ডি জি এফ আই থামবে কবে?

0
25

তিনি প্রতিদিন মোবাশ্বের সিজারের মোবাইলে কয়েকবার ফোন দেন। কারন তিনি বিশ্বাস করেন তাঁর “সিজু” একবার না একবার ফোন খুলবেই। ঘরের পাশে গাড়ি বন্ধ হলেই তিনি ব্যাকুল হয়ে ছুটে যান জানালার কাছে। তিনি মনে করেন, তাঁর “সিজু” এসেছে। কিন্তু আদতে এর কোনোটিই সত্য হয়না। বরং সিজারের সাথে এখন যোগ হয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান।

মারুফ জামান। যিনি বেলজিয়াম থেকে ফেরা মেয়েকে ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে নিজে ড্রাইভ করে আনতে গিয়ে গুম হয়েছেন। আমার এই লেখাটি যারা পড়ছেন তাঁরা জানেন মারুফকে কারা উঠিয়ে নিয়ে গেছে। নিয়ে গেছে ডি জি এফ আই। বাংলাদেশে যারা এখন একটা রীতিমত আতংকের নাম।

গুম করবার পর তাদেরই লোক-জন গিয়ে মারুফ জামানের বাসা থেকে কম্পিউটার নিয়ে এসেছে। নিশ্চই এরা তাদের “বুদ্ধি” দিয়ে বের করে ফেলেছে যে মারুফ জামানের কম্পিউটারে কিছু রয়েছে যেটি বের হয়ে গেলে সরকারের পতন হয়ে যাবে।

সরকারের এত পতনের ভয় কেন কে জানে। এতই তাদের পতনের ভয় যেখানে ইলেক্ট্রিসিটির দাম বাড়াবার সামান্য প্রতিবাদের মিছিলে সরকারের পেটোয়া বাহিনী সাউন্ডবক্স নিয়ে অভিনব আক্রমণ পর্যন্ত করে বসেছে। মানে দাঁড়াচ্ছে, বিদ্যুতের দাম বেড়েছে এটি নিয়ে একটি কথাও বলতে দেবেনা এবং অন্যকে শুনতে দেবে না।

বলা হয়ে থাকে, ডি জি এফ আই-এর নির্দেশে এখন দেশ চলে। তারা যেই গোয়েন্দা রিপোর্ট দেবে, তারা যেই প্রেসকিপশান দেবে, সেভাবেই দেশ চলবে। এগুলো ভেতরের কথা। মানুষ নিজেদের ভেতর বলাবলি করে। সামনে বলতে খুব একটা সাহস পায়না। বললেই, তুলে নিয়ে রেখে দেবা ব্ল্যাক হোল-১,২ কিংবা ৩-এর ভেতর।
র‍্যাব, ডিবি, সি আইডি, পুলিশ, আনসার সব কিছুর বাবা হচ্ছে এখন এই সংস্থা। বলা হয়ে থাকে, প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতিরও অনেক সময় কিছু করার থাকেনা।

অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর কিছু করবার থাকলেও তিনি করবেন না। কেননা উন্নত বিশ্বে অনেক গুম হয়। যে তুলনায় বাংলাদেশে কিছুই হয়না।

সাম্প্রতিক সময়ে যতগুলো রাষ্ট্রীয় গুম হয়েছে তার প্রত্যেকটির পেছনে দায়ী করা হয় সেনাবাহিনীর এই গোয়েন্দা সংস্থাকে। এদেরকে থামাবার কোনো লাগাম নেই, এদেরকে নিয়ন্ত্রন করবার কোনো উপায় নেই।

অনিরুদ্ধ রায়ের কথাই ধরুন। বেলারুশের এই কনসাল জেনারেল ও ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধকে ধরে নিয়ে গেলো। তারপর ৮১ দিন পর তাঁকে ছেড়ে দেয়া হোলো। যেদিন অনিরুদ্ধ রায়কে ছেড়ে দেয়া হোলো ঠিক সেদিন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা পদত্যাগ করলেন। দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাবার দরকার নেই কষ্ট করে। আমি-ই বলে দিচ্ছি। উত্তরটা আসলেই চার।

ফিরে এসে তিনি তাঁর ব্যবসায়ীক পার্টনারকে দোষ দিলেও, এই অসীম অর্থের মালিক ও ক্ষমতাবান লোকটি মামলা করেন নি, আইনের আশ্রয় চান নি। চাইবেন কার বিরুদ্ধে? ব্যবসায়ীক পার্টনার কিছু করে থাকলে তো চাইবেন, নাকি??

শোনা গেছে সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পরিবারের কিংবা তাঁর থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরের আত্নীয়দেরও ছাড় দেয়নি ডি জি এফ আই। গত ৫ টা ছয়টা মাস তাঁর ও তাঁর পরিবারের উপর দিয়ে কি গিয়েছে, এটা একদিন হয়ত সবাই জানতে পারবেন। আপনারা শুধু খালি চোখে দেখতে পান একজন বৃদ্ধ বিচারপতি পদত্যাগ করেছেন। তিনি দেশে ফিরছেন না। কিন্তু আপনাদের এই গল্পের পেছনের দৃশ্য দেখানো হয়না।

এই সামরিক গোয়েন্দাবাহিনী মনে করেন দেশ জুড়ে একটা ব্যাপক ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তারা সবাইকে সন্দেহ করে। তাদের সন্দেহের রেশ এতটাই ভেইগ যে একজন স্যাডিস্ট সাবেক বিচারপতির বুদ্ধিতে একজন ব্যারিস্টারকেও তারা সাম্প্রতিক সময়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এই স্যাডিস্ট বিচারপতি তার কনিষ্ঠ কন্যাকে অনলাইনে লেলিয়ে দিয়েছে। অস্ত্র তাক করেছে তাদের দিকে যারা সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পক্ষে কথা বলে। যেমন যুক্তরাজ্যের গন জাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র অজন্তা দেব রায়। তিনি দেশে ফিরলেই তাঁকে ধরা হবে। জিজ্ঞাসাবাদ করবে নয়তো গুম করে ফেলবে।

এই স্যাডিস্ট বিচারপতির একজন সাবেক স্ত্রী (৫ম) এই নোংরা পশুটাকে নিয়ে আমাকে যেসব কথা বলেছেন আর তথ্য দিয়েছেন যেগুলো শুনলেও ভেতর থেকে সব উগরে বের হয়ে আসে। স্যডিস্টের মেয়ে যায় স্যডিস্টকে জুতো পেটা করতে, স্যাডিস্ট আবার যায় মেয়েকে মারতে। আর সেই স্যডিস্টের কথা শুনে গোয়েন্দারা তদন্ত করে। কি আর বলি…

বাজারে গুজব রটেছে যে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ভারতের সাথে মিলে মিশে আর ডক্টর কামালের বুদ্ধিতে একটা জুডিশিয়াল ক্যু করতে চেয়েছেন। বাজারে আরো রটানো হয়েছে যে, আপীলেট ডিভিশানে ১৫৪ জন এম পির সদস্যপদের বৈধতার যে রিটটি রয়েছে সেটি মাননীয় প্রধান বিচারপতি আমলে নিতেন। অর্থ্যাৎ এই “সাংবিধানিক” সংসদ সদস্যদের তিনি নাকি রায়ে অবৈধ ঘোষনা করতেন। ফলে সরকারের পতন হোতো।

এইভাবে প্রচুর গুজব চালু রয়েছে বাজারে। কেউ বলছে ভেতরে ভেতরে ১০ টা ক্যু হয়েছে, ১২ টা ক্যু হয়েছে, ১৯টা ক্যু হয়েছে কিন্তু সামরিক গোয়েন্দাবাহিনী সেসব নস্যাৎ করে দিয়েছে। এইসব গুজবে রক্ষা পাননি সদ্য প্রয়াত ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক। বলা হয়েছিলো, তিনি ডক্টর কামালের সাথে এক হয়ে কিংবা এই মোর্চার সাথে এক হয়ে সরকার পতনের চেষ্টা করেছিলেন।

আসম আব্দুর রব, বদরুদ্দোজাদের রাজনৈতিক জোট গঠিত হয়েছে যুক্তফ্রন্ট। ডক্টর কামালের গণফোরাম এখানে নেই কেন? এতদিন তো ছিলো। এই না থাকবার কারনও মনে করি উপরের নির্দেশ। যারা মনে করেন ১৬ তম সংশোধনী বাতিল হয়েছে ডক্টর কামাল সাহেবের বুদ্ধিতে, আমিরুল ইসলামের বুদ্ধিতে। সুতরাং ডক্টর কামালকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দাও।

এসব ছেড়ে ফিরে আসি গুম প্রসঙ্গে।

ডি জি এফ আই-তে যেসব মেজর, ক্যাপ্টেন, কর্ণেলরা এসব গুম করার দায়িত্বে রয়েছেন কিংবা নির্দেশের দায়িত্বে রয়েছেন তাঁদের বেশীরভাগই বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আর্মি অফিসার হয়েছেন।

আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারের হাসি, কান্না, মা-বাবা, বোন, আমাদের দুঃখ, বেদনা, কষ্ট, আনন্দ এসব সব কিছু নিয়ে এরা ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত বড় হয়।

জানিনা সামরিক বাহিনীর ওই জলপাই পোষাকটাই নাকি অন্য কিছু তাদের এত বদলে দেয়। এই যে মোবাশ্বেরের মায়ের কান্না, তাঁর এই আহাজারি, তাঁর ছোট্ট মেয়াটার বাবার জন্য অপেক্ষা, এই যে উৎপল আজ এতটা দিন ধরে নিরুদ্দেশ, তার বাবার কান্না, মায়ের কান্না, এই যে মারুফ জামান ধুম করে হারিয়ে গেলেন, কাঁদছে তাঁর পরিবার এগুলোর কিছুই কি গায়ে লাগেনা এই সামরিক গোয়েন্দাবাহিনীর এইসব ছেলেদের?

এরা কি রাতে ঘরে ফেরে না? বাবার সাথে, মায়ের সাথে বসে টিভি দেখেনা? এদের কি ঘরে সন্তান নেই? এদের জীবনে কি কোন আনন্দ নেই? দুঃখ নেই? এদের ঘরে কি তাদের বাবা মায়েরা এইসব দেখে স্তব্ধ হন না? দুঃখ পান না? নাকি একটা ক্যামোফ্লেজ পোষাক ওদের এতটা পালটে দেয় কেবল?

কি জানি…

একটা প্রশ্নেরও উত্তর পাইনা। মেলে না কিছুই…

Facebook Comments

Comments

comments

SHARE
Previous articleরাষ্ট্র যে কারনে সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে ভয় পায়
Next articleগবুচন্দ্র দেশের গাবিনা ও সৌমিত্র কুমার মিনহা
উপরের প্রকাশিত লেখাটি আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনার ফলাফল। লেখাটি আপনার ভালো নাও লাগতে পারে, পছন্দ না-ও হতে পারে। আমার সাথে হয়ত আপনি একমত হবেন না কিন্তু আমি ধন্যবাদ জানাই আপনি এই সাইটে এসেছেন, আমার লেখাটি কষ্ট করে পড়েছেন আপনার সময় ব্যয় করে, এটিও পরম পাওয়া। সবার মতামত এক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। দ্বিমত থাকবে, তৃতীয় মত থাকবে কিংবা তারও বেশী মতামত থাকবে আবার সেটির পাল্টা মতামত থাকবে আর এইভাবেই মানুষ শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের চিন্তাকে খুঁজে ফেরে নিরন্তর। আর লেখাটি ভালো লাগলে কিংবা আপনার মতের সাথে দ্বন্দ্বের তৈরী না করলে সেটি আমার জন্য বড় সৌভাগ্য। আমি সেটির জন্য আনন্দিত। আপনাদের উৎসাহে, ভালোবাসাতে আর স্নেহেই এই লেখালেখির জগতে আসা। "নিঝুম মজুমদার" পাঠ শুভ হোক, আনন্দের হোক, এই চাওয়া। আপনার এবং আপনাদের মঙ্গল ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি সব সময়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY