বাংলাদেশে দরকার টর্ট আইনের সঠিক প্রয়োগ

0
1021

আমেরিকান এম্বেসীর একজন প্রোকৌশলী তাঁর পরিবারের ৫ জন সদস্য নিয়ে মারাত্নক অগ্নিদগ্ধ হলেন। জানা যায় তাঁদের গ্যাসের লাইনে লিক ছিলো আর সেটি থেকেই এই দূর্ঘটনা। ঘটনার পরবর্তীতে সেই পরিবারের একজন কিশোর ছাড়া বাকী সবাই মৃত্যুবরণ করলেন, চিত্র পরিচালক খালিদ মাহমুদের মাথায় গাছ ভেঙ্গে পড়লো, গত পরশু নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের উপর থেকে লোহার টুকরো পড়ে একজন ব্যাক্তি নিহত হয়েছেন, গতকাল বনানীর এক বাসায় আগুন লেগে সব পুড়ে শেষ। গ্যাস লিকের কথা টের পেয়ে কামরুল আলম নামে একজন ফোন দেন তিতাস গ্যাসকে। তিতাস গ্যাস কামরুলকে টেলিফোনেই বলেন, লিকের উপর মাটি চাপা দিয়ে রাখতে।

উপরের প্রতিটি ঘটনা টর্ট আইনের আওতার মধ্যে পড়ে। সংশ্লিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসের পরিষ্কারভাবে “ডিউটি অফ কেয়ার” কনসেপ্টের আওতায় পড়ে। তাদের কর্তব্যে অবহেলা সু-স্পস্ট। কিন্তু বাংলাদেশে এসব নিয়ে সাধারণত মামলা হয়না। টর্ট আইন বলে এই দেশে কোনো আইনের প্রয়োগ আছে সেটি এই দেশে গেলে বোঝা যায়না।

এইবার বাংলাদেশে যাবার পর দেখি আমাদের বাসার সামনে একটা ম্যানহোলের ঢাকনা নেই। কে বা কারা নিয়ে গেছে চুরি করে। এলাকাবাসীও এটা নিয়ে ভাবেনা। রাস্তায় হাঁটার সময় ম্যান হোলের পাশ দিয়ে সবাই অদ্ভুত কায়দায় ডিঙ্গিয়ে যায়। যেতে পারলেই হোলো, এগুলো নিয়ে কথা বলে লাভ কি, পুরো ভাবখানা সবার এমন।
আমি দুইদিন আমাদের এলাকার ওয়ার্ডে ফোন দিলাম। কে একজন ফোন ধরে, দুই মিনিট লাইনে রেখে লাইন কেটে দেয়। আমার ছেলে রাস্তায় খেলতে গিয়ে এই ম্যানহোলে পড়তে পারত কিংবা এলাকার যে কেউ। কারো কোনো বিকার নেই। আর সিটি কর্পোরেশনের কথা নাই বা বললাম।

এইসব সিভিল লায়াবিলিটি নিয়ে দেশে কখনো কথা হয়না। ধার্মিক দেশ, তাই মাথায় গাছ পড়লে সবাই ভাবে এইটা মনে হয় আল্লাহর এক লীলা খেলা। সবাই বলাবলি করলো, “এক মিনিটের নাই ভরসাা…..সাঙ্গ হইবো সব তামাশা”। এইগুলা বললে পুরো ব্যাপারটা আল্লাহর উপর চামে দিয়ে চাপায়া দেয়া যায়। যেন লীলা খেলা সাঙ্গ হওয়াতে পাব্লিক খুব খুশি। অথচ যে এত খুশি সেও হয়ত একদিন এই ম্যানহোলের নীচে পড়ে মরে যাবে কিংবা মাথায় গাছ পড়ে। কিন্তু এটা যে আসলে একটা অপরাধ, এইটা যে অন্যের অবহেলায় একটা খুন, সে কথা কেউ বলেনা। ইনফ্যাক্ট জানেই না।

কেউ প্রশ্ন করেনি মিঠু ভাইয়ের উপর পড়া গাছটার রক্ষণা বেক্ষন সঠিক ভাবে হয়েছিলো কিনা, গাছটার বয়স কত হয়েছিলো, এটির শেকড় কতটুকু নরম হয়েছিলো। এসব দেখার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের। তারা কি তা দেখেছে?
ইংল্যান্ডের একটা বিখ্যাত মামলা আছে। মামলার নাম Donoghue v Stevenson। 1932 সালের মামলা। টর্ট আইন যারা পড়েছেন তারা সবাই এই মামলার কথা জানেন। এক ভদ্রমহিলা জিঞ্জার বিয়ার (এক ধরনের কোমোল পানীয়) খেতে গিয়ে দেখেন জিঞ্জার বিয়ারের ক্যানের মধ্যে মৃত স্নেইল। দিলেন কোম্পানীর বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে। “ডিউটি অফ কেয়ার” এর মত কনস্পেট হাউজ অফ লর্ডসে সু-প্রতিষ্ঠিত হলো। পেলেন ক্ষতিপূরণ।

আমি নিউ মার্কেট থেকে একটা পানির বোতল কিনে দুই মিনিটের ভেতর সেটি শেষ করে ফেলে খালি বোতল কোথায় ফেলব এই কথা এক রিকশাচালক ভাইকে জিজ্ঞেস করতেই দেখি তিনি দাঁত বের করে হাসেন। হাতের খালি বোতোল ধরে রেখেই নীলখেতে বই কিনি। কেনা শেষে বইয়ের দোকানদারকে জিজ্ঞেস করি,”ভাই বোতোল কই ফেলব?” সে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে বিষ্ময়ে। আমার ধারনা তিনি ভাবছেন আমি খুব সম্ভবত তাঁর সাথে ফাজলামী করছি।

বোতোল নিয়ে রাজু ভাষ্কর্য পার হলাম, ডানে দিয়ে বইমেলার দিকে হাঁটা ধরলাম। রাস্তায় হাজার হাজার বোতোল পড়ে আছে। আমার এই খালি বোতোল হাতে ঘুরাটা বেমানান। আমিও ঘাড় ত্যাড়ামি করলাম। ফেলবোনা বোতোল। বই মেলার সামনে আসতেই এক পুলিশ জিজ্ঞেস করে, খালি বোতোল নিয়া ঘুরেন ক্যান? আমি কারন বললাম। পুলিশ হাত থেকে বোতোল নিয়ে আমার সামনেই বিরস মুখে রাস্তায় ফেলে দিলো। পুলিশের মুখ দেখেই বুঝেছি লোকটা মনে মনে আমাকে বলদ বলেছে।

এইভাবে একটা দেশ চলছে। অনিয়ম এই দেশে নিয়ম। রাতারাতি এই দেশ ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আমেরিকা, নিউজিল্যান্ডের মত হবে না জানি। কিন্তু একটা খুনকে এই দেশে আল্লাহর লীলা খেলা ভাবে, একটা কর্তব্যে অবহেলাকে এই দেশে স্বাভাবিক মনে করে, দুই মাইল হেঁটে এই রাজধানীতে একটা ময়লা ফেলার বিন পাইনা, এর থেকে দুঃখের আর কি হতে পারে?

Facebook Comments

Comments

comments

SHARE
Previous articleতাসকিনের বোলিং নিষিদ্ধ নিয়ে ব্যারিস্টার মুস্তাফিজের আইনী লেখা
Next articleমানুষ নাকি ধর্ম?
উপরের প্রকাশিত লেখাটি আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনার ফলাফল। লেখাটি আপনার ভালো নাও লাগতে পারে, পছন্দ না-ও হতে পারে। আমার সাথে হয়ত আপনি একমত হবেন না কিন্তু আমি ধন্যবাদ জানাই আপনি এই সাইটে এসেছেন, আমার লেখাটি কষ্ট করে পড়েছেন আপনার সময় ব্যয় করে, এটিও পরম পাওয়া। সবার মতামত এক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। দ্বিমত থাকবে, তৃতীয় মত থাকবে কিংবা তারও বেশী মতামত থাকবে আবার সেটির পাল্টা মতামত থাকবে আর এইভাবেই মানুষ শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের চিন্তাকে খুঁজে ফেরে নিরন্তর। আর লেখাটি ভালো লাগলে কিংবা আপনার মতের সাথে দ্বন্দ্বের তৈরী না করলে সেটি আমার জন্য বড় সৌভাগ্য। আমি সেটির জন্য আনন্দিত। আপনাদের উৎসাহে, ভালোবাসাতে আর স্নেহেই এই লেখালেখির জগতে আসা। "নিঝুম মজুমদার" পাঠ শুভ হোক, আনন্দের হোক, এই চাওয়া। আপনার এবং আপনাদের মঙ্গল ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি সব সময়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY