ট্রাইবুনালের বিচার নিয়ে যেসব তথ্য আড়ালে থেকে যায়

0
2804

বিচারটা শুরু হবার পর থেকে যে কমন প্রশ্নটা ইনবক্স, সামনাসামনি, টেলিফোনে, ব্লগে, টিভিতে কিংবা রেডিওতে প্রত্যেকটি সময়ে পেয়েছি সেটি হচ্ছে, “ভাই এগুলা কি আসলেই ১৯৭১ সালে অপরাধ করেছিলো? এত বড় দাড়ি, এত বড় টুপি, ইসলামের পক্ষে কথা বলে, এরা কি ভাই আসলেই অপরাধ করেছে?”

প্রথম প্রথম অবাক হতাম।কিন্তু গত ৬ বছর ধরে এত অদ্ভুত সব প্রশ্ন আর ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি যে আসলে উপরে উল্লেখিত প্রশ্নটাকে এক পর্যায়ে নিতান্ত শিশুসুলভ মনে হতো। এইতো সেদিন, এক আলাপে এক ভদ্রলোক বলে বসলেন “সাইদী সাহেব নির্দোষ, তার উপর জুলুম হইসে। কসাই কাদের আর কাদের মোল্লা এক না”

আমি কথা বেশী বাড়াইনি। আমার বইয়ের শেলফ থেকে ৬০০ পাতার উপরে সাঈদীর আর ৭৯০ পাতার কাদের মোল্লার বাঁধাই করা রায় দুইটা ভদ্রলোকের সামনে এনে রাখলাম। মোলায়েম স্বরে বললাম, “দেখান তো ভাই কোথায় লেখা আছে আপনার বলা এসব কথা?”

এই বিশাল দুইটা রায় দেখে বেশীরভাগ সময়-ই অপর পক্ষ থেকে সাড়াশব্দ কমে যায়, প্রাথমিকভাবে যে সুতীব্র তেজ নিয়ে কথা বলা শুরু করে সেগুলোর গতি ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকে। বুঝতে পারে কার সাথে কিভাবে কথা বলতে হবে। আমি এমন তরল অবস্থার সুযোগ নেই সব সময়। রায় খুলে একের পর এক ঘটনা বলি, অভিযুক্তরা কি কি সাক্ষী এনে, কোথায় কোথায় ধরা খেয়েছে সেসব বলি। এদের খাবি খাওয়া উপভোগ করতে থাকি।

পুরো ব্যাপারটাতে কাজ হয়। প্রশ্নকর্তা চুপ হয়ে যায়, কথা অন্য দিকে ঘোরায়। যেমন লণ্ডনের ওয়েদারের কোনো মা বাপ নাই, থেরেসা মে’য়ে খুব কড়াকড়ি করতেসে ছাত্রদের জন্য এইসব…

আমার সামনে চুপ হয়ে গেলেও আমি নিশ্চিত অন্য কোথাও অন্য কাউকে এমন বোকা মনে করে আবারো বলে বসবে সেই একই কথা, ভাই “এই কাদের মোল্লা সেই কাদের মোল্লা না”

আসলে আফসোস লাগে মাঝে মধ্যে। এইসব জামাতী এপোলজিস্টদের কথা বাদই দিলাম। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অসংখ্য ছেলে মেয়ে কোনো মামলার রায়ের কাছে গিয়েও দেখেনা। পত্রিকাও ভালো করে পড়েনা। তাঁরা মনে করে আইনী প্যাঁচ। পড়ে কি লাভ?

অথচ যদি তাঁরা রায় কিংবা বিচার বিষয়ক খবর গুলো পত্রিকায় নিয়মিত পড়তেন একটু আগ্রহ নিয়ে তাহলে কত হাজার হাজার নতুন তথ্য যে তারা জানতেন কিংবা বুঝতেন সেটি বলে শেষ করা যাবে না। রায় পড়লে তারা জানতে পারতেন-

(১) একাত্তরের পরে জন্ম নিজামীর ছেলে নাজিব মোমেন তার বাবার একাত্তরের কর্মকান্ডের ব্যাপারে সাক্ষী দিতে এসে স্বীকার করে নিয়েছে যে তার বাবা ছাত্র সংঘের প্রেসিডেন্ট ছিলো।

(২) একাত্তরের পরে জন্ম কামারুজ্জামানের ছেলে ওয়ামী তার বাবার পক্ষে সাক্ষী দিতে এসে শেষ পর্যন্ত তাদের চিরশত্রু মুনতাসীর মামুন স্যারের বই নিয়ে এসেছিলো তার বাবার পক্ষে বলতে গিয়ে। সেখানে সে বুঝাবার চেষ্টা করেছিলো মুনতাসীর মামুন স্যারের বইতে কামারুর নাম নেই তাই কামারু রাজাকার নয়। অথচ এই ট্রাইবুনালের প্রতিটি সময় রাজাকারদের আইনজীবি চিৎকার করে বলেছে, গল্পের বই, ইতিহাসের বই এগুলো সাক্ষ্য হিসেবে এনে আন্তর্জাতিক মান ভঙ্গ হচ্ছে। কিন্তু নিজেদের বেলায় ঠিকি মুনতাসীর স্যারের বই নিয়ে হাজির।

(৩) কাদের মোল্লার পক্ষের সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে এসে বলেছিলো তারা কাদের মোল্লাকে কতদিন দেখেছে কিংবা কিভাবে দেখেছে। আদালত পর্যালোচনা করে দেখে যে সাক্ষীদের বক্তব্য আর কাদের মোল্লার বক্তব্য দুটো দুই সময় নির্দেশ করছে। আদালতের ভাষায়-

Having compared the testimonies of D.Ws 1, 2, 3 and 6, all of whom basically tried to prove the Appellant’s alibi, I have detected catastrohic discrepancies, capable of rendering their version to nullity. The appellant himself said that he ran the business at the market place at his village home upto the end of 1972, whereas D.W. 3 asserted that the Appellant was in the business for a total period of one year, which means upto March 72. While the Appellant insisted that he returned to the hall to take the practical exms in July 71 for a period, which on calculation appears to have been in excess of 4 weeks, D.W. 6, who affirmed that he stayed back in the hall and performed as the Imam of the Hall’s mosque, stated that the Appellant remained in the village all through the period and that he next saw the Appellant only at the end of 1972. D.W. 2 and D.W. 3 also said that they kept seeing the Appellant in his business venue in the market place throughout the period i.e. without intermission. There are yet two other plausible reasons why I find the alibi evidence incredible.

কাদের মোল্লার মামলার রায়টি আপনারা পড়ে দেখলে দেখবেন সাক্ষীরা অসংখ্যবার কাদের মোল্লার সাথে সাথে আক্তার গুন্ডা, নেহাল, হাক্কা গুন্ডার কথাও বলেছে। তারা সবাই সরাসরি কাদের মোল্লাকে নিজ চোখে শনাক্ত করে, দেখে আদালতকে নিশ্চিত করেছে যে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ব্যাক্তিটিই সেই কুখ্যাত কাদের মোল্লা। লক্ষ্য করে দেখুন, ৪১ বছর আগে আক্তার গুন্ডাও তার বিচার চলাকালে বলেছিলো যে, সেইসময় সে পাকিস্তানে বেড়াতে গিয়েছিলো। হত্যাকান্ডের কথা কিছু সে জানেই না। আবার ৪১ বছর পর আসামী কাদের মোল্লাও বলেছিলো যে, ঘটনার সময় সে ফরিদপুরে ছিলো এবং সে এই হত্যাকান্ডের, গণহত্যার কিছুই জানে না। অবস্থা দৃষ্টিতে আসলে মনে হয়, এই গণহত্যা, এই নৃশংসতা আসলে ভূত এসে করে দিয়ে গিয়েছে। ভারতীয় ঐ সিনেমাটির মত, এত মানুষের সামনে জেসিকাকে খুন করবার পরেও প্রমাণ নেই কিংবা কেউ ভয়ে সাক্ষ্য দিতে আসে না। অবস্থা দৃষ্টিতে এক পর্যায়ে মনেই হয়েছিলো, জেসিকাকে কেউ খুন করেনি। চলচ্চিত্রটির নাম ছিলো “নো ওয়ান কিল্ড, জেসিকা”

কাদের মোল্লা নাকি মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়েছিলো। কি ভয়াবহ তথ্য!! অথচ এই ব্যাপারে তার হয়ে যেসব গাঁট কাটাল বন্ধুরা এসেছিলো সাক্ষী দিতে তারা বলতেই পারেনি কোনো তথ্য। একজন আবার বলেছে যে কাদের মোল্লা নাকি ফরিদপুরে এক বছর ধরে ব্যাবসা করেছে। অথচ কাদের মোল্লা নিজেও তা দাবী করেনি। কি ভয়াবহ!!! মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে জামাতীরা বার বার প্রোপাগান্ডা ছড়ায় যে এই মামলায় প্রসিকিউশনের সাক্ষীরা সব শোনা কথা বলছে কিংবা শোনা কথায় সাক্ষী দিচ্ছে, আপনাদের জেনে রাখা ভালো যে কাদের মোল্লার পক্ষে যারা সাক্ষী দিতে এসেছে তারাও বেশীর ভাগ শোনা বা হিয়ার্সি সাক্ষ্য।

আদালত বলেন-

(a) The Appellant quite emphatically stated that he was the private secretary to Mr.Golam Azam, the then head of Jamate Islam, he was head of the Shahidulla Hall unit of Islami Student Organisation, the student organisation, which was Jamate Islami’s ideological apostle, and acted in accordance with Jamats’ sermons. Assertion by a number of P.Ws that Mr. Golam Azam was a candidate for Parliamentary election that took place in 1970, as a Jamat nominee, has never been disputed by the defence side. It is only natural that as Mr. Golam Azam’s private secretary and Jamat’s ideological follower, he would have devoted a great deal of time to campaign for Mr. Golam Azam, yet the Appellant did not utter a word about Mr. Golam Azam’s 1970 election though he gave vivid description of what he claims to have been doing in 1970, which makes his deposition doubtful.

(b) Secondly, in the light of the appellant’s admitted background it is inconceivable that the Appellant would have had taken armed training to liberate Bangladesh from Pakistani suzerienty.

(c) Appellant’s subsequent activities such as his continuation as a Jamat high up after it re emerged as a political party in 1979 proves that he did not deviate from Jamat’s philosophy and therefore his claim to have had taken armed training to fight Pak army to Liberate Bangladesh is simply absurd and devoid of any credibility whatsoever. This patently concocted claim goes to tarnish the very root of his credit rating as a witness.

আসামী পক্ষ সাক্ষীর ক্রস এক্সামের সময় প্রশ্ন করতে ভুলে গেছে। এটাও এখন ট্রাইবুনালের দোষ। আসামী পক্ষের আইনজীবিরা প্রশ্ন করবে না সময় মত কিন্তু পরে গিয়ে বলে, আমরা কিছু প্রশ্ন করতে ভুলে গেছি। আমাদের আবারো প্রশ্ন করবার সুযোগ দেয়া হোক। যখন এই কথা তারা বলেছে তখন অলরেডী আরো অনেক প্রসিকিউশনের সাক্ষীর ক্রস এক্সাম করা শেষ। ট্রাইবুনালটা যেন কাদের মোল্লার আর তার আইনজীবিদের মামার বাড়ীর আবদারের একটা পীঠস্থান।

এই বিষয়ে আদালত বলে-

Mr. Razzak submitted that the Appellant’s learned Advocate that was initially engaged failed to put some pertinent questions to this witness of the prosecution and thus, she should now be made available to reply to those missed out questions in the interest of justice. Mr. Razzak tended to place paramount reliance on the ratio of the UK Court of Appeals’ decision in the case of Birmingham Six (1991 Cr. Appeal Review, Page 287), but we find no element in the case in hand to relate the same with the decision in Birmingham Six case, which, succinctly is that if new evidence surfaces after a trial or even appellate procedure is concluded, a trial de-novo can nevertheless be re-commenced. [আপীলেট ডিভিশান রায়, পৃষ্ঠা ৭৪৫, ৭৪৬]

He also complained that Quader Molla’s name is not figured in Jallad Khana documents. Admittedly these claimed documents were never adduced as evidence and never formed part of the proceeding. I can not accept as evidence some unauthenticated photocopies, which were never proved. I do not know what they are whence they came, who made them. These are obscure photocopies of some papers from unidentified source. [আপীলেট ডিভিশান রায়, পৃষ্ঠা ৭৪৭]

আবার জল্লাদ খানার এই জবানবন্দীর কথা আসামী পক্ষ ২০১২ সালের ১৭-ই অক্টোবর জানতে পারলেও তারা এই ব্যাপারে আবেদন কয়রে ৮-ই জানুয়ারী ২০১৩,[ প্রশ্ন দাঁড়ায়ঃ এই আবেদন করতে ৩ মাস কেন লেগেছে? ভুয়া কাগজ তৈরী করতে?]

আদালত এই বিষয়ে বলেন-

To coagulate the Tribunal’s view, we would add that the Appellant and / or his learned Advocates came to know of Jallad Khana records at the latest on 17th October 2012, the date on which P.W. 11’s examination was concluded, because that witnesses explicitly stated that she picked up information from the Mirpur Jallad Khana on some P.Ws. yet they remained mum for nearly three months before filing the subject application. This inordinate delay is inexplicable and can quite sensibly be looked at as a delaying device, given that the defence filed numerous unmeritorious applications during the trial that subsisted for a year after the assumption of cognizance.

(৪) কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনীত প্রথম অভিযোগ মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র পল্লব হত্যা মামলায় এই কাদের মোল্লার ছেলে হাসান জামিল পল্লবের ভাইয়ের স্ত্রী মোসাম্মৎ সাহেরাকে তার বাবার [কাদের মোল্লা] পক্ষে সাক্ষী দেবার জন্য রাজী করায়।[ডিফেন্স সাক্ষী নাম্বার-৪] আরো ইন্টারেস্টিং তথ্য হচ্ছে, ডিফেন্সের এই সাক্ষী মোসাম্মৎ সাহেরা প্রথমে ছিলো প্রসিকিউশনের সাক্ষী, অর্থ্যাৎ কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সাক্ষী। কিন্তু এই সাহেরাই আবার পরে কাদের মোল্লার পক্ষে সাক্ষী দেয়। আদালতে মোসাম্মৎ সাহেরা হাতে নাতে ধরা খেয়ে যায় মিথ্যে কথা বলতে গিয়ে। [ ট্রাইবুনালের রায়ের প্যারা ১৮২-১৮৯ দ্রষ্টব্য]

(৫) সাঈদীর পক্ষের সাক্ষী আঁকন ভোর রাতে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে মাঝ নদীতে কে কে নৌকায়, কার লাশ নিয়ে আসছিলো সেটি দেখে ফেলেছে এক অতি আশ্চর্য্য দূরবীনওয়ালা সুপার চোখ দিয়ে। আরো জানতে হলে এখানে ক্লিক করুন।

(৬) মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মুক্তিযোদ্ধারা সাকার গাড়িতে আক্রমন চালায়। এই আক্রমনে নিহত হয় সাকার ড্রাইভার আলী আহমেদ ২০ শে সেপ্টেম্বর ১৯৭১ তারিখে এবং এই হামলায় আহত হয় সাকা। আহত সাকাকে ডাক্তার এ কে এম শফিউল্লাহ চিকিৎসা দেয় চট্রগ্রামের এক হাসপাতালে । সেই ডাক্তার আদালতে সাকাকে দেখিয়ে বলেছে, আমি নিজে সাকাকে চিকিৎসা করেছি মুক্তিযুদ্ধের সময়। যেই ডাক্তার সাকাকে নিজের হাতে চিকিৎসা করেছে সেই ডাক্তার কি তাহলে ভূতের চিকিৎসা করেছিলো? উল্লেখ্য যে এই ঘটনা নিয়ে সে সময় ২৯ শে সেপ্টেম্বর ১৯৭১ তারিখে দৈনিক পাকিস্তানে একটি রিপোর্ট হয় যেটি আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ জমাও দিয়েছে। সালাউদ্দিন কাদের এর গাড়িতে যিনি গ্রেনেড চার্জ করেছিলেন সেই মুক্তিযোদ্ধা, সাক্ষী নাম্বার-১১ নিজে এসে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

(৭) সাকার পক্ষে সাক্ষী দিতে আসা কাইয়ুম রেজা বলছে যে সাকার অপর সাক্ষী মোমেন চৌধুরীর সাথে দেখা হয়েছে জণৈক আশিকুর রহমান নামের একজনের অফিসে করাচীতে। কিন্তু সাক্ষী মোমেন চৌধুরী সাক্ষী দিতে গিয়ে বলেছে যে কাইয়ুমের সাথে তার দেখা হয়েছে কাইয়ুমের বাসায়। দুইজনের বলা গল্প দুই রকম।

(৮) কামারুজ্জামানের বড় ভাই কফিলুদ্দিন এই মামলাতে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলো।  এই কফিলুদ্দি-ই আবার স্বীকার করেছে যে মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পর পর কামারুজ্জামান গ্রেফতার হয় এবং তার তিন থেকে চার মাস পর সে ছাড়া পায়। এখন জেরাতে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হোলো যে একজন ব্যাক্তি যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় কিছুই করেনি এবং গ্রামের বাড়ীতে বসে হাঁস মুরগী পাহারা দিয়েছে সে কেন মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পর পর ঢাকাতে গিয়ে গ্রেফতার হোলো? আইন শৃংখলা বাহিনী বাংলাদেশের এত ব্যাক্তি রেখে কেন তাকেই গ্রেফতার করেছে? উত্তরে সে কেবল ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলো আইনজীবির দিকে।

এই গ্রেফতারের সূত্র ধরে আমি সকল পাঠক/পাঠিকাকে জানাই যে ১৯৭১ সালের ৩১ শে ডিসেম্বরের দৈনিক আজাদ কিংবা ৩০ শে ডিসেম্বরের দৈনিক পূর্ব দেশে কামারুজ্জামানের গ্রেফতার হবার খবরটি বেশ বড় করে প্রকাশিত হয়। সে সময় কামারুজ্জামান সহ আরো ১৪ জন রাজাকার-আলবদর গ্রেফতার হন। শুধু যে পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট-ই রয়েছে তা নয়, বরং রাষ্ট্রপক্ষ ১৯৭১ সালের সময় কামারুজ্জাম্নকে যে গ্রেফতার করা হয়েছিলো সে ঘটনার ডকুমেন্ট আদালতে হাজির করেন যেখানে দেখা যায় কামারুজ্জামানের নাম গ্রেফতারকৃত তালিকায় ২৯৭ নাম্বারে। সুতরাং এটা মানতে আমাদের আসলেই আপত্তি থাকবার কথা নয় যে মুক্তিযুদ্ধের পর পর কামারুজ্জামান নামের ১৯ বছরের ছোট্ট বাবুকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো। এই গ্রেফতার কেন করা হয়েছিলো বা কি তার অপরাধ সেটি তো আপনারা কামারুর রায় পড়লেই জানবেন, সুতরাং নতুন করে এখানে লেখার কিছু নেই। এই সংক্রান্ত অনেক তথ্য আপনি আপীলেট ডিভিশনের রায়ের ৪৬৮ নাম্বার পাতায় পাবেন।

(৯) ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরুতে নিজামীর সাফাই সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন অ্যাডভোকেট কে.এম হামিদুর রহমান। পরে প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী তাকে জেরা শুরু করেন।এক পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল আসামী পক্ষের আইনজীবী মিজানুল ইসলামের কাছে জানতে চান যে, অন্য সাক্ষীরা ট্রাইব্যুনালে হাজির আছেন কিনা। জবাবে তিনি বলেন, না। ট্রাইব্যুনাল বলেন, গতকালই (রোববার) বলে দেয়া হয়েছে আপনারা একাধিক সাক্ষীকে হাজির রাখবেন। তখন মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘আমি গতকাল ছিলাম না, ভুল হয়ে গেছে।’

এর এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবি মোহাম্মদ আলী আদালতে অভিযোগ করে বলেন, ‘জবানবন্দি দিয়েছেন কে.এম হামিদুর যার নাম আসামির সাক্ষীর তালিকায় নেই। তখন আদালত প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আসামীর আইনজীবীকে উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি একজন সিনিয়ার আইনজীবী, আপনার কাছ থেকে এমনটি আশা করিনি, আপনি ডিফেন্স সাক্ষী নিয়ে ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে ফ্রট (প্রতারণা)করেছেন ‘ এ সময় আদালত ট্রাইব্যুনালের এজলাশ থেকে ডিফেন্সের সাক্ষী অ্যাডভোকেট কেএম হামিদুর রহমানকে সাক্ষীর কাঠগড়া থেকে নেমে যেতে বলেন। ওই সময় সাক্ষী কাঠগড়া থেকে নেমে যান।

এ সময় আদালত মিজানুল ইসলামকে বলেন, ‘আপনি একজন সিনিয়ার ল’ইয়ার, আপনার কাছ থেকে এমনটি আশা করিনি। আইনজীবী বলেন, আই এম ভেরি সরি, ইট ইজ ক্লারিক্যাল মিসটেক।’ আদালত বলেন, ‘আপনারা আদালতের সাথে মিথ্যা কথা বলেছেন, আপনাদের তালিকায় আছে আব্দুল হামিদ আর আপনি দিলেন কে.এম হামিদুর রহমান, এটা আইনজীবী হিসেবে আদালতের সাথে প্রতারণা।’

পরে উপস্থিত নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাজিব মোমেনকে উদ্দেশ্য করে আদালত বলেন, ‘আপনি একজন ব্যারিস্টার, আপনাকে অনেক দূর যেতে হবে। কিন্তু পেশার শুরুতে এটা কি করলেন? তখন নিজামীর ছেলে আদালতকে বলেন, এটা ক্লারিক্যাল মিসটেক, আমি বুঝতে পারিনি যে ট্রাইব্যুনালের কাছে দেয়া পাঁচ জনের তালিকায় ওনার নাম নেই।’ তখন আদালত বলেন, ‘আপনারা সাক্ষীর তালিকায় মিস্টার এ, মিস্টার বি, মিস্টার এক্স, মিস্টার ওয়াই এসব নাম উল্লেখ করেছেন, এটা কোন সাক্ষীর তালিকার নাম হতে পারে না। এমন নাম আমরা জীবনেও দেখিনি। আপনারা কে. এম হামিদের বিষয়ে আদালেতে আগেও বলতে পারতেন। কিন্তু তা বলেননি কেন? আরো জানতে

এইসব তথ্যগুলো হচ্ছে এই গত ছয় বছরের ট্রাইবুনালের বিচারের বিশাল সমূদ্রে এক ফোঁটা শিশিরের মত। কেবল সামান্য ডেমো দিলাম এই লেখায়। এমন অসংখ্যা ঘটনা রয়েছে কিংবা সাক্ষ্য রয়েছে যেগুলো জানলে বা পড়লে আপনারা জানবেন যে এই বিচারকালীন সময়ে কত অদ্ভুত সব যুক্তি, সাক্ষী এনে অপরাধীরা আদালতের সময়ক্ষেপন করেছে। কিভাবে অভিযুক্তরা নিজেদের মামলা নিজেরাই ড্যামেজ করেছে। এইসব তথ্যগুলো জানা যাবে প্রতিটি মামলার রায় কিংবা পত্রিকা পড়লেই। না পড়ে যখন কেউ সমালোচনা করবে তখন সেগুলো হয়ে উঠে স্রেফ প্রোপাগান্ডা কিংবা মিথ্যাচার।

মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের ব্যাক্তিরা যদি এইসব মন দিয়ে পড়তেন কিংবা জানবার চেষ্টা করতেন পত্র-পত্রিকা বা রায় ধরে ধরে তবে এই ট্রাইবুনাল নিয়ে অসংখ্য প্রোপাগান্ডা আপনারাই ঠেকিয়ে দিতে পারতেন। এইসব প্রোপাগান্ডা চাউর হবার পেছনে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তিদের যে কিছুটা উন্নাসিকতা দায়ী এই সত্য কি আমরা এড়িয়ে যেতে পারি?

Facebook Comments

Comments

comments

SHARE
Previous articleDebate Between Nijhoom Majumder vs Saidee's Lawyer Tajul Islam
Next articleLetter to Nizami’s apologist Omar Suleiman
উপরের প্রকাশিত লেখাটি আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনার ফলাফল। লেখাটি আপনার ভালো নাও লাগতে পারে, পছন্দ না-ও হতে পারে। আমার সাথে হয়ত আপনি একমত হবেন না কিন্তু আমি ধন্যবাদ জানাই আপনি এই সাইটে এসেছেন, আমার লেখাটি কষ্ট করে পড়েছেন আপনার সময় ব্যয় করে, এটিও পরম পাওয়া। সবার মতামত এক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। দ্বিমত থাকবে, তৃতীয় মত থাকবে কিংবা তারও বেশী মতামত থাকবে আবার সেটির পাল্টা মতামত থাকবে আর এইভাবেই মানুষ শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের চিন্তাকে খুঁজে ফেরে নিরন্তর। আর লেখাটি ভালো লাগলে কিংবা আপনার মতের সাথে দ্বন্দ্বের তৈরী না করলে সেটি আমার জন্য বড় সৌভাগ্য। আমি সেটির জন্য আনন্দিত। আপনাদের উৎসাহে, ভালোবাসাতে আর স্নেহেই এই লেখালেখির জগতে আসা। "নিঝুম মজুমদার" পাঠ শুভ হোক, আনন্দের হোক, এই চাওয়া। আপনার এবং আপনাদের মঙ্গল ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি সব সময়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY