটুকু অত্যন্ত মিথ্যে। সালমান এফ রহমান আদালতে সাক্ষ্য দিতেই যান নি সুতরাং সাক্ষ্য গ্রহন করা হয়নি এই কথাটি সঠিক নয়।

দ্বিতীয়ত ঘটনাটি হচ্ছে বর্তমান হাই কোর্টের বিচারপতি শামীম হাসনাইনের ব্যাপারে। বিচারপতিদের কোড এবং কন্ডাক্ট অনুযায়ী এই ধরনের মামলায় একজন বিচারপতি সাক্ষ্য দিতে পারেন না। এটাই হচ্ছে আইন, এটাই হচ্ছে নিয়ম।

শামীম হাসনাইন প্রধান বিচারপতির কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন যে তিনি বিবেকের তাড়না বোধ করছেন সাকাচৌ এর ক্ষেত্রে সাক্ষী দেবার জন্য। শামীম হাসনাইন যে চিঠিটি প্রধান বিচারপতির কাছে লিখেছিলেন সেটিতে প্রথমেই কয়েকটি ব্যাপার পরিষ্কার করে নেয়া যাক।

শামীম হাসনাইনের এই চিঠিটি মূলত সাকাচৌ এর পক্ষে দেয়া ৬ টি এফিডেভিট কিংবা সাকাচৌ এর পক্ষে আসা বাকী সাক্ষ্যদের বক্তব্যকে খারিজ করে দেয়। এই চিঠিতে তিনি স্পস্ট বলেছেন যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির লাহোর ক্যাম্পাসে মে মাসের প্রথম থেকে অগাস্ট মাস পর্যন্ত ছিলো (১৯৭১)।

প্রথমেই যে ব্যাপারটি পরিষ্কার হয় যে শামীম হাসনাইন সাকার পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে ১৯৭১ এর মে মাস থেকে সুতরাং এপ্রিল মাসে সাকার বিরুদ্ধে যে নতুন চন্দ্র সিংহ কে হত্যা করবার অভিযোগ রয়েছে সেটি কিন্তু বিচারপতি শামীমের বক্তব্যে কাভার হচ্ছেনা। আবার এইদিকে যেখানে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে আসা এফিডেভিটে বলা হচ্ছে যে সাকা এপ্রিল মাসে পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছে সেখানে শামীম বলছে যে সাকচৌ পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটিতে মে মাস থেকে ছিলো। এখানে প্রশ্ন দাঁড়ায়, বিচারপতি শামীম কি নিজেই মে মাস থেকে সেখানে ভর্তি হয়েছেন নাকি আরো আগে থেকেই সেখানে ছিলেন। এই ব্যাপারটি কিন্তু শামীম তার চিঠিতে উল্লেখ করেন নি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে পড়ালেখা করে কাটানো এই বিচারপতি তার চিঠিতে এটি স্পস্ট করেন নি যে এই সময়ের মধ্যে সাকাচৌ কি প্রতিদিন ইউনিভার্সিটিতে বা ক্লাসের দিনে ক্লাস করেছিলো কিনা, কোনো ছুটিতে গেছে কিনা কোথাও ইত্যাদি।

এখানে আমার যে ব্যাপারটি সবচাইতে বেশী খটকা লেগেছে সেটি হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে পড়ালেখা করে কাটানো বাংলাদেশের এই বিচারপতি যদি বিবেকের দংশনে এতটাই তাড়না অনুভব করে থাকেন এবং তার চাকুরীর কোড অফ কন্ডাক্টের কারনে সাক্ষী না দিতে পারেন তবে কেন তিনি এই চাকুরীটি ছেড়ে একজন ব্যাক্তিকে বাঁচাতে গেলেন না যাকে তিনি নির্দোষ মনে করছেন?

আরেকটি প্রশ্ন এখানে এসেই যায় যে মাননীয় প্রধান বিচারপতিকে দেয়া তার ব্যাক্তিগত চিঠিটি পাবলিকলি কি করে উঠে এলো? এটি তো মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে পড়ালেখা করে কাটানো বিচারপতি শামীমের অত্যন্ত ব্যাক্তিগত পত্র প্রধান বিচারপতির কাছে। এই ব্যাপারে কি তিনি কোনো বিবৃতি দিয়েছেন? যদি না দিয়ে থাকেন তবে কেন দেন নি?

এই শামীম হাসনাইনের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক আদালতের রেজিস্টার বলেন-

রায় ঘোষণার পর অভিযুক্ত পক্ষে তার বিজ্ঞ আইনজীবী এবং পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন যে, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য বিচারপতি শামীম হাসনাইনকে ট্রাইব্যুনাল অনুমতি দেননি এবং এতে তার অধিকার ক্ষুন্ন হয়েছে। এটি আদৌ সঠিক নয়। গত ২৭/৬/২০১৩ তারিখের ১৮৯ নং আদেশে ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেছেন যে,

Proposed witness No. 5 Mr. Justice Shamim Hasnain is the sitting Judge of the Supreme Court of Bangladesh and as such without obtaining his consent, no summons will be issued upon him.

কিন্তু দেখা যায় যে, পরবর্তীতে মাননীয় বিচারপতি শামীম হাসনাইন এর নিকট থেকে এ বিষয়ে সম্মতি সংশ্লিষ্ট কোন কিছু ট্রাইব্যুনালকে অবহিত করা হয়নি।

পলিসি রিজনঃ

শামীম হাসনাইনের ক্ষেত্রে যদি কোড অফ কন্ডাক্ট ভঙ্গ করে প্রধান বিচারপতি সাক্ষী দেবার জন্য বিশেষ অনুমতি দিতেন সেখানে একটি ভবিষ্যত আশংকার ব্যাপারও থেকে যায়। প্রশ্ন আসতেই পারে কেমন সে আশংকা? আশংকার যায়গাটি হচ্ছে ফ্লাড গেইট ওপেন করে দেওয়া। আজকে জুডিশিয়ারী যদি এমন একটি নজির তৈরী করেন তবে ভবিষ্যতে এই পার্টকুলার বিষয়ের উপর ভিত্তি করে অন্য বিচারপতিও হয়ত অন্য কোনো কোর্ট বা ট্রাইবুনালে সাক্ষ্য দেবার জন্য আবেদন করবেন এবং সামনের সময়গুলোতে এইভাবেই একটা ব্যাড পৃসিডেন্ট তৈরী হবে জুডিশিয়ারীতে। লং টার্ম বিবেচনায় যেটি বিচার বিভাগের জন্য হুমকি স্বরূপ এবং ভীষন আশংকার একটি পরিপূর্ণ স্থান তৈরী করে দেবে।

আমরা এই ধরনের একটি পরিস্থিতি কিন্তু দেখতে পাই বিদেশী আইনজীবিদের বাংলাদেশে এই পার্টিকুলার ট্রাইবুনালে অংশগ্রহন করতে দেয়া হবে কি হবে না এমন একটি দ্বন্দে। যেখানে বার কাউন্সিলের ডিস্ক্রিশন থাকবার পরেও এবং বার কাউন্সিলে জামাত ও বিএনপি প্যানেল থাকবার পরেও বিদেশী আইনজীবিদের আসবার অনুমতি দেয়া হয়নি পরবর্তী দায় বা নজির তৈরীর আশংকায়।

সাকাচৌ এর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আসা ১৭ জন চাক্ষুস সাক্ষীঃ

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অপঃপ্রচারের যে শেষ নেই সেটি আমরা গত সাড়ে ৫ টি বছর ধরেই দেখছি। কি সেটি দেশীয় বা আন্তর্জাতিক ভাবে। প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে এই ট্রাইবুনালে শোনা কথাকে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহন করা হয়, গল্পের বইকে সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় ইত্যাদি। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই কথাটি কেউ বলে না যে হিয়ার্সি এভিডেন্স যদি রাষ্ট্রপক্ষের ক্ষেত্রে এলাউ করা হয় ঠিক ভাইস ভার্সা এই একই অধিকার কিনতি আদতে ডিফেন্স পক্ষও পাচ্ছে। যেমন উদাহুপ্রন স্বরূপ আসলে এই ট্রাইবুনালে চলে প্রতিটি মামলার কথাই বলা যায়। কামারুজ্জামানের ছেলে তার বাবার পক্ষে সাক্ষী দিতে এসে মুনতাসীর মামুন স্যারের বই পর্যন্ত আদালতে নিয়ে এসেছে যে কিনা যেই ছেলে কিনা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে জন্মায়ই নি।

Saka poster final

আপনাদের একটি তথ্য জেনে রাখা দরকার যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলা টা হচ্ছে এই ট্রাইবুনালের মামলাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি মামলা যেখানে ৪১ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৭ জন সাক্ষী তাদের সাক্ষ্যে এসে বলেছে যে তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় সাকাচৌকে অপরাধ করতে দেখেছে নিজের চোখে এবং এদের মধ্যে অনেকে সরাসরি সাকার হাতে নির্যাতিত।

বাংলাদেশের প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি সালেহ আহমেদ ট্রাইবুনালে এসে বলে গেছেন যে সাকাচৌ তাকে মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্মমভাবে নির্যাতন করেছে। বাংলাদেশের একটি প্রখ্যাত ইউনিভার্সিটির একজন উপাচার্য যখন চাক্ষুস সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন নিজে নির্যাতিত হয়েছেন বলে তখন সেটির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ করাটাও আসলে নৈতিক ভাবে আরেকটি নির্যাতনের সামিল। ভিকটিম নিজে এসে বলে যাচ্ছেন, সাকাচৌকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে এটিই হচ্ছে সেই সাকা চৌধুরী যে তাদেরকে অকথ্য ভাবে নির্যাতন করেছে, ধরে ধরে মানুষ জনদের খুন করেছে মুক্তিযুদ্ধের সময়।

প্রসিকিউশনের এই ১৭ জন চাক্ষুস সাক্ষীরা হলেন সাক্ষী ২,৩,৪,৬,৭,৮,১৪,১৫,১৭,১৮,১৯,২২,২৪,২৮,৩১,৩২ এবং ৩৭। এই প্রত্যেকটি সাক্ষীই আসলে বর্ণনা করেছেন যে সাকাচৌ কতটা নির্মমভাবে গনহত্যা চালিয়েছে, কতটা নির্মমভাবে সে মুক্তিযোদ্ধাদের খুন করেছে, নির্যাতন করেছে।

এটি উল্লেখ করা খুবই প্রাসঙ্গিক যে সাকারত বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আসা ১৯ নাম্বার সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা ওয়াহেদুল আলম জুনু ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারীতে রহস্যময় ভাবে দূর্ঘটনায় মৃত্যুবরন করেন। এই বিষয়ে দৈনিক জনকন্ঠে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয় ৩১ শে মে ২০১৩ তারিখে। যেখানে বলা হয়-

jono

মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলার সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা ও সঙ্গীতশিল্পী সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম জুনুর মৃত্যু রহস্য উদঘাটন ও তাঁর পরিবারকে ষড়যন্ত্রের হাত থেকে রক্ষার দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা। বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। বাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম জুনুর কন্যা শামীমা ওয়াহিদ বলেন, গত ২২ ফেব্রুয়ারি আমার বাবা রহস্যজনকভাবে মারা গেলেও মৃত্যু রহস্যের কোনো কূলকিনারা হয়নি।

ঐ দিন আমার বাবাকে মৃত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান এক রহস্যময় মহিলা। পরে ঐ মহিলার আর হদিস পাওয়া যায়নি। জুনুর কন্যা শামীমা ওয়াহিদ বলেন, মৃত্যুর সংবাদটিও ফোনে জানায় জান্নাত আরা রোকসানা নামে কথিত এক বিএনপি নেত্রী। এখন আমার বাবার পৈত্রিক জায়গা সম্পত্তির একাংশ দখল করে রেখেছে দ্বিতীয় স্ত্রী পরিচয়দানকারী এক মহিলা, যার নাম রহিমা বেগম।সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মৃত্যুর মাত্র ১০ দিন আগে গত ১২ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুন্যালে যুদ্ধাপরাধী সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাক্ষী দেন সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম জুনু। সাক্ষী দিয়ে ঢাকা থেকে ফেরার দুইদিনের মাথায় তিনি রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হন।

কন্যা শামীমা আরও বলেন, ঘটনার দিন আনুমানিক সাড়ে আটটার সময় বাবার মৃত্যুর খবর তারা পান বিএনপি নেত্রী হিসেবে পরিচয়দানকারী জান্নাত আরা রোকসানার কাছ থেকে। রোকসানা ফোনে মৃত্যুর সংবাদ জানিয়ে আমার খালা এ্যাডভোকেট পারভীন আক্তার চৌধুরীকে ফোন করেন। খালা বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে আমার মাকে জানান। মায়ের কাছ থেকে খবর পেয়ে আমার ছোট বোনের স্বামী আবু নঈমকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠাই। রাত পৌনে নয়টার দিকে সে আমাকে জানায়, ‘বাবা আর নেই। লাশ হাসপাতালে’। কিছুক্ষণের মধ্যে আমি ও পরিবারের অন্যরা হাসপাতালে গিয়ে লাশ দেখতে পাই। সেখানে আমার বাবাকে কে বা কারা হাসপাতালে এনেছে এ রকম কাউকে খোঁজ করেও পাইনি। 

সাকার এলিবাই ডিফেন্সের বিরুদ্ধে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ রাষ্ট্রপক্ষের ২৭ নাম্বার সাক্ষীঃ

সাকা যদিও তার ডিফেন্সে দাবী করেছে যে মুক্তিযুদ্ধের সময় সে বাংলাদেশেই ছিলোনা এবং এটি একটি রাজনৈতিক প্রহসনমূলক বিচার কিন্তু সাকার এই ডিফেন্স আসলে আর ধোপে টেকেনি যতগুলো সাক্ষীর কারনে তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন রাষ্ট্রপক্ষের ২৭ নাম্বার সাক্ষী ডাক্তার এ কে এম শফিউল্লাহ। তিনি বলেন-

মুক্তিযুদ্ধের সময় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, তার বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরী গাড়ি নিয়ে যাবার প্রাক্কালে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের গাড়ি লক্ষ্য করে আক্রমন করে। এই আক্রমনে সাকার গাড়ির চালক নিহত হলেও আঘাত প্রাপ্ত হয়ে প্রাণে বেঁচে যায় সাকাচৌ। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার আসামি সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ২৭তম সাক্ষী ডা. একেএম শফিউল্লাহ বলেছেন, সাকা চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধকালে পায়ে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (সিএমসিএইচ) ভর্তি হন। সেখানে আমি তাকে চিকিত্সা দিয়েছিলাম। গতকাল বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি পেশকালে এ কথা বলেন ডা. শফিউল্লাহ। এ সময় বিএনপি নেতা সাকা চৌধুরী ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।

সাক্ষী তার জবানবন্দিতে বলেন, ‘একাত্তর সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে কোনো এক রাত আনুমানিক ১০টার দিকে আমাকে কল ম্যাসেজ দিয়ে ওয়ার্ডে আসতে বলা হয়। আমি ওয়ার্ডে এসে দেখি, পাকিস্তানি আর্মি, পুলিশসহ অনেক লোক আমার রুমে অপেক্ষা করছেন। এসময় হাসপাতালের বেডে ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে আহত অবস্থায় দেখতে পাই। যতোদূর মনে পড়ে, তার পায়ে যখম ছিল। তখন আমি তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেই। এরপর তিনি আরো ৩/৪ দিন হাসপাতালে ছিলেন। পরবর্তীতে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা অথবা বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয় বলে শুনেছিলাম।

সাকাচৌ যে সে সময় আহত হয়েছিলো এই সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট তৎকালীন দৈনিক পাকিস্তানেও প্রকাশিত হয়েছিলো। সে রিপোর্টে বলা হয়-

EjE8R5in7aYb

images

মুক্তিযুদ্ধের সময় যে ডাক্তার সাকাচৌকে চিকিৎসা পর্যন্ত করেছে সেই ব্যাক্তির এত সুস্পস্ট সাক্ষ্যের পর সাকাচৌ-এর বাংলাদেশে উপস্থিতি সম্পর্কে মূলত আর কোনো প্রশ্নই থাকেনা কিংবা থাকা উচিৎনা বরংচ প্রশ্নবিদ্ধ হয় সেসব সাক্ষীদের কর্মকান্ড যারা আওয়ামীলীগের হয়ে সংসদ নির্বাচন করেছেন, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন কিংবা বাংলাদেশ হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে আসীন রয়েছেন তারা যখন সাকাচৌ এর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে আদালতে আসেন।

পরিশিষ্টঃ

উপরের এই আলোচনা থেকে একটি ব্যাপার পরিষ্কার হয়েছে বলেই আমি মনে করি যে মুক্তিযুদ্ধের সময়  সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে যে যে অপরাধের অভিযোগ এসেছিলো সে অপরাধের সময়ে সাকাচৌ বাংলাদেশেই তথা অপরাধ সংগঠনের স্থানেই অবস্থান করছিলো। প্রসিকিউটর রা তাঁদের জেরার মাধ্যমে ডিফেন্সের সাক্ষীদের বলা বক্তব্যের ভেতর সাংঘর্ষিক বক্তব্য বের করে এনেছেন, মিথ্যে ফ্যাক্ট বা বয়ান করবার তাদের যে অপঃচেষ্টা সেটা বের করে এনেছেন এবং আদালতকে তা প্রমাণ করতে পেরেছেন। আমরা সাকার এই মামলার রায়েই প্রসিকিউটরদের এই দক্ষতা দেখতে পাই।

আমি এতক্ষন যে আলোচনা করতে চেষ্টা করেছি এটি প্রাপ্ত তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে এই রায় নিয়ে চলে আসা প্রোপাগান্ডার একটি উত্তর দেবার চেষ্টা মাত্র। যেহেতু সাকার মৃত্যুদন্ডের রায় আপীলেট ডিভিশনেও বহাল রয়েছে সেহেতু আপীলেট ডিভিশান হয়ত এই উত্থাপিত প্রত্যেকটি প্রশ্নের ব্যাপারে তাঁদের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিস্তারিত বলবেন। তখন পুরো ব্যাপারগুলো আরো অধিকতর ব্যখ্যা সহ আমরা সকলেই অবগত হব।

এই বিচার প্রক্রিয়া ব্যাহত করবার চেষ্টা নতুন নয়। এই প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর ব্যাপারটি আমরা গত ছয়টি বছর ধরেই দেখে আসছি এবং আজকাল অনেকটা গা শওয়াও হয়ে গেছে। তারপরেও এই ধরনের প্রোপাগান্ডা আসলে এর যথাযথ উরত্তরগুলো তড়িৎ দেয়াটাকেই আমি সমিচীন মনে করি আর সে প্রেক্ষিতেই আমার এই রেস্পন্স।

সাকাচৌ ও তার পরিবার এই বিচার প্রক্রিয়া বানচাল করবার জন্য এরই মধ্যে তার রায় প্রকাশের আগে খসড়া রায় অনলাইনে প্রকাশ করে দিয়েছিলো যেগুলো এখন তদন্তের মাধ্যমে সকলের গোচরে এসেছে। এই বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করবার জন্য সাকাচৌ আর তার পরিবারের চেষ্টারই একটি ধাপ হচ্ছে তার বিচারের রায় পরবর্তী একটি হাইপ তৈরী করা এবং সেটির ফাঁকে ফাঁকে গুজবগুলোকে ডাল পালা ছড়িয়ে সকলের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া। জানিনা সাকাচৌ তাদের এই অপঃপ্রচারে কতটা সফল, তবে আমি ব্যাক্তিগতভাবে মনে করি এই ধরনের কর্মকান্ডকে খুব সহজেই নির্মূল করা সম্ভব সাধারন মানুষের সচেতনতা, গুজব শুনে সেগুলোর ক্রস চেকিং কিংবা এইসব ব্যাপারে ভালো জানেন তাঁদের কাছে জিজ্ঞেস করা, পরামর্শ নেয়া।

আমি আশা করছি এই লেখাটি আপনাদের ভালো লাগবে। যারা এতদিন নানান ধরনের কনফিউশনের মধ্যে ছিলেন তাঁদের জন্য হয়ত একটা অধিকতর সুযোগ তৈরী হবে পুরো ব্যাপারটি নিয়ে আরো একবার ভালো করে ভাববার ও সিদ্ধান্ত নেবার।

শেষ করবার আগে আন্তর্জাতিক আদালতের একটি ঘটনা বলে শেষ করছি।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী একদিন ট্রাইবুনালে বার বার বলছিলেন ‘আমাকে ফাঁসি দিয়ে দেন, ফাঁসী দিয়ে দেন”। এই কথা বলার সময় সদস্য বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আপনি প্রতিদিন একই কথা বলেন। তখন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এটিএম ফজলে কবীর সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে উদ্দেশ করে বলেছেন, আপনার মনের ইচ্ছা পূরণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না, যদি উপযুক্ত সাক্ষী প্রমাণে আপনি দোষী না হন।

ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন চৌধুরী সাহেব, আমি ৩৮ বছর ধরে চাকরি করছি। নিম্ন আদালতে কাজ করেছি ৩১ বছর ধরে। আমার ৩১ বছরের বিচারিক জীবনে এ পর্যন্ত শুনিনি যে, কোনো আসামি বলেছেন আমাকে ফাঁসি দিয়ে দেন। তবে আপনি কি কারণে বলছেন, আপনিই ভালো জানেন। ট্রাইব্যুনাল বলে, ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত কয়েকটি মামলার রায় হয়েছে কোনো আসামিই বলেননি যে, ‘আমাকে ফাঁসি দিয়ে দেন, আমাকে ফাঁসি দিয়ে দেন। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ট্রাইব্যুনালকে উদ্দেশ করে বলেন, স্যার ফাঁসির রায় লেখার সময় দয়া করে এ কথাগুলো একটু মনে রাখবেন। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, অন্তত ১০ বছর আগে একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম। আসামিদের মনোস্তত্ত্ব নিয়ে ওই প্রবন্ধে বলা হয়েছিল, একজন অপরাধী যদি অনুতপ্ত হয়, তাহলে সে বলে ‘আমি দোষ করেছি আমাকে শাস্তি দিন। তবে আপনাকে পরিষ্কারভাবে বলি, আমি জানি না ’৭১ সালে আপনি কি করেছেন। সাক্ষ্য প্রমাণে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে আপনার মনোবাসনা পূরণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। যদি আমরা উপযুক্ত সাক্ষী না পাই। [সূত্রঃ৭]

উপরের ঘটনাতে একটি ব্যাপার খুব স্পস্ট যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারপতিরা বিচারের ক্ষেত্রে কতটা নির্মোহ ও এবং সততার সাথে তাঁদের উপর আরোপিত দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। এত এত উদাহরন কিংবা ঘটনার পরেও যদি আমরা সেই অন্ধকারেই থেকে যাই তবে দিনের শেষে সেটা আমাদেরই নিদারুন ব্যার্থতা।

লেখকঃ Nijhoom Majumder,
DIL, LLB(hons), MBA, PGDLP
Lawyer, Legal Analyst, International Crimes Research Foundation

Facebook Comments

Comments

comments

SHARE
Previous articleগোলাম আজমের নাগরিকত্বের মামলা নিয়ে জামাতী মিথ্যাচারের আইনী উত্তর
Next articleকৃষ্ণচূড়া
উপরের প্রকাশিত লেখাটি আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনার ফলাফল। লেখাটি আপনার ভালো নাও লাগতে পারে, পছন্দ না-ও হতে পারে। আমার সাথে হয়ত আপনি একমত হবেন না কিন্তু আমি ধন্যবাদ জানাই আপনি এই সাইটে এসেছেন, আমার লেখাটি কষ্ট করে পড়েছেন আপনার সময় ব্যয় করে, এটিও পরম পাওয়া। সবার মতামত এক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। দ্বিমত থাকবে, তৃতীয় মত থাকবে কিংবা তারও বেশী মতামত থাকবে আবার সেটির পাল্টা মতামত থাকবে আর এইভাবেই মানুষ শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের চিন্তাকে খুঁজে ফেরে নিরন্তর। আর লেখাটি ভালো লাগলে কিংবা আপনার মতের সাথে দ্বন্দ্বের তৈরী না করলে সেটি আমার জন্য বড় সৌভাগ্য। আমি সেটির জন্য আনন্দিত। আপনাদের উৎসাহে, ভালোবাসাতে আর স্নেহেই এই লেখালেখির জগতে আসা। "নিঝুম মজুমদার" পাঠ শুভ হোক, আনন্দের হোক, এই চাওয়া। আপনার এবং আপনাদের মঙ্গল ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি সব সময়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY