ভুল সময়

0
398

উৎসর্গঃ ব্যারিস্টার আশফাক আহমেদ। এত কম বয়সের জন্য কেন পৃথিবীতে এসেছিলে ছেলে?

এক

চমকে তাকাই পেছনে। কেউ কি আমাকে ডাকলো? মাহমুদ ভাইয়ের গলার ডাকের মতন কিছুটা। মাহমুদ ভাই আমাকে এভাবে ডাকতেন। একটু টেনে টেনে দীর্ঘ সময় নিয়ে, “নি—ঝু—ম, খ্যালতে আইবা না আজকা বিকালে?” কত বয়স ছিলো মাহমুদ ভাইয়ের সে সময়? ২৫? ২৬? নাকি আরো কম? আমার ঠিক মনে নেই।

আমি ঠিক যে জায়গায় দাঁড়িয়ে ঠিক সে যায়গায় তিনটে স্ট্যাম্প পোতা হোতো কংক্রীট খুঁড়ে। কংক্রীট খুঁড়ে বলাটা হয়ত ঠিক হচ্ছে না কেননা শক্ত রাস্তায় এই তিনটি ছোট গর্ত আমরা করে নিয়েছিলাম রাস্তাটি বানাবার সময়ই। রাস্তা বানাবার ইঞ্জিনিয়ারটি আমাকে আর রিমনকে জিজ্ঞেস করেছিলো, “কি খোকা ক্রিকেট খেলবে?” আমি মাথা নেড়েছিলাম। রিমন অবশ্য বলেছিলো সে ক্লাস এইটে পড়ে। মানে দাঁড়ালো তাকে খোকা বলাটা ঠিক হচ্ছে না। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব মিষ্টি হেসে হেঁটে গিয়েছিলেন সামনে। ছোট সে যায়গাটিতে যাতে গন গনে কালো পীচ না দেয়া হয় সেটি কর্মীদের বলে দিয়েছিলেন তিনি।মাহমুদ ভাই কি খুব জোরে বল করতেন? নাকি স্পিন? অনেক চেষ্টা করেও মনে পড়লো না। জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে মনে করতে করতেই তিনবার রিকশা চলে গেলো পাশ দিয়ে। একটা রিকশা প্রায় পায়ে উঠিয়ে দিয়েছিলো আরেকটু হলেই। “আরে মিয়া, সইরা খাড়ান”, আমি সরে দাঁড়াই। এত রিকশা আগে ছিলোনা এখানে। সরে যে দাঁড়াবো, সে সুযোগও নেই। আমার পুরো শরীরের চারদিকে ঘিরে শুধু ন তলা, সাত তলা আর আটতলার দীর্ঘ সীমানা। অসংখ্য ছোট ছোট এপার্টমেন্ট, অসংখ্য অচেনা মুখ। পাশের মসজিদটিও ছিলোনা। এখানে আরো একটি মসজিদ আছে সামনে এগোলেই। তারপরেও এই নতুন মসজিদ যে এই এলাকার মানুষদের ওজন বাড়াবার জন্য তা বেশ বোঝা গেলো। আসলে ধর্ম ব্যাপারটাই তো ওজনদার। প্রার্থনার স্থান ওজনদার কিংবা সম্মান বাড়াবার মাধ্যম না হলে কি চলে? একই সময়ে একই এলাকা থেকে শতাধিক মসজিদের উচ্চ শব্দের আজান আমাদের ধর্মকে নাড়া দেয়। আমরা নামাজ পড়তে যাই। হুলুস্থুল বেঁধে যায় আমাদের জীবনে। আমাদের ব্যাপারই আলাদা। আমরা বাঙালী মুসলমান। বুড়ো মত এক ভদ্রলোক নামাজ পড়তে যাবার সময় রীতিমত কাছে এসে দেখে গেলো আমাকে। স্ক্যানিং মেশিনের মত স্ক্যানিং-ই বলা চলে। আমাকে খুব চেনা চেনা লাগে হয়ত। উনি আমাকে চিনতে পারেন নি। আমি অবশ্য তাঁকে ঠিক ঠিক চিনে ফেলেছি। শামীম মামা। আমাকে বাকীতে চকলেট দিতেন, মিল্কভিটার আট টাকার প্যাকেট টা দিতেন।

আমার পরিচয় দিতে ইচ্ছে হয়নি। আমি জিজ্ঞেশ করি, “কাউকে খুঁজছেন?”, শামীম মামা মাথা নাড়েন অবাস্তব চরিত্রের মতন। অস্ফুট স্বরে কি একটা বলেন। ঠিক বোঝা যায় না। কিছুটা হতাশা নিয়ে হয়ত। এই দশ বছরে শামীম মামা অনেক বুড়ো হয়ে গিয়েছেন। দাড়ি রেখেছেন, গোঁফ রেখেছেন। চামড়ায় বয়সের দগদগে চিহ্ন। আমি পুরোনো অবয়বেই খুব মনে রাখতে চেয়েছিলাম আমাদের চির রসিক এই শামীম মামাকে।

আমাকে দেখলেই তিনি বলতেন, “কি মামলা দিবা উকিলের পোলা? ফৌজদারী না দেওয়ানী? কয়া ফালাও”, আমি সে সময় ফৌজদারী আর দেওয়ানী বুঝতাম না। আমি বুঝতাম বাকীতে আট টাকার মিল্কভিটা।

দুই

মাহমুদ ভাই রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছেন মাস ছয়েক আগে। বাইক চালিয়ে আসছিলেন কাজ সেরে। মাহমুদ ভাইয়ের একটা ছেলে ছিলো দু’মাস বয়সের। মাহমুদ ভাই আর বাড়ী ফেরেন নি। সবাই বলে এই শহরে অনেকেই হারিয়ে যায়। কেউ বাসের নীচে পড়ে, কেউ ট্রাকের। মানুষের ঠিক ততটা মনে থাকেনা। প্রতিদিন অত ঝক্কির পর এসব মনে রাখাটা যন্ত্রনার। আমারো তাই মনে হয়। আমিও মাহমুদ ভাইয়ের স্মৃতিকে চাপা দিয়ে সামনের দিকে তাকাই। ব্যাটিং ক্রীজের ঠিক সামনাসামনি রিমনদের একটা সুপারি গাছ ছিলো। গাছটি নেই। রিমনদের পাঁচ তলা সিরামিক ইটের দালানটির সীমানা এখন গাড় লালচে রঙ্গের টাইলস দিয়ে বাঁধিয়ে দেয়া হয়েছে। আগে ছিলো ইটের। ইটের গায়ে খোদাই করে লেখা ছিলো বি সি ডি বা এ বি সি এই জাতীয় কিছু একটা। এখন সেটি নেই। আছে ঝকঝকে টাইলসের সীমানা। বাড়ীর নাম ফলকে এখনো লেখা রয়েছে “আনার”, সেই আগের মতন। খালাম্মার নাম। খালাম্মা নেই এখন। তাঁর কবর কোথায় হয়েছে আমি জানিনা। পাবনাতে মনে হয়। খালাম্মা পাবনার মেয়ে ছিলেন। গেটের সামনে ইকবাল দাঁড়িয়ে। অনেক দিন ধরে ইকবাল এখানে। ইকবালের প্রধান কাজ ছিলো এ বাড়ীর সামনে দিয়ে যেই যাক তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা। ইকবালের চোখ মেয়েদের খুব অস্বস্তির ছিলো। আমার বোন খুব বিরক্ত হোতো। একদিন বলেই বসেছিলো, “এই তুমি এভাবে তাকিয়ে থাকো কেন সবার দিকে?” ইকবাল কি আহত হয়েছিলো সেদিন? কি জানি? ইকবালকে জিজ্ঞেস করা হয়নি কখনো।

ইকবালের তীক্ষ্ণ চোখ আর নেই। আমাকে দেখে চিনতে পারেনি।

-কেমন আছো ইকবাল?

-জ্বী ভালো আলহামদুলিল্লাহ। কাকে চান?

-রিমন আছে?

-না, বরিশাল শ্বশুর বাড়ী। কালকে আসবে। আপনে কে?

-আমি? হা হা। আমি কেউ না ইকবাল। পরে আসব।

-নিঝুম ভাই না?

আমি সামনে আগাই। পেছনে ইকবালের কাশির শব্দ শুনতে পাই। আমার মত বাজে কফ জমেছে বুকে। শব্দ শুনে বুঝি। ওর ট্রেভিক্স খাওয়া দরকার। ৬ দিনে ৬ টা ঔষধ। ডাক্তার বলেছে আমাকে। শীতও পড়েছে ঢাকায়। চারিদিকে কুয়াশা। আমি ম্লান হেসে এগিয়ে যাই। সিফাতের রুমে আলো জ্বলছে না। সিফাত কি ঘরে নাকি অফিসে? খুব পরিশ্রমী আর মেধাবী ছেলে। ঘরে নেই সিফাত। আর ওপরে উঠা হয় না আমার।

এলাকার দারোয়ান ভদ্রলোক অনেক বৃদ্ধ। আমাকে দেখে সালাম দেয়। আমি দেই না। দারোয়ান শ্রেণীর লোকদের আমরা সালাম দেই না। আমার আব্বা দিতেন না, আজিজ চাচা দিতেন না, জহির চাচা দিতেন না। কেউই দিতেন না। দারোয়ান চাচা এলাকার চাঁদায় বেঁচে থাকা বেতনভূক কর্মচারী। তাঁকে সালাম দিলে সম্মানহানি হয় খুব সম্ভবত। সালাম পেয়ে আমি অস্বস্তিতে ভুগি।

“চাচা ভালো আছেন?” আমি আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করি। এবার দারোয়ান চাচা অস্বস্তিতে ভোগেন। বুঝতে পারি। আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন সন্দেহের দৃষ্টি নিয়ে। আমি সন্দেহের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকি আমার চারপাশে। এক ধরনের ঘোর লাগা সন্দেহ। এই এলাকায় আমাকে কেউ চিনতে পারেনা, আমিও কাউকে চিনতে পারিনা। এটা কি কোনো ব্যাথাবোধের গল্প কিংবা স্মৃতির? আমি কি যে যায়গায় আসবার কথা, সেখানে এসেছি? নাকি হারিয়ে গেছি?

বুঝতে পারিনা।

তিন

হান্নান সাহেব তার তিনতলা বাড়ীটির নীচতলায় মেয়েদের মাদ্রাসা করেছেন তাঁর স্ত্রীর তীব্র অনুরোধে। হান্নান সাহেবের স্ত্রী অনেক বদরাগী ছিলেন। তিনি একটি আর্মি বাহিনী খুলে ফেললে যৌক্তিক হোতো। মাদ্রাসার ব্যাপারটা ঠিক বুঝা যাচ্ছে না। আমি আধো ঘুমে শুনতে পাই নানান শব্দ। আমার ঘরের জানালা খুল্লেই এই শব্দ আরো তীব্র হয়ে উঠবে। তারো থেকে তীব্র হবে মশাদের উৎপাত। আমি ভীষন ভয় পাই মশাকে। “আলিফ জের উ…আলিফ জের উউউউউউউ…বা জের বুউউউউউউউ…বা জের বুউউউউউউ…” হুইসেলের মত তীব্র শব্দ আসতে থাকে। আমি শব্দ পেয়ে জেগে উঠি। মাঝে মধ্যে বাংলা সিনেমার গান ভেসে আসে। “এক্টাই কথা আছে বাংলাতে…ও বন্ধু আমার…ও বন্ধু আমার…” অনেক আগের গান। এরা পেলো কোথায়? আমার মত হারিয়ে যাওয়া কেউ কি আছে এখানে? সাহস করে জানালা খুলে ফেলি। আমার চেহারা দেখে মাদ্রাসার জানালা বন্ধ হয়ে যায়। একটি কিশোরী উঁকি দিয়ে দেখে। কিশোরী? বয়স কত মেয়েটার? তেরো? চৌদ্দ? আরো অনেক মেয়েদের হাসির আওয়াজ শুনতে পাই। সবাই জড়ো হয়েছে। সারাদিনে বাইরের কাউকে দেখতে পায়না সম্ভবত…

এত সকালে ছাদে কেউ ওঠেনা। আমি উঠি। আমার স্বস্তি লাগে তাতে। আজকাল কি কেউ ছাদে ওঠে? জানিনা। তন্বীদের ছাদ দেখা যায় আমাদের ছাদ থেকে। তন্বীর বিয়ে হয়ে গিয়েছে। একটা মেয়ে আছে। তন্বী এখন ডেন্টিস্ট। বাবার বাড়ীতে নেই হয়ত। এখানে এলে কি ও ছাদে ওঠে আগের মতন? ঘুরে বেড়ায় আগের মতন? তন্বীর মত আর কেউ কি এখন ছাদে ওঠে এখন? কোনো কিশোর কি অপেক্ষা করে সেই মেয়েটির জন্য? ঠিক তন্বীর জন্য যেমন আমি করতাম। কত বছর আগের কথা এটি? ১৬ বছর? কিংবা ১৭? নাকি ১৯? মনে নেই। আমার কিছু মনে থাকেনা শুধু একটা দুঃসহ স্মৃতি ছাড়া। তন্বীরা এই এলাকা ছেড়ে চলে গেলো নিজেদের বাড়ী ভাড়া দিয়ে। তন্বী কাকে যেন ভালোবাসলো। শুনেছিলাম। আর কিছু জানবার আগ্রহ হয়নি আমার। আমি তখন লন্ডনে জীবনের জন্য লড়ছি। আজকে থেইমস্মিডে তো কালকে গ্রীনউইচ কিংবা তারপর দিন একটি চাকরির জন্য বসে আছি ইলিং স্টেশনের পাশে কোথাও।

আমি আর ওদের বাড়ীর দিকে তাকাই না। অনেক আগের দুঃখ নতুন করে জাগাবার কোনো মানে হয়না।

দুঃখ ? সেটি কি পরাজয় ছিলো? আমি কি স্কেপিস্ট? হয়ত…

শেষঃ

তানিম অনেক ব্যাস্ত থাকে। দেখা করবার সময় করে উঠতে পারেনা। আমি বুঝতে পারি। তানিম আমার প্রিয় বন্ধু। তানিম একা না। আসলে কারো এখন তেমন সময় নেই এই শহরে। আব্বা কোর্টে যাবে একটু পর। আম্মা নামাজ পড়ছে। আর সবাই ঘুমুচ্ছে। আমি জেগে আছি। এ ঘর থেকে ও ঘরে যাই। আমি কি যেন খুঁজি। আমি কি আসলেই কিছু খুঁজি? আমি বুঝতে পারিনা।

কার যেন ডাক শুনতে পাই। মাহমুদ ভাইয়ের কি? “নি—ঝু—ম, খ্যালতে আইবা না আজকা বিকালে?”,ধূর! মাহমুদ ভাই তো নেই। আমি তারপরেও খুঁজি এ ঘর থেকে ও ঘরে। এখানে আমার পড়ার টেবল ছিলো, এখানে আমার গান শুনবার মিউজিক প্লেয়ার, ঠিক এই যায়গায় আমার বইয়ের র‍্যাক। এখন সেসব নেই। এ বাড়ীতে পড়বার মত আর কেউ নেই। সবার পড়ালেখা শেষ। আমি তবুও খুঁজি কিছু একটা। আমি ব্যালকনিতে কাক দেখি। এটা কি আমাদের বাসার সামনের সেই শিমুল গাছের কাকটা? ও কি বুড়ো হয়ে গিয়েছে? মনে রেখেছে আমাদের কিংবা আমাকে? ভাবতে ভাবতেই কাকটা উড়ে যায়। আমি হাল ছাড়িনা। ঘরের প্রতিটি স্থানে আমি খুঁজি। আমি জানিনা আমি কি খুঁজছি। তবে আমি কিছু একটা খুঁজতে থাকি।

একটা কিছু পেয়ে যাব নিশ্চই…

Facebook Comments

Comments

comments

SHARE
Previous articleShadhin Bangla Betar Discussion: ICTBD
Next articleNijhoom Majumder RE: Why ICTBD instead of taking it to ICC
উপরের প্রকাশিত লেখাটি আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনার ফলাফল। লেখাটি আপনার ভালো নাও লাগতে পারে, পছন্দ না-ও হতে পারে। আমার সাথে হয়ত আপনি একমত হবেন না কিন্তু আমি ধন্যবাদ জানাই আপনি এই সাইটে এসেছেন, আমার লেখাটি কষ্ট করে পড়েছেন আপনার সময় ব্যয় করে, এটিও পরম পাওয়া। সবার মতামত এক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। দ্বিমত থাকবে, তৃতীয় মত থাকবে কিংবা তারও বেশী মতামত থাকবে আবার সেটির পাল্টা মতামত থাকবে আর এইভাবেই মানুষ শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের চিন্তাকে খুঁজে ফেরে নিরন্তর। আর লেখাটি ভালো লাগলে কিংবা আপনার মতের সাথে দ্বন্দ্বের তৈরী না করলে সেটি আমার জন্য বড় সৌভাগ্য। আমি সেটির জন্য আনন্দিত। আপনাদের উৎসাহে, ভালোবাসাতে আর স্নেহেই এই লেখালেখির জগতে আসা। "নিঝুম মজুমদার" পাঠ শুভ হোক, আনন্দের হোক, এই চাওয়া। আপনার এবং আপনাদের মঙ্গল ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি সব সময়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY