রাষ্ট্র যে কারনে সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে ভয় পায়

0
4200

কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে বাঙালীর পালস্‌ ধরতে পেরেছেন কে? খুবই গোলমেলে প্রশ্ন,আমি মানি এবং একই সাথে তর্ক সাপেক্ষ। কিন্তু আমার ধারনা এই জাতির শিরায় শিরায় ঢুকে তাকে সহজে অনুবাদ করতে পেরেছেন দু’জন ব্যাক্তি। এক- আহমদ ছফা এবং দুই- হুমায়ুন আজাদ।

সাম্প্রতিক সময়ে এই বাংলাদেশের রাজনীতিকে সবচাইতে সুন্দর করে ব্যবচ্ছেদ করেছেন কে?

এই প্রশ্নর উত্তরও যে একেবারে স্মুথলি দেয়া যাবে তা নয়, কিন্তু আমার মনে হয় বাংলাদেশের চলমান রাজনীতিকে খুবই চমৎকার করে অনুবাদ করেছেন আওয়ামীলীগ সরকারের আক্রমণ, প্রতিহিংসা ও অন্যায়ের শিকার হয়ে নির্বাসনে থাকা মাননীয় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।

গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহে শেষ করলাম আহমদ ছফার ডায়েরী, গত সপ্তাহে শেষ করলাম হুমায়ুন আজাদ প্রবন্ধ সমগ্র আর এই উইকেন্ডে আবার ধরলাম ১৬ তম সংশোধনী বাতিলের রায়। সুতরাং এই তিনজনের প্রভাব এখনো আমার মজ্জায় বিদ্যমান।

১৬ তম সংশোধনী বাতিলের রায় আমি এই নিয়ে ৪ বার ধরেছি। প্রতিটি বারের পড়াতেই নতুন করে কত-শত ব্যাপার যে সামনে আসে যার আসলে কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বক্তব্যগুলো এক কথায় সূঁচালো তীরের মত। ধুম করে এসে বুকে বিদ্ধ হয়।

তিনি তাঁর রায়ের প্রতিটি লাইনে লাইনে এই দেশের রাজনীতি, এই দেশের রাজনীতিবিদ্দের চিন্তার ধারা, ক্ষমতার ধারালো ফলা দিয়ে বার বার রাষ্ট্রের প্রতিটি অর্গানে তাঁদের আক্রমণ এগুলোকে একটা একটা ধাপে ব্যবচ্ছেদ করেছেন।

এই রায়ে তাঁর অংশটি ছিলো এবসোলিউট অথোরোটেটিভ। একজন নবীন আইনজীবি হিসেবে এবং আমার আইন জগতের এই প্রাথমিক জার্নিতে আমি আনন্দিত এই ভেবে যে এমন একটা রায় আমি পড়েছি এবং আমাদের সময়ে এই রায় নিয়ে এত আলোচনা হয়েছে।

অনেকেই আমাকে খুবই কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কেন এই রায়টির পক্ষে কিংবা সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পক্ষে এতটা সরব? সরকারী সামরিক গোয়ান্দারা পর্যন্ত আপনার এই সরব হওয়া নিয়ে কনসার্ন্ড। অন্য কেউ হলে অনেক আগেই থামিয়ে দিত। আপনি কেন তারপরেও লিখছেন এই রায় নিয়ে? রায়ের পক্ষে?

তাঁরা আমার কাছে সবচাইতে যে জনপ্রিয় প্রশ্নটি করেন সেটি হচ্ছে, “ভাই সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পক্ষে লিখে আপনার লাভ কি”। লক্ষ করবেন শব্দটা, “লাভ” কিংবা প্রফিট।

এইসব প্রশ্নের উত্তর আমার জন্য খুব সোজা। একজন অতি নগন্য আইনজীবি হিসেবে কিংবা একজন আইনের ছাত্র হিসেবে এই রায় আমার জন্য যতটা না কৌতূহলের ঠিক আমার জন্য বেশী বিষ্ময়ের হচ্ছেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহার প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও সাহস।

বাংলাদেশের মত এমন একটা অন্ধ ধর্মের দেশে একেবারে ক্ষুদ্র একটা ধর্ম ও জাতির মধ্যে থেকে সম্পূর্ণ নিজের আলোতে উঠে আসা খর্বকায় একজন ব্যাক্তি যিনি গত প্রায় ৫/৬ বছর ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত। যার বয়স প্রায় ৭০ এর কাছে।

তিনি রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু থোরাই কেয়ার করেছেন, সামরিক গোয়েন্দাদের পাত্তা দেননি, কিছু অশিক্ষিত ও মূর্খ সমালোচকদের ইগ্নোর করেছেন । জীবনের অনেক সম্ভাব্য প্রাপ্যকে দু’হাতে ফেলে দিয়ে কি অবলীলায় জুডিশিয়ারীকে বাঁচাতে মরিয়া হয়েছেন এটা অনুধাবন করতে পারাও বড় আনন্দের।

আমাকে যারা সামান্য থেকে সামান্য পরিমাণ ভালোবাসেন কিংবা আমার লেখা পড়েন অথবা আমাকে যারা ঘৃণা করেন কিন্তু আমার লেখায় আস্থা রাখেন, আমি সবাইকে বলছি, রায়টা আপনারা পড়ুন।

এই রায়ের প্রতিটি শব্দে একজন প্রবীণ বিচারপতি বাংলাদেশের জুডিশিয়ারীকে প্রাণ-পণে বাঁচাতে চাইছিলেন। তিনি চাইছিলেন বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ্দের মত হাঙ্গরদের কাছে এই বিচারালয় যাতে জিম্মি না হয়ে পড়ে। কারন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, যদি বিচার বিভাগ অন্যসব বিভাগের মত গ্রাস হয়ে যায় তাহলে টানেলের শেষ কোনায় যে সামান্য আলো দেখা যায় অল্প অল্প করে, সেটিও নিভে যাবে।

তিনি এটর্নী জেনারেল মাহবুবে আলমকে বলেন, (রায় থেকে অনু লিখন)

জিয়ার সামরিক আমলে সংবিধানে বিসমিল্লাহ ঢোকানো হয়েছে, আপনারা সেটি পরিবর্তন করেন নি, ১৫ তম সংবিধান সংশোধন করেছেন ২০১১ সালে কিন্তু সেখানেও রেখে দিয়েছেন বিচারপতিদের সরাবার সামরিক সময়ের নিয়ম, আপনারা এরশাদের সামরিক আমলের রাষ্ট্র ধর্ম ইসলামকে রেখে দিয়েছেন, আপনারা আইয়ুবের আমলে বিবাহ আইন রেখে দিয়েছেন কিন্তু আপনাদের এখন সব রাগ এসে পড়েছে বিচারপতিদের অভিশংসনের উপর। বলেন তো কেন?

এটর্নী জেনারেল ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, একটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর তিনি দিতে পারেন নি। প্রধান বিচারপতি যাকে অভিহিত করেছেন “ফ্যালাসি” শব্দ দিয়ে।

তিনি মাহবুবে আলমকে জিজ্ঞেস করেছিলেন মাত্র ৫ টা বছর আগে আপনারা সংবিদাহ্নের ১৫ তম সংশোধন করেছেন তখনো আপনারা ৯৬ অনুচ্ছেদ বদলান নি, খোদ ৫ম সংশোধনীর রায়ে ৯৬ অনুচ্ছেদ (যেই অনুচ্ছেদ নিয়ে এত কথা)-কে কন্ডন করে রিটেইন করা হয়েছে। ছিলেন কোথায় আপনি?

যে লোকটা লড়াই করেছে বিচার বিভাগের পূর্ন স্বাধীনতার জন্য তাকে এই ধূর্ত ও চতুর রাজনীতিবিদেরা ব্র্যান্ড করেছে “বঙ্গবন্ধুকে” অবমাননাকারী হিসেবে। সাধারণ জনতার তো খেয়ে কাজ নেই এই ৭৯৯ পাতার রায় পড়বে, সুতরাং এই ধূর্তদের কথা ওদের সমর্থকেরা বিশ্বাস করেছে। আর সেই সাথে রেডিও, টিভিতে তে রয়েছে শামসু মানিকের বয়ান। ব্যাস…হয়ে গেলো…

এই রায় বাংলাদেশের আইন জগতে রয়ে যাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী। তখন হয়ত এই ধূর্ত ও চতুর রাজনীতিবিদেদের কেউ বেঁচে থাকবেন না। আমি নিশ্চিত সেই প্রজন্মের কোনো নবীন আইনজীবি কিংবা গবেষক কিংবা ছাত্র এই রায় নিয়ে গবেষনা করবেন পরম বিষ্ময় আর মুগ্ধতা নিয়ে।

এই বাংলাদেশের মত একটা দেশে একজন বিচারপতি স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এসব কথা বলে গেছেন কি অবলীলায়, ভাবা যায়?

শুরু করেছিলাম বাঙালীর পালস্‌ কে ধরতে পেরেছেন সাহিত্যকদের মধ্যে তা নিয়ে। শেষও করি তাঁদের একজনকে নিয়ে। প্রিয় লেখক হুমায়ুন আজাদ তাঁর “বাঙালী-একটি রুগ্ন জনগোষ্ঠী” প্রবন্ধে বলে গেছেন-

“বাঙালির প্রিয় দর্শন হচ্ছে বেশি বড়ো হোয়ো না ঝড়ে ভেঙে পড়বে, বেশি ছোটো হোয়ো না ছাগলে খেয়ে ফেলবে;- তাই বাঙালি হ’তে চায় ছাগলের সীমার থেকে একটু উচ্চ,- নিম্নমাঝারি। বাঙালির এ-প্রবচনটিতে তার জীবনদর্শন বিশুদ্ধরূপে ধরা পড়ে। এতে নিষেধ করা হয়েছে অতি-বড়ো হওয়াকে, কেননা তাতে ঝড়ে ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা; আর নিষেধ করা হয়েছে খুব ছোটো হওয়াকে, কেননা তাতে সহজেই বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা। তাই মাঝারি হ’তে চায় বাঙালি; বাঙালি মাঝারি হওয়ার সাধক। মাঝারি হতে চাইলে হওয়া সম্ভব নিম্নমাঝারি; এবং বাঙালির সব কিছুতেই পরিচয় পাওয়া যায় নিম্নমাঝারিত্বের”

রাষ্ট্র তাই সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে বড় হতে দেয়নি। সম্পূর্ণ নিজের আলোতে আলোকিত হওয়া এই জ্ঞানী ব্যাক্তিকে রাষ্ট্র তার শত্রু মনে করেছে। লেলিয়ে দিয়েছে জলপাই।

ছাগলের সীমার নীচের সরকার তাই সব সময় চেয়েছে তার নিজের আদর্শের থেকে নীচে রাখতে সুরেন্দ্র কুমারকে। আর সে কারনেই তারা প্রচন্ড ভয় পেয়েছে সুরেন্দ্র কুমার সিনহার এই রায়কে। তারা মনে করেছে তাদের সকল জারি-জুরি ফাঁশ করে দিয়েছে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তারা ভেবেছে এই বুঝি তারা শেষ।

আর এ কারনেই তারা ভয় পেয়ে এই মহৎ ব্যাক্তিটিকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে, অপমান করেছে। অপবাদ দিয়েছে।

Facebook Comments

Comments

comments

SHARE
Previous articledownload 16th amendment judgement
Next articleডি জি এফ আই থামবে কবে?
উপরের প্রকাশিত লেখাটি আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনার ফলাফল। লেখাটি আপনার ভালো নাও লাগতে পারে, পছন্দ না-ও হতে পারে। আমার সাথে হয়ত আপনি একমত হবেন না কিন্তু আমি ধন্যবাদ জানাই আপনি এই সাইটে এসেছেন, আমার লেখাটি কষ্ট করে পড়েছেন আপনার সময় ব্যয় করে, এটিও পরম পাওয়া। সবার মতামত এক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। দ্বিমত থাকবে, তৃতীয় মত থাকবে কিংবা তারও বেশী মতামত থাকবে আবার সেটির পাল্টা মতামত থাকবে আর এইভাবেই মানুষ শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের চিন্তাকে খুঁজে ফেরে নিরন্তর। আর লেখাটি ভালো লাগলে কিংবা আপনার মতের সাথে দ্বন্দ্বের তৈরী না করলে সেটি আমার জন্য বড় সৌভাগ্য। আমি সেটির জন্য আনন্দিত। আপনাদের উৎসাহে, ভালোবাসাতে আর স্নেহেই এই লেখালেখির জগতে আসা। "নিঝুম মজুমদার" পাঠ শুভ হোক, আনন্দের হোক, এই চাওয়া। আপনার এবং আপনাদের মঙ্গল ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি সব সময়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY