ডাঃ পিনাকী ভট্টাচার্যের আহবানের প্রেক্ষিতে আমার জবাব

0
431

কেন এই লেখা লিখছিঃ

সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুক কেন্দ্রিক একটি আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। ডাঃ পিনাকী ভট্টাচার্য্য (পিনাকীদা) একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস যেটি তিনি প্রকাশ করেন ৩১ শে অগাস্ট ২০১৫। সেই স্ট্যাটাসে পিনাকীদা ডক্টর মুহম্মদ জাফর ইকবাল (জাফর স্যার) এর ২০১৪ সালের মার্চ মাসে লিখিত “স্বাধীনতার ৪৪ বছর” শীর্ষক একটি কলামের কয়েকটি লাইনকে উদ্ধৃত করে সেটি ভিত্তি করে প্রশ্ন তুলেছেন এবং লিখেছেন-

“কিন্তু গোল্ডেন কোশ্চেন হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিটা কী? সেটাও তিনি বলেছেন “(অ) সাম্প্রদায়িক দেশ তৈরি করা। অসাম্প্রদায়িকতা মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি ছিল নাকি? কোথায় ছিল? নিশ্চয় কোন দফা, দাবী বা ঘোষণায় ছিল? সেটা কোথায়?আজকে মুক্তিযুদ্ধের চুয়াল্লিশ বছর পরে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি একজন জাফর ইকবাল নতুন করে নির্মাণ করলে আমি সেটা মানতে বাধ্য কেন? আমি তো মানবো সেই ঘোষণাকে যা আমাদের প্রোক্লেমেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্সের মাধ্যমে ১০ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার ঘোষণা করেছিল, মুক্তিযুদ্ধের বৈধতা দাবী করা হয়েছিল সাম্য, মানবসত্তার মর্য্যাদা আর সামাজিক ন্যায়বিচারের বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করার মাধ্যমে। কে সেই ভিত্তি থেকে সরে এসেছে? জাফর ইকবাল কি মুজিবনগর সরকারের চাইতে বেশী মান্য? বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে কি অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার ঘোষণা ছিল? নাকি বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবী ছিল; বাঙালি জাতির স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবী ছিল? জাফর ইকবাল কোথায় পেলেন এই মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি? আমি কি বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের বক্তৃতা মানবো নাকি জাফর ইকবালের কথা মানবো?”


[পিনাকীদার সে ফেসবুক স্ট্যাটাসের পুরো অংশ পাওয়া যাবে এখান থেকে]

তাঁর এই ফেসবুকের স্ট্যাটাসের প্রেক্ষিতে আমি সেি পোস্টে একটি মন্তব্যকরি। মন্তব্যটি হচ্ছে-

“বঙ্গবন্ধুর ৭ ই মার্চের ভাষন, স্বাধীনতার ঘোষনা পত্র, সংবিধানের প্রি-এম্বেল, সংবিধান সবখানেই অসাম্প্রদায়িকতা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ভিত্তি হিসেবেই নানাভাবে আবির্ভূত হয়েছে। কখনো সরাসরি কখনো ট্যাসিটলি। আপনি কি বলছেন এসব পিনাকীদা?”

আমার এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে পিনাকীদা আমার কাছে আহবান করেছেন এবং সেইসাথে বলেছেন-

“প্রিয় নিঝুম, মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি আমরা মুক্তিযুদ্ধের পরে রচিত বাংলাদেশের সংবিধানে পাবোনা। এটাকে খুজতে হলে যেতে হবে ১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বরের আগের ঐতিহাসিক ডকুমেন্টগুলোতে। যেমন,

১/ ৬ দফা, ১১ দফায়। 

২/ মুজিবনগর সরকারের ঘোষণা। 

৩/ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্র, দাবিনামা, কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক প্রকাশিত লিফলেট, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পত্রিকা বা প্রকাশনা। 

৪/ মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য, সাক্ষাৎকার, লেখা। 

মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি প্রচ্ছন্নভাবে থাকতে পারেনা। এটা হতে হবে প্রকাশিত, উচ্চারিত এবং স্পষ্ট। 

আমি নিঝুমকে আহবান করছি, যুক্তি নয় ঐতিহাসিক ডকুমেন্ট থেকে প্রমাণ করে দেবার জন্য “অসাম্প্রদায়িকতা” মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি হিসেবে ১৯৭১ এর ১৬ ই ডিসেম্বরের আগে উচ্চারিত হয়েছিল”

পিনাকীদা’র এই আহবানের প্রেক্ষিতেই আমার আজকের লেখা। তাঁর পুরো স্ট্যাটাস্টি পাওয়া যাবে এখান থেকে

আমার অবস্থানঃ

পিনাকীদা আলোচ্য লেখাতে যেসব মতামত দিয়েছেন এবং আদর্শিক জায়গা থেকে যে বক্তব্য রেখেছেন সেসবের ক্ষেত্রে আমার স্পস্ট দ্বিমত রয়েছে। আমি এই লেখার মাধ্যমে আমার অবস্থান, অবস্থানের প্রেক্ষিতে আমার যুক্তি এবং যুক্তির প্রেক্ষিতে সহায়ক ডকুমেন্ট উল্লেখ করবার এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজস্ব মৌলিক মতামত দেবার চেষ্টা করব। যখন আমার নিজের মৌলিক মতামত দেব, সেক্ষেত্রে আমি রেফারেন্স ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকবার চেষ্টা করব কেননা এটি আমার ব্যক্তিগত দর্শন যেটি আমি ইতিহাস পাঠপরিক্রমায় অর্জন করেছি।

এই লেখার প্রেক্ষিতে ব্যবহৃত সহায়ক ডকুমেন্টঃ
এই লেখাটি লিখতে গিয়ে আমি বেশ কিছু বই, জার্নাল, সাক্ষাৎকার, ঐতিহাসিক দলিল সহ নানাবিধ ডকুমেন্ট ব্যবহার করেছি। সহায়ক সকল ডকুমেন্টের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এই লেখার শেষে সংযুক্ত করা হয়েছে।

মূল আলোচনার পূর্বে প্রাক প্রাসঙ্গিক কথন- জাফর ইকবাল স্যারের উদ্দিষ্ট কলামঃ

প্রথমত, এই পুরো আলোচনার সূত্রপাত জাফর স্যারের যে কলাম ধরে সূচনা হয়েছিলো সেটি পিনাকীদা সঠিক ব্যখ্যা করতে পারেন নি কিংবা হয়ত ভুল বুঝেছেন বলে আমার ব্যক্তিগত মতামত।

দ্বিতীয়ত, জাফর স্যারের সে লেখার যে সুনির্দিষ্ট অংশ উদ্ধৃত করা হয়েছে সেটার মূলভাব বুঝতে হলে স্যারের পুরো লেখাটি একসাথে পড়তে হবে বলে আমি মনে করি।

তৃতীয়ত, কিছু কিছু লেখা থাকে যেটি’র কোনো সুনির্দিষ্ট লাইন বা অংশ নিজস্ব ভাবে লেখার মূল ভাবকে সামগ্রিকভাবে পুরোপুরি উপস্থাপন করতে পারেনা। সে লেখার সম্পূর্ণ অংশ ঐ লেখার মূল ভাবকে সকলের সামনে অনুধাবনযোগ্য করে তোলে। আমি মনে করি ২০১৪ সালের মার্চের ১৪ তারিখে লেখা জাফর স্যারের “স্বাধীনতার চুয়াল্লিশ বছর” লেখাটি সে ঘরানার।

চতুর্থত, জাফর স্যারের লেখার একটি অংশকে তুলে দিয়ে এবং সেটিকে ভিত্তি করে যে কোনো আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই নানাবিধ দ্বিধার জন্ম দেয়। পিনাকীদার লেখা সেই দ্বিধার জন্ম দিয়েছে এবং ব্যাপারটি আরো বেশী জটিল হয়ে উঠেছে তাঁর পরবর্তী পর্যালোচনার মাধ্যমে।

জাফর ইকবাল স্যারের সেই লেখাটি পাওয়া যাবে এখানে ক্লিক করে

এই লেখাতে জাফর স্যার খুবই স্পস্ট করে গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। স্যারের সেই কোট করা লেখার অংশ ছিলো এটি-

“আমরা আজকাল খুব ঘন ঘন গণতন্ত্র শব্দটি শুনতে পাই। যখনই কেউ এই শব্দটি উচ্চারণ করেন তখনই কিন্তু তাকে বলতে হবে এই গণতন্ত্রটি দাঁড়ানো থাকবে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তির উপরে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি সরিয়ে একটা গণতন্ত্র তৈরি করব, সেই গণতন্ত্র এই দেশটিকে একটা সাম্প্রদায়িক দেশ তৈরি করে ফেলবে, সকল ধর্মের সকল বর্ণের সকল মানুষ সেই দেশে সমান অধিকার নিয়ে থাকতে পারবে না– সেটা তো হতে পারে না”

ঐ একই লেখাতে স্যার আরো বলেছেন-

“কাজেই ধর্ম ব্যবহার করে রাজনীতি করা গণতান্ত্রিক অধিকার বলে দাবি করা হলেও কিন্তু আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের সঙ্গে খাপ খায় না। গত নির্বাচনের ঠিক আগে আগে নির্বাচন প্রতিহত করা আর যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রতিহত করার আন্দোলন যখন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল, তখন সন্ত্রাস কোন পর্যায়ে যেতে পারে সেটা দেশের মানুষের নিজের চোখে দেখার একটা সুযোগ হয়েছিল।”

স্যারের লেখাতে কোনো অস্পস্টতা নেই। যাকে বলে সোজা এবং পরিষ্কার। বাংলাদেশ তৈরীর প্রাক্কালে যে ইতিহাস আমরা পেরিয়ে এসেছি কিংবা যে ঘাত-প্রতিঘাত আমরা পেরিয়ে একটা অনিবার্য বিপ্লবের মাধ্যমে এই বাংলাদেশ পেয়েছি সেটির পেছনে আমাদের রয়েছে নানাবিধ বঞ্চিত হবার অভিজ্ঞতা।

স্যারের মত করেই একই অনুরন পাওয়া যায় প্রখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এর একটি লেখায়। যেখানে তিনি বলেন-

“এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না যে সাম্প্রদায়িকতা বহাল রেখে কখনো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না”

আবার একই লেখায় তিনি বলেন-

“নাগরিক সত্তার অসাম্প্রদায়িক পরিচয়বোধ গণতান্ত্রিক সমাজের একটি আবশ্যক উপাদান। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের কাছে ধর্ম-বর্ণ-জাতি-বিত্ত পরিচয় নির্বিশেষে সবাই হলো একই ‘নাগরিক’ পরিচয়ে মূর্তমান। হিন্দু হোক বা মুসলমান হোক, আমির হোক বা ফকির হোক, পুরুষ হোক বা নারী হোক, বাঙালি হোক বা আদিবাসী হোক—রাষ্ট্রের সামনে সকলেরই প্রাথমিক পরিচয় হলো এই যে, তারা সবাই রাষ্ট্রের সমমর্যাদাসম্পন্ন ‘নাগরিক’। এই যদি হয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থার দার্শনিক ভিত্তি তাহলে সেখানে সাম্প্রদায়িক বিবেচনা কখনোই প্রধান হতে পারে না”

[সূত্রঃ ইত্তেফাক, ১৬-ই মার্চ ২০১৫। লেখার লিংকঃ ]

পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের ২৪ বছরের অভিজ্ঞতা শুধু এটুকুই প্রমাণ করেছে যে ধর্মীয় অবস্থান বা পরিচয়ের প্রেক্ষিতে যে দুইটি আলাদা রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে সেটি পাকিস্তান অংশে মূলত অনুত্তীর্ণ হয়েছে। হিন্দু সামন্তবাদীদের দীর্ঘদিনের অত্যাচার কিংবা এই প্রেক্ষাপটে রাজনীতির তিক্ত অভিজ্ঞতা কিংবা এই দুইটি ধর্ম ভিত্তিক আলাদা আলাদা জাতির নানাবিধ পার্থক্যকে ও সেটি থেকে উৎসারিত নানাবিধ জটিলতাকে মুখ্য ধরে নিয়ে সৃষ্ট নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান যেটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তৈরী হয়েছিলো সেটি ঠিক ব্যার্থ হয়েছে পরবর্তীতে এই নতুন অঞ্চলের মুসলিম সামন্তবাদীদের অত্যাচারে। সেটা কখনো হয়েছে ধর্মের নামে, কখনো সংস্কৃতিক আগ্রাসন, কখনো রাজনৈতিক, কখনো অর্থনৈতিক।

ধর্মীয় অবস্থানের উপর ভর করে একটি রাষ্ট্র যে আসলে কতটা পটকা ও দূর্বল সেটি প্রতিটি মুহুর্তে আমরা পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে থাকবার সময়েই প্রতক্ষ্য করেছি। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধ যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক কিংবা অন্যান্য নানাবিধ বঞ্চনার অভিজ্ঞতা থেকে সূচিত হয়েছিলো সেগুলোই আসলে মুক্তিযুদ্ধ করে একটি নতুন দেশ গড়বার ভিত্তি। সে ভিত্তির ভেতরে বার বার উচ্চারিত হয়েছে কয়েকটি সুপরিচিত ধারনা। সেগুলো হচ্ছে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা। বলা চলে অনেক ধারনা, চেতনা, চিন্তা, দর্শনের কংক্রীট কিছু সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগোরাইজড একটা প্রকাশ যেগুলো ব্রডার একটা ক্ষেত্র বিবেচনায় অনেক কিছুকেই কাভার করে।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১৯ শে অগাস্ট সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে ভাষন দেন সে ভাষনের কিছু বক্তব্য আমার লেখার এই অংশে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক-

জাফর স্যারের উদ্দিষ্ট কলামে গণতন্ত্রকে বাদ দিয়ে কিছু করবার বা অন্য আদর্শকে চাপিয়ে দেবার প্রবণতা নেই। বরং সেখানে বলা হয়েছে যে এই গণতন্ত্র বাংলাদেশে তখনই পরিপূর্ণতা পাবে যখন সেখানে সাম্প্রদায়িক বা সম্প্রদায়গত বিদ্বেষ কিংবা সম্প্রদায়গত যে রিজিড সংকীর্ণতা, সেটিকে বর্জন করা যাবে তথা বিদ্বেষ মিশ্রিত সাম্প্রদায়িক চিন্তা বা আদর্শ সম্বলিত দেশ কখনোই গণতন্ত্রকে সঠিক রূপ দিতে পারেনা। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ মূলক আদর্শ বরং গণতন্ত্রের নামে যা দিতে পারে সেটি হচ্ছে ঘৃণাতন্ত্র, সেটি হচ্ছে একটা অংশকে চাপিয়ে রাখবার অপঃকৌশল।

এই প্রসঙ্গে কেউ কেউ আবার নানাবিধ উদাহরণ এনে হাজির করেন। যেমন বাসদের একজন প্রাক্তন কর্মী মাসুদ রানা এই পার্টিকুলার বিষয়ে বলেন- [মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের একটি লেখার প্রেক্ষিতে]

নেদারল্যাণ্ডসে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত এবং লেবাননে এখনও পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক ব্যবস্থা বহাল রেখে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নেদারল্যাণ্ডের ১৮৫৭ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত জনগণ ৪টি অ-ভৌগোলিক সম্প্রদায় বা পিলারে বিভক্ত ছিলো – ক্যাথলিক ক্রিশ্চিয়ান, ক্যালভিনিষ্ট ক্রিশ্চিয়ান, সৌশ্যালিষ্ট ও জেনারেল বা সেক্যুলার। ১৯১৭ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত কোনসোসিয়েশনালিষ্ট ব্যবস্থায় তাঁরা তাঁদের সংখ্যানুপাতে তাঁরা নিজ-নিজ সম্প্রদায় থেকে প্রতিনিধি নির্বাচিত করে সাম্প্রদায়িক সমঝোতার গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করতেন। এখন সেই সম্প্রদায়গুলো তাঁদের স্বস্ব পার্টিকে ভৌট দিয়ে পার্লামেণ্ট নিজেদের মতামতের প্রতিফলন ঘটায়। লেবাননে কনফেশন্যালিষ্ট ব্যবস্থায় আরব জাতীয় আত্মপরিচিতির অধীনে মুসলমান শিয়া ও সুন্নী এবং ক্রশ্চিয়ান ম্যারোনাইট সম্প্রদায় তাঁদের সাম্প্রদায়িক পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। ১৯৪৩ সাল থেকে এক অলিখিত চুক্তির বলে আজও লেবানের প্রেসিডেণ্ট ক্রিশ্চিয়ান, প্রধান মন্ত্রী সুন্নি মুসলিম ও পার্লামেণ্টের স্পীকার শিয়া মুসলিম হয়ে থাকেন। সর্বশেষ ১৯৯০ সালের তায়ফ চুক্তির ভিত্তিতে পার্লামেণ্ট ৭টি ক্রিশ্চিয়ান সম্প্রদায় ৪টি মুসলিম সম্প্রদায়ের নির্দিষ্ট সংখ্যাক এমপি নির্বাচিত করে পার্লামেণ্ট মোট ৬৪ খ্রিশ্চিয়ান ও ৬৪ মুসলিম আসন পূরণ করে থাকে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে “সাম্প্রদায়িকতা” শব্দটি বলতে সবাই বোঝে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ প্রসূত চিন্তা। যেটি একজন ব্যাক্তি লালন করলেই আমরা তার বিরুদ্ধচারণ করি। আমরা সাধারণত কথ্য ভাষায় কিছু টার্ম ব্যবহার করি কিংবা সেটি আমাদের নিজেদের জীবনে এমনভাবে ঢুকে গেছে যেটিকে প্রাইমা ফেসী (আপাত দৃষ্টিতে) মনে হতে পারে গ্রামাটিকাল ভাবে ঠিক নয়। যেমন “সাম্প্রদায়িকতা” শব্দটি। একটি দেশে ধর্মের ভিত্তিতে, চিন্তার ভিত্তিতে, জাতির ভিত্তিতে, আঞ্চলিকতার ভিত্তিতে ছোট ছোট বা বৃহৎ পরিসরে সম্প্রদায় থাকবেই। এটা নিয়ে তর্কের কিছু নেই। প্রশ্নটা হচ্ছে এই সম্প্রদায় তাঁর চিন্তাকেই একমাত্র সঠিক বিবেচনায় তা অন্যের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে কিনা কিংবা সেটি নিয়ে বিদ্বেষ উৎপাদিত করছে কিনা। কিন্তু মাসুদ রানা কিংবা এই জাতীয় বিশ্লেষকরা “সাম্প্রদায়িক” শব্দটার লিটারেল মিনিং ধরে সেটা নিয়ে এসব অদ্ভুত সব উদাহরণ নিয়ে এসে হাজির করেন। তারা বলেন সম্প্রদায় তো থাকবেই, নানা বিধ সাম্প্রদায়িক চিন্তাও থাকবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

মাসুদ রানার উপরের এই উদাহরনের পালটা উত্তরে বা যুক্তিতে খুব সহজ করেই বলা যায় যে এই উদাহরনটি কত ঠুনকো। এই উদাহরনে লক্ষ্য করে দেখবেন যে বিভিন্ন মতাদর্শগত কিংবা জাতিগত পার্থক্যে এক্সিস্ট করা সম্প্রদায়গুলোর নিজস্ব আলাদা আলাদা চুক্তি, সমন্বয় কিংবা সমন্বিত রূপরেখার ঐক্যমতের ফলেই এই এগ্রিড গণতন্ত্র কায়েম করা হয়েছে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে সাম্প্রদায়িক বা সম্প্রদায়গত বিদ্বেষ কিংবা সম্প্রদায়গত যে রিজিড সংকীর্ণতা সেটির অস্তিত্ব একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে বিলীন হয়েছে এবং সহ অবস্থানের সূচনা হয়েছে। যখন এই হারমোনাইজড তত্ব গুলোকে নানাবিধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাস্তবিক রূপ দান করা যায় সেখানে হাজার হাজার সম্প্রদায় থাকলেও ঐ হারমোনাইজড তত্বের ফলে অসাম্প্রদায়িক আবহের বিকাশ ঘটে।

সেই ক্ষেত্রে কি জাফর ইকবাল স্যারের কথাটাই কি সত্য হিসেবে বিবেচিত হোলো না? একটা দেশে যখন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষকে জিইয়ে রেখে গণতন্ত্র কায়েমের কথা বলা হয় তখন সেটি অন্তত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল যে স্পিরিট সেটির প্রেক্ষিতে ইনভ্যালীড হয়ে ওঠে। সুতরাং এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, জাফর স্যার মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মহান ভিত্তি “অসাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ কারো মধ্যে রইবে না, সকলে মিলে একই চেতনায় দেশকে এগিয়ে নেব” এই চেতনাকে অগ্রাহ্য করে গণতান্ত্রিক কাঠামো গঠনের পক্ষে নন।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান ভিত্তিগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক চেতনা অন্যতম কিন্ত সেটি যে আসলে মুক্তিযুদ্ধের অন্য ভিত্তিগুলো ছাড়া ব্যার্থ বা স্থবির সেটি পিনাকীদা বিবেচনায় নেন নি। শুধু যে নেন নি তা নয় বরং তিনি এই ভিত্তিগুলোর একটি, “সাম্প্রদায়িক চেতনা”কে পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন এটি কি করে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি হয়েছে? তিনি এখন এই ভিত্তির ব্যাপারে প্রমাণ চাইছেন। উপাত্ত চাইছেন।

এই পর্যায়ে এসে একটা তথ্য দিয়ে রাখা ভালো যে, জাফর ইকবাল স্যারের একটা বিখ্যাত উপন্যাস আছে। সেটির নাম, “দুঃস্বপ্নের দ্বিতীয় প্রহর”। এই বইটি স্যার লিখেছেন ৮০ এর দশকের সামরিক আইনের বিরুদ্ধে উপন্যাস ও কাহিনী আদলে। এই বইটি সামরিক শাষনকে তীব্র ভাবে কষাঘাত করেছে। এই বইটি শেষ পর্যন্ত যথাযথ গণতান্ত্রিক শাষন ব্যবস্থা পক্ষে অসামান্য লেখা।


মূল আলোচনাঃ

জাফর স্যারের উদ্দিষ্ট কলাম এবং সেটির প্রেক্ষিতে পিনাকীদার যে প্রশ্ন বা পরবর্তী চিন্তা সেটিকে এই পর্যায়ে এসে আমি আবারো এখানে দিচ্ছি।

“কিন্তু গোল্ডেন কোশ্চেন হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিটা কী? সেটাও তিনি বলেছেন “(অ) সাম্প্রদায়িক দেশ তৈরি করা। অসাম্প্রদায়িকতা মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি ছিল নাকি? কোথায় ছিল? নিশ্চয় কোন দফা, দাবী বা ঘোষণায় ছিল? সেটা কোথায়?আজকে মুক্তিযুদ্ধের চুয়াল্লিশ বছর পরে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি একজন জাফর ইকবাল নতুন করে নির্মাণ করলে আমি সেটা মানতে বাধ্য কেন? আমি তো মানবো সেই ঘোষণাকে যা আমাদের প্রোক্লেমেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্সের মাধ্যমে ১০ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার ঘোষণা করেছিল, মুক্তিযুদ্ধের বৈধতা দাবী করা হয়েছিল সাম্য, মানবসত্তার মর্য্যাদা আর সামাজিক ন্যায়বিচারের বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করার মাধ্যমে। কে সেই ভিত্তি থেকে সরে এসেছে? জাফর ইকবাল কি মুজিবনগর সরকারের চাইতে বেশী মান্য? বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে কি অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার ঘোষণা ছিল? নাকি বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবী ছিল; বাঙালি জাতির স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবী ছিল? জাফর ইকবাল কোথায় পেলেন এই মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি? আমি কি বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের বক্তৃতা মানবো নাকি জাফর ইকবালের কথা মানবো?”

আসুন এইবার পিনাকীদার বয়ানটি আমরা একটি ভেঙ্গে ভেঙ্গে বিশ্লেষন করি। এই বিশ্লেষন করবার জন্য আমি তাঁর বক্তব্যকে কয়েকটি ভাবে ভাগ করেছি ক, খ, গ ইত্যাদি ভাগে ভাগ করে।

(ক) পিনাকীদার বক্তব্যের প্রথম অংশ নিয়ে আমার ভাবনাঃ

“কিন্তু গোল্ডেন কোশ্চেন হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিটা কী? সেটাও তিনি বলেছেন “(অ) সাম্প্রদায়িক দেশ তৈরি করা। অসাম্প্রদায়িকতা মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি ছিল নাকি? কোথায় ছিল? নিশ্চয় কোন দফা, দাবী বা ঘোষণায় ছিল? সেটা কোথায়?আজকে মুক্তিযুদ্ধের চুয়াল্লিশ বছর পরে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি একজন জাফর ইকবাল নতুন করে নির্মাণ করলে আমি সেটা মানতে বাধ্য কেন? আমি তো মানবো সেই ঘোষণাকে যা আমাদের প্রোক্লেমেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্সের মাধ্যমে ১০ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার ঘোষণা করেছিল, মুক্তিযুদ্ধের বৈধতা দাবী করা হয়েছিল সাম্য, মানবসত্তার মর্য্যাদা আর সামাজিক ন্যায়বিচারের বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করার মাধ্যমে। কে সেই ভিত্তি থেকে সরে এসেছে? জাফর ইকবাল কি মুজিবনগর সরকারের চাইতে বেশী মান্য?

না, জাফর স্যার মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি নতুন করে নির্মান করেন নি। সে ইচ্ছাও হয়ত স্যারের নেই। পিনাকীদা হয়ত বুঝতে ভুল করছেন কিংবা তাঁর দর্শন আলাদা। সে কারনেই মনে হচ্ছে জাফর স্যার মুক্তিযুদ্ধের নতুন ভিত্তি তৈরী করেছেন। পরবর্তী ব্যাখ্যাতে যাবার আগে আমি একটা ব্যাপারে পরিষ্কার নই। আর সেটি হচ্ছে পিনাকীদা তাঁর লেখার ২য় লাইনে “অসাম্প্রদায়িক” এই একক শব্দটি লিখেছেন “(অ) সাম্প্রদায়িক” ভঙ্গিমায়। মানে স্বরে-অ কে আলাদা ব্র্যাকেটের মধ্যে রেখে।

স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, কেন তিনি এভাবে লিখলেন? এই ভঙ্গিমায় শব্দটি লিখবার কারন আসলে কি? ভঙ্গিমাটি আমার কাছে ইঙ্গিতপূর্ণ। দুঃখের বিষয় ইঙ্গিতটি ধরতে আমি পুরোপুরি ব্যার্থ।

(ক)-১ মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি কিঃ

মুক্তিযুদ্ধের নানাবিধ ভিত্তি আছে। নানাবিধ উপাদান, চিন্তা, অভিজ্ঞতা, দর্শন রয়েছে। এইসব সব কিছুকে যদি প্রধান কিছু অংশে ভাগ করে আলাদা আলাদা ভিত্তি হিসেবে নাম করন করা যায় সেক্ষেত্রে বলতে দ্বিধা নেই যে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিগুলো হচ্ছে- জাতীয়তাবাদ,সমাজতন্ত্র,গণতন্ত্র ,ধর্মনিরপেক্ষতা। এই ভিত্তগুলোকে নতুন বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল স্তম্ভ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছিলো।

আগেই বলেছি যে উপরে উল্লেখিত এই ভিত্তিগুলোকে যে নামে ভাগ করা হয়েছে তা অনেক ধারনা, চেতনা, চিন্তা, দর্শনের কংক্রীট কিছু সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগোরাইজড একটা প্রকাশ যেগুলো আলাদা আলাদা ভাবে ব্রডার একটা ক্ষেত্র বিবেচনায় অনেক কিছুকেই কাভার করে।

(ক)-২ অসাম্প্রদায়িকতা মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি ছিল নাকি? কোথায় ছিল? নিশ্চয় কোন দফা, দাবী বা ঘোষণায় ছিল? সেটা কোথায়?

জ্বি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি ছিলো। কিন্তু এই ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার শুরুতেই পরিষ্কার করে নেয়া ভালো যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বলতে আমি কি বুঝাতে চাইছি সেটি।

উপরে একবার বলেছি এখানে আবারো বলি যে একটি দেশে ধর্ম ভিত্তিক, নানাবিধ জাতিগোষ্ঠীক, ভিন্ন চিন্তক অংশ, আঞ্চলিক অংশ, মিলে আলাদা আলাদা সম্প্রদায় গড়ে তুলতে পারে, থাকতে পারে। সেসব সম্প্রদায়ের নিজস্ব চিন্তা ও চেতনাও থাকবে । এটি একেবারেই শ্বাশত। কিন্তু মূল প্রশ্ন যেখানে জাফর স্যার উল্লেখ করেছেন যে সাম্প্রদায়িক এইসব নিজস্ব মনোবৃত্তি যেন বিদ্বেষ গঠনে ব্যবহৃত না হয় এবং এই সম্প্রদায়গত ভাবনার একটা পাশাপাশি সহাবস্থান থাকুক হারমোনাইজড প্রক্রিয়ায়, সম্মিলিত এগ্রিমেন্টের ভিত্তিতে। আর সেটার জন্যই তো আমরা বলছি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সাম্প্রদায়িকতার নানা স্বরূপ আমরা প্রত্যক্ষ করি। সেটা মূলত আমরা পাই ধর্মীয় আদর্শের ভিত্তিতে, আমরা পাই বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর স্ব স্ব অবস্থানের ও চিন্তার প্রেক্ষিতে, আমরা পাই আঞ্চলিক অবস্থানের কারনে কিংবা পেশাগত অবস্থানের কারনেই নানাবিধ সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় ধর্ম ভিন্ন হলেও পেশাগত কারনে একটা আলাদা সম্প্রদায় তৈরী হয়েছে, দুইটি ভিন্ন অঞ্চলের মানুষ দেখা যায় ধর্মীয় ঐক্যের কারনে এক হয়েছে। সুতরাং এই ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের মধ্যে একটা কমন মিল নিয়েও সম্প্রদায় তৈরী হতে পারে যেখানে অন্য কোনো অংশে সম্পূর্ণ আলাদা সত্বা থাকবার পরেও।

কিন্তু অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বা ধারনা বলতে এটাই বুঝায় যে এই যে আলাদা আলাদা এই সম্প্রদায়গুলো রয়েছে, তারা তাঁদের চিন্তাকেই একমাত্র সঠিক বিবেচনায় তা অন্যের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে কিনা কিংবা সেটি নিয়ে বিদ্বেষ উৎপাদিত করছে কিনা সেটির বিরুদ্ধচারনের বোধকে। আর সেটি যদি করে থাকে তবে এই ধরনের মনোভাব ধারন করা যাবেনা, এটিকেই বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আমরা অসাম্প্রদায়িক চেতনা বলি। যেই চেতনা বা বোধ আমরা মুক্তিযুদ্ধের আগের অভিজ্ঞতা গুলো থেকে পেয়ে তার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছি। সুতরাং এই চেতনাটিই আমাদের স্বাধিকার আন্দলোন কিংবা মুক্তির যুদ্ধ থেকে পাওয়া দেশের একটা বড় ভিত হসেবে উদ্ভাসিত রইবে, এমনটা বলাই হচ্ছে সঠিক ও সত্য।

কিন্তু জাফর স্যারের লেখাটির প্রেক্ষিতে পিনাকীদা এই যায়গায় এসে এমন ভাবে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন যেন অসাম্প্রদায়িক চেতনা বা আদর্শ হচ্ছে কারো কাছ থেকে চেয়ে আনার মত বস্তু। পিনাকীদার প্রশ্ন শুনে মনে হচ্ছে এটি এমন একটি “জিনিস” যেটিকে দাবী হিসেবে উত্থাপন করা যায়। যেমন যদি উদাহরন দেই এইভাবে- “এই ইয়াহিয়া আমাকে দুই ছটাক অসাম্প্রদায়িক চেতনা দিন, তো!” কিংবা “এই যে ভুট্টো, আমার ১০ দফার একটি দফা হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক চেতনার দফা। আমাকে এই চেতনা স্থাপনের নিশ্চয়তা দিতে হবে”

কেন বলছি এসব? কেন আমি এই ধরনের ইলাস্ট্রেশন বা উপমা আমার লেখায় ব্যবহার করছি? সহজ ভাষায় উত্তর হচ্ছে পিনাকীদা যখন প্রশ্ন তোলেন যে অসাম্প্রদায়িক এই চেতনা কখনো দাবী আকারে উত্থাপিত হয়েছে কিনা শাষকের দরবারে এবং সেটির একটি ফিজিকাল অস্তিত্বকে যখন তত্ব তালাশ করে খুঁজে বের করবার চুড়ান্ত চেষ্টা করেন তখন আমাকে এই ধরনের উপমা এই প্রশ্নের অসাড়তা তুলে ধরতে ব্যবহার করতেই হয়।

পিনাকীদা পড়েন, বোঝেন কিংবা ইতিহাস চর্চায়, দর্শন চর্চায় আগ্রহ রয়েছে এমনটিই আমি এতদিন মনে করে এসেছি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে হলেও আমার এই মনে করাতে একটা ভয়াবহ চিড় ধরেছে। অসাম্প্রদায়িক একটা সমাজ ব্যবস্থা যে স্বায়ত্বশাষন কিংবা স্বাধীনতার আন্দোলনের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং সে উপলব্ধি যে বাংলাদেশীরা পাকিস্তান গঠনের পর দীর্ঘ ২৪ বছর ধরেই করে এসেছে সেটি একজন বাংলাদেশীর চোখ এড়ায় কি করে?

আমি এই ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু’র একটি ভাষন উল্লেখ করছি যেটি তিনি দিয়েছিলেন ১৯৭০ সালের নভেম্বরে সাধারণ নির্বাচনের আগে বেতারে ও টেলিভিশনে। এই ভাষনের “সত্যের ভিত্তিতে ছয় দফা” এই অংশে বলেন-

“৬ দফা মুসলিম-হিন্দু-খৃষ্ঠান-বৌদ্ধদের নিয়ে গঠিত বাঙালী জাতির স্বকীয় মহিমায় আত্নপ্রকাশ আর নির্ভরশীলতার অর্জনের চাবি কাঠি” 

ঐ একই ভাষনের “লেবেল সর্বস্ব ইসলাম নয়” অংশে তিনি আবার বলেন,

“ইসলামের প্রবক্তা সেজে পাকিস্তানের মাটিতে বরাবর যারা অন্যায়, অত্যাচার, শোষন, বঞ্চনার পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছেন, আমাদের সংগ্রাম সেই মোনাফেকদের বিরুদ্ধেই” 

এই ভাষনের “লোকশক্তির প্রত্যাশী” অংশে তিনি বলেন-

“বাংলার সকল অধিবাসী-সে সংখ্যা গুরুই হোক বা সংখ্যা লঘুই হোক সকলকেই আজ দেশাত্নবোধ নিয়ে জেগে উঠতে হবে, মরণপণ করে বাংলার মান ইজ্জত রক্ষার জন্য এগিয়ে আসতে হবে” 

[সূত্রঃ বঙ্গবন্ধুর ভাষন, প্রথম প্রকাশঃ ২৬ শে মার্চ ১৯৮৮, প্রকাশকঃ নভেল পাবলিকেশন্স]

আলোচ্য এই ভাষনের একটি অংশই রয়েছে “সকলের সমান অধিকার, সকলের প্রতি বন্ধুত্ব” এমন শিরোনামে। আবার আরেকটি অংশ হচ্ছে “আঞ্চলিক ভাষার বিকাশ” শিরোনামে

আমি আমার লেখায় তো সুনির্দিষ্ট আকারে বঙ্গবন্ধুর নির্বাচন প্রাক্কালের বক্তব্যকেই তুলে ধরলাম তথাপিও আমি পুরো ভাষনটি স্ক্যান করে ইমেজ আকারেও এখানে দিয়ে দিচ্ছি সকলের বুঝবার ও পড়বার সুবিধার্থে।

এই ভাষন পড়বার পর যদি কারো ভেতরে এই সন্দেহ থেকেও থাকে যে মুক্তিযুদ্ধের পেছনের ভিত্তিগুলোর মধ্যে অসাম্প্রদায়িকতা চেতনার কথা নেই, বক্তব্য নেই, ইঙ্গিত নেই বা চিহ্ন নেই তবে সেক্ষেত্রে আমি সে ব্যাক্তির “সেন্স অফ ইন্টারপ্রিটেশন” এর ব্যাপারে তীব্র সন্দেহ প্রকাশ করব। আমি সন্দেহ প্রকাশ করব তাঁর আসল উদ্দেশ্যর ব্যাপারে। আমি তাঁর চিন্তা করবার শক্তি, তাঁর বোধগম্যের ব্যাপারে অবশ্যই হতাশ হব। আমি হয়তবা খুবই জাজমেন্টাল হয়ে উঠছি এই বক্তব্যের মাধ্যমে কিন্তু, এটি-ই খুব সম্ভবত সত্য।

আবার যদি আমরা ৭-ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭-ই মার্চের ভাষনটি দেখি তবে আমরা দেখতে পাই সেখানে লেখা রয়েছে বাংলাদেশের মানুষের অধিকারের কথা। বলা রয়েছে ধর্মের অমিল সত্বেও ঐক্যের কথা। আমি সে ভাষন থেকেও কোট করছি-

“আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করবো এবং এদেশকে আমরা গড়ে তুলবো।এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে”

আমি, আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই”

“এই বাংলার হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-নন বাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই , তাঁদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের উপরে, আমাদের যেন বদনাম না হয়”

এই ৭ই মার্চের ভাষনের এই সুনির্দিষ্ট বক্তব্যগুলো আমাদের আলোচ্য বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ। খুব বড় একটি প্রেক্ষাপটে যদি এই বক্তব্যগুলোকে ব্যখ্যা করা যায় তবে এটি থেকে নানাবিধ চিন্তার ও দর্শনের খোরাক আমরা পাই। এখানে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তির কথা বলা হচ্ছে যেটি পুরো দেশ কিংবা এর ভেতরে থাকা সকল জাতীয়/ সকল ধরনের/সকল ঘরানার সম্প্রদায়ের জন্যই এই উদ্দিষ্ট উল্লেখিত নিয়ামকের অধিকার নিশ্চিত করবার সুসংহত ঘোষনা দেয়। যেটির ব্যাপারে আমরা কিন্তু দেখতে পাই আমার উল্লেখ করা উদ্ধৃতির দ্বিতীয় অংশে। যেখানে তিনি মানুষের অধিকারের কথা সু-স্পস্ট করে উল্লেখ করেছেন। আবার যদি আমি উল্লেখ করা ৩য় উদ্ধৃতির দিকে তাকাই তখন আরো বেশী স্পস্ট করে ধর্ম ভিত্তিক সম্প্রদায়ের প্রতি বঙ্গবন্ধুর মনোভাব, ফিলোসফিকাল অবস্থান তথা তাঁর আকাংখিত শাষন তন্ত্রের একটা স্বরূপ আমরা সু-স্পস্ট ভাবে বুঝতে পারি।

এই পর্যায়ে এসে আমি এখন আলোচনা করতে চাইছি এই যে উপরে বর্ণিত যে অসাম্প্রদায়িক চিন্তা ও চেতনার বয়ান আমরা বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে পেলাম সেটির কিছু ঐতিহাসিক পটভূমির দিকে। এইসব পটভূমির শুরতে ও পরে যে তত্ব এস্টাব্লিশ করা হয়েছে সেটি পরবর্তীতে আমাদের এই অঞ্চলে কিভাবে ব্যার্থতায় পর্যবসিত হয়েছে ও সেটি থেকে সঞ্চারিত অভিজ্ঞতা নিয়েও আমাদের আলোচনা হওয়াটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং সংক্ষেপে ঐতিহাসিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ না করলে এই লেখাটি অসম্পূর্ণ হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের পেছনে অসাম্প্রদায়িক চেতনার এই যে বীজ সেটির উদ্ভভ মূলত কোন প্রক্রিয়ায় হয়েছে তা বুঝতে পারা যাবে না।

এই যায়গায় এসে তাই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে-

  • বঙ্গ ভঙ্গ এবং দ্বিজাতি তত্ব 
  • তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এই তত্বের ব্যর্থতা 


বঙ্গ ভঙ্গ এবং দ্বিজাতি তত্বঃ

১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বঙ্গকে আলাদা করে প্রশাসনিক কারনে। মূলত এটিই হচ্ছে দৃশ্যত দাখিল করা যুক্তি। কিন্তু এই বঙ্গভঙ্গের গভীরে যদি আস্তে আস্তে খতিয়ে দেখা যায় তবে দেখা যাবে পূর্ব বঙ্গের দীর্ঘদিনের প্রাপ্ত লাঞ্চনা গঞ্জনা বঞ্চনার এক কষ্টের অধ্যায়। যদিও ইংরেজরা এই অঞ্চলের কাঠামোগত ভাবে উন্নতি সাধনের কথা বলেছে এবং এই অংশ ভাগ করে এখানে আলাদা একটা ইনফাস্ট্রাকচার তৈরীর মাধ্যমে এই অঞ্চলের উন্নতির রূপরেখা দেন। কেননা এই বাংলা,বিহার উড়ীষ্যাকে যুক্ত করা এই ১ লাখ ৮৯ হাজার বর্গমাইলের বিশাল অঞ্চল একাই একজন লেঃ গভর্ণরকে সামলাতে হোতো। এই অংশে তখন লোক সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৮৫ লক্ষের মত। ভৌগলিক দূরত্ব, যোগাযোগ ব্যবস্থার নানাবিধ অসুবিধা আর এত বড় একটি অঞ্চলের প্রশাসনিক কাজে গতিশীলতা আনায়ন একটা বড় ইস্যু ছিলো। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলেও এই বিষয়ক প্রস্তাব বা ইঙ্গিত দেখা যায় তারও আগে থেকে। কিন্তু এইসব প্রশাসনিক উন্নতি, অঞ্চল ভাগ করে শাষন ব্যবস্থার গতি এসব ব্যাতিরেকে যদি এই অঞ্চলের মানুষের দিকে তাকাই তাহলে বলতে হয় সে সময় তৎকালীন মুসলমান্দের উপর ভারতীয় হিন্দু সামন্ত প্রভুদের অত্যাচার আর বঞ্চনার গল্প ছিলো সীমাহীন। ইনফ্যাক্ট এই বঙ্গবভঙ্গ নিয়ে ভারতীয় এলিট, সামন্তবাদীরা ফুঁসে উঠে। তাদের একচ্ছত্র আধিপত্যের যে অবসানের ছায়া এই বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে সূচিত হয় সেটি তারা ভালোভাবেই অনুধাবন করে। যদিও এই অঞ্চলের মুসলমান এলিটদের মধ্যে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরী হয় এই ঘটনায় কিন্তু দিনের শেষে এই অঞ্চলের মুসলমানরা একটা ব্যাপার বুঝতে সমর্থ হয় যে অবিভক্ত বাংলা মুখে হারমোনাইজেশন কিংবা সাম্যের কথা বল্লেও বাস্তবী ছিলো এটি হিন্দু আধিপত্যবাদের এক বড় অধ্যায়। মুসলমানরা মূলত তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক মুক্তির জন্য আলাদা ক্ষমতায়নের, আলাদা জাতি গোষ্ঠীর বোধটুকু এই সময়ে আরো তীব্র ভাবে পেতে থাকে।

যদি ইতিহাসকে ভালো করে পর্যালোচনা করা যায় তবে এটি কিন্তু বলাই যায় যে জাতিগত ভিত্তিতে সম্প্রদায় বলুন কিংবা ধর্মের ভিত্তিতে সম্প্রদায়-ই বলুন এই অঞ্চলে ক্ষুদ সম্প্রদায়গুলোর আসলে উচ্চকিত হয়ে বলবার স্থান ছিলোনা। কলকাতার জোতদার, হিন্দু জমিদার বা এলিটেরা এই অঞ্চলের মুসলমান বাঙালীকে মনে করত নিম্ন শ্রেণীর মানুষ হিসেবেই। তারা মুসলমানদের মনে করত অপবিত্র, স্লেচ্ছ। সে সময়ে আমাদের সামাজিক আর জীবন যাপনের যে কষ্টের অভিজ্ঞতা সেটি ছিলো একটা আত্ন নিয়ন্ত্রিত সত্বার বিকাশের বা চাইবার চালিকা শক্তি। সাম্প্রদায়িক প্রভাব এবং সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের একটা প্রকটতা এই অঞ্চলকে ছুঁয়ে গেছে তীব্র ভাবেই।

বঙ্গবন্ধুর নিজের একটা অভিজ্ঞতা জানা যাক তাঁর বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্নজীবনী গ্রন্থ থেকে। এরকম নানাবিধ ঘটনা আর বাস্তব অভিজ্ঞতার অসংখ্য গল্প রয়েছে। সব কিছুউ জোড়া দিলে বঙ্গভঙ্গের যে যৌক্তিকতা তৎকালীন মুসলমান সমাজ পেয়েছিলো সেটি আরো পোক্ত হয়।

জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক স্যারের বয়ানেও সে অভিজ্ঞতার রেশ আমরা পাই তীব্র ভাবে। আহমদ ছফার বয়ানে যদ্যপি আমার গুরু গ্রন্থের নানা অধ্যায়ে আমরা রাজ্জাক স্যারের উদ্ধৃতি পাই এই পার্টিকুলার বিষয়ে। স্যারের এই সমর্থনও কিন্তু অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা আর বাস্তবতার ফলাফল মাত্র।

বঙ্গভঙ্গের বিস্তারিত ইতিহাস রচনা করা মোটেও এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরংচ ঐতিহাসিক কিছু সুনির্দিষ্ট ঘটনা কিভাবে একটা পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের আগের ২৪ টি বছর বাংলাদেশ অঞ্চলকে প্রভাবিত করেছে বা সেটি থেকে উৎসারিত হয়ে অসাম্প্রদায়িক চিন্তার বিকাশ কি করে হয়েছে এই অঞ্চলে এবং স্বায়ত্ব শাষনের ফলেই এই চেতনার বাস্তবায়নের একটা স্বপ্ন যে প্রোথিত হয়েছে তা দেখানোই আসলে আমার মূল উদ্দেশ্য।

১৯১১ সালে তীব্র রাজনৈতিক চাপে বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও এই অঞ্চলের মুসলমানরা ঐতিহাসিকভাবেই মূলত আরো বেশী সক্রিয় হয়, চিন্তাশীল হয়, ধাবমান হয় ধর্মীয় জাতিসত্ত্বার উপর ভিত্তি করে নিজেদের স্বাতন্ত্র, ঐতিহ্য আর অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখবার। রাজনৈতিক একটি শক্ত অবস্থান তৈরীতে গঠিত হয় মুসলিম লীগ।মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন, লক্ষ্ণৌ প্যাক্ট, ১৯২৭ সালে সাইমন কমিশন রিপোর্টে ভারতের জন্য একটি সংবিধানের প্রস্তাব এইসব নানাবিধ ঘটনা এই সময়ে ঘটে। ১৯৩৭ সালে কংগ্রেস ও তাদের নিয়ন্ত্রিত প্রদেশ গুলোতে জাতীয় সংগীত হিসেবে “বন্দে মাতরম” গানটি চালু করে। উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে এই গানটি বংকিমের আনন্দমঠ উপন্যাস থেকে চয়নকৃত যেখানে স্পস্টত মুসলিম বিদ্বেষী ভাবধারা রয়েছে এবং মুসলমানদের ধর্মীয় মূল বিশ্বাসের স্থান থেকে এই জাতীয় শব্দের সংগীতকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মেনে নেয়া অসম্ভব ছিলো। এমন ঘটনায় মুসলিমরা নিজেদের আরো বেশী সাম্প্রদায়িক আক্রমনের শিকার মনে করতে থাকে এবং প্রভাবশালী হিন্দু আধিপত্যবাদের সাম্প্রদায়িক চিন্তার ও প্রকাশের ধারা আরো বেশী প্রকট হয়ে দেখা দেয়।

কিন্তু যে কথা আগেও বলেছি এখনো আবার বলছি যে এই সময়ে যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প এই অঞ্চলের মুসলমানদের ছুঁয়েছে রাজনৈতিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক নানাভাবে সেটির অভিজ্ঞতা কিন্তু প্রবল। এইসব বঞ্চনার শিকার হয়ে এই অঞ্চলের মানুষ যে তিক্ত অভিজ্ঞতা লাভ করেছে এবং যে মুক্তির পথ খুঁজেছে সেটির কালক্রমিক পরবর্তী অভিজ্ঞতা মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি গড়তে কিভাবে সহায়ক হয়েছে তা-ই আসলে দেখানো আমার উদ্দেশ্য। এর মধ্যে ব্রিটিশদের “ভূখন্ডগত জাতীয়তাবাদ” তত্বেরও ঘোর বিরোধীতা করে এখানকার মুসলিম সমাজ এবং সেই সাথে এই তাত্বিক অবস্থানের প্রেক্ষিতে যে গণতন্ত্র সূচনার চেষ্টা করে ইংরেজ সুচতুর শাষকেরা সেটিও ভালোভাবে নেয়নি এই অঞ্চলের মুসলমানেরা।

একটা প্রশ্ন এখানে উঠতে পারে যে এই অঞ্চলে কি বিভেদ শুধু মুসলিম আর হিন্দু জাতি সত্তার ভেতরেই দানা বেঁধেছে নাকি ধর্মকে কেন্দ্র করে এই দুইটি জাতিসত্ত্বার বাইরে অন্যান্য প্রান্তিক জাতি [হতে পারে ধর্মের ভিত্তিতে] বা অন্যান্য নানাবিধ সম্প্রদায়কে-ই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের শিকার হতে হয়েছে।

উপরের এই প্রশ্নের বা চিন্তার সূত্র ধরে বলা চলে যে অন্যান্য নানাবিধ সম্প্রদায় বা জাতিও এই হিন্দু এলিট বা সামন্ত প্রভাবিত রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদের শিকার হয়েছে, বঞ্চিত হয়েছে। সেটার প্যাটার্ন ও আঙ্গিক কেমন ছিলো সেটি বিশ্লেষন করব না এখানে কিন্তু সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের দমক যে ঐ আধিপত্যবাদীদের বাইরে ক্ষুদ্র গোষ্ঠী আর সম্প্রদায়ের উপর লেগেছিলো এইটুকু ঐতিহাসিক ভাবেই সত্য।

বঙ্গভঙ্গ রদ করা হলেও মুসলমানদের পৃথক জাতিসত্বার বিকাশের প্রয়োজনীয়তার ধারনাটি কখনো মুছে যায়নি। আর দীর্ঘ পরিক্রমায় ১৯৪৭ এর দেশভাগ শুধু একটা আনুষ্ঠানিকতাই কেবল। ঐতিহাসিক পথ পরিক্রমায় নতুন কিছুই নয়।

দ্বিজাতি তত্ব ছিলো ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির মূল ভিত্তি। ১৯৩০ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর মুসলিম লীগের অধিবেশনে প্রদত্ত আল্লামা ইকবালের সভাপতির ভাষনকে দ্বিজাতি তত্বের প্রথম সূচনা হিসবে বিবেচিত করা হয়। ১৯৩৩ সালে লন্ডনে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে আল্লামা ইকবাল জহওরলাল নেহেরুর এক বিবৃতির ব্যাপারে রিজয়েন্ডার দেন এবং সেখানে উল্লেখ করেন-

In conclusion, I must put a straight question to Pundit Jawaharlal, how is India’s problem to be solved if the majority community will neither concede the minimum safeguards necessary for the protection of a minority of 80 million people, nor accept the award of a third party; but continue to talk of a kind of nationalism which works out only to its own benefit? This position can admit of only two alternatives. Either the Indian majority community will have to accept for itself the permanent position of an agent of British imperialism in the East, or the country will have to be redistributed on a basis of religious, historical and cultural affinities so as to do away with the question of electorates and the communal problem in its present form.

এই বিরূপ চিন্তাধারা আর দর্শনের পরেও দীর্ঘদিনের একত্রে এই জোরাজুরির সহাবস্থানের ফলে এটি প্রমাণিত যে মুসলিম আর হিন্দু সমাজ দুইটি আলাদা ইতিহাসকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা জাতি। ধর্মভিত্তিক পার্থক্য যদি বাদও দেই তারপরে পার্থক্য থেকে যায় অন্যান্য অংশতেও। কি তাদের ঐতিহ্য, কি তার খাদ্যাভাষ, সংস্কৃতি, চিন্তা বা আদর্শের।

এই সমস্যার গভীর ইতিহাস পর্যবেক্ষন করবার জন্য কিন্তু হিন্দু আর মুসলমানের ভেতর যে বৈরিতা এবং সংঘাত সেটির সাল-সাকিন, শানে নযূল গুলোও অনুধাবন করা জরুরী।যদিও সাল বা সময় দিয়ে কবে থেকে শুরু হয়েছে এটির ক্ষেত্রে জাজমেন্টাল হওয়াটা সম্ভব না তথাপিও হাজার বছরের ইতিহাস এই ক্ষেত্রে দেখা উচিৎ।অষ্টম শতাব্দীর ভারতবর্ষে ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বের যুগ থেকে হিন্দু এবং মুসলমানেরা নানাবিধ যুদ্ধে লিপ্ত ছিলো। সেটা কতটা ধর্মভিত্তিক আর কতটা ক্ষমতার বিস্তার লাভের আকাংখাতে লড়াই সেটির নানাবিধ ন্যারেটিভ রয়েছে। কিন্তু অনেকগুলো কারনের ভেতরে ধর্ম যে একটা প্রধান উপজীব্য সেটি বলা বাহুল্য। ৭১২ খৃষ্টাব্দে সিন্ধুর রাজা দাহিরের সাথে মুহম্মদ বিন কাসিমের যে যুদ্ধ হয় সেটির রেশ হাজার বছর ধরেই চলেছিলো।তারপর মহারাজা জয়পালের সঙ্গে গজনীর সুলতান মাহমুদ,পৃথ্বিরাজের সঙ্গে শিহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘোরি, রানা প্রতাপ সিং এর সাথে সম্রাট বাবর এবং শিবাজীর সঙ্গে সম্রাট আওরঙ্গজেবের যুদ্ধের ইতিহাস বুঝতে পারাটা জরুরী।এই কারনেই জরুরী যে এই হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের দ্বন্দ বুঝবার জন্য এই সঙ্ঘাত গুলো্র ঐতিহাসিক সুত্রগুলো বা কারন গুলোর উপলব্ধি জরুরী এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

সমস্যার মূলে আমার কাছে শুধু ধর্মই যে একমাত্র বিবেচ্য তা একেবারেই নয়। ধর্মের পার্থক্য, সেটি থেকে উৎসারিত আঞ্চলিক রাজনৈতিক আধিপত্যবাদ, তার ফলে বঞ্চনা, আর তার থেকে আলাদা জাতি সত্বার ধারনা কিংবা প্রয়োজনীয়তার কথা যতই বলা হোক এর মূল অনেক বেশী বিস্তৃত ছিলো বলেই ইতিহাস আসলে সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু প্রাথমিকভাবে ধর্মকে আর তার পার্থক্যের এবং এটিকে ভিত্তি করে বঞ্চনা টা ছিলো দৃশ্যত স্পস্ট। সুতরাং এই দৃশ্যমান সমস্যা আর তার থেকে উদ্ভব হওয়া সমস্যাগুলোর পরিত্রান যে ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা জাতি রাষ্ট্র গঠনে পূর্বক পাওয়া সম্ভব সেটি ঐ চিন্তার চালিকা শক্তি ছিলো এটা বলা বাহুল্যই মাত্র। যুগ বিবেচনায় তৎকালীন মুসলিম নেতা কিংবা সাধারন জনতার বিচার্য বিষয় ছিলো ধর্মের ভিত্তিতেই আলাদা জাতি সত্ত্বা বিকাশের স্বপ্ন। এটার বীজ ঐতিহাসিকভাবে রোপন করা ছিলো।

ধর্মভিত্তিক সম্প্রদায় ছাড়াও কি এই ভারতবর্ষে অন্যান্য অনান্য নানা ভিতের ও দর্শনের উপর স্থাপিত সম্প্রদায় বিরাজ করত না? অবশ্যই করত।নানাবিধ প্রান্তিক পেশাজীবি সম্প্রদায়, মূল ধর্মের বাইরের ধর্মের আরো সম্প্রদায় এমনকি খোদ হিন্দু ধর্মের মধ্যেও নানাবিধ কাস্ট প্রথার উপর ভিত্তি করে সম্প্রদায় এসব সবার মধ্যেই কিন্তু টানাপোড়েন ছিলো, নিজস্ব চিন্তা আর চেতনা বিকাশের তীব্র আকাংখাও ছিলো।কিন্তু এইসব সকল সম্প্রদায়ের উপর জেঁকে বসা বঞ্চনা, নির্যাতন, অভাব, অনটনগুলোর অব্যাক্ত ক্ষোভগুলোও কিন্তু ঐতিহাসিক ভাবে সত্য। সাম্প্রদায়িকতার বিষ বাষ্পে জর্জরিত একটি পুরো মহাদেশের চারিদিকেই তখন নতুন স্বপ্নের তীব্র আশা বিরাজ করছিলো।

১৯৪৭ এর দেশ ভাগ তাই অবশ্যম্ভাবী-ই ছিলো।এই দেশ ভাগ প্রশ্নেও হিন্দু কট্টর রাজনীতিবিদেরা পাকিস্তান রাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যের কোথাও স্থানান্তরের কথা বলে, অধিকাংশ এলিটেরা ক্ষমতা খর্বের পরণতি চিন্তায় এর তীব্র বিরোধীতা করে। ১৯৪০ সালে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলে-

It is extremely difficult to appreciate why our Hindu friends fail to understand the real nature of Islam and Hinduism. They are not religions in the strict sense of the word, but are, in fact, different and distinct social orders, and it is a dream that the Hindus and Muslims can ever evolve a common nationality, and this misconception of one Indian nation has troubles and will lead India to destruction if we fail to revise our notions in time. The Hindus and Muslims belong to two different religious philosophies, social customs, and litterateurs. They neither intermarry nor interline together and, indeed, they belong to two different civilizations which are based mainly on conflicting ideas and conceptions. Their aspect on life and of life is different. It is quite clear that Hindus and Musolmans derive their inspiration from different sources of history. They have different epics, different heroes, and different episodes. Very often the hero of one is a foe of the other and, likewise, their victories and defeats overlap. To yoke together two such nations under a single state, one as a numerical minority and the other as a majority, must lead to growing discontent and final destruction of any fabric that may be so built for the government of such a state.

১৯৪৪ সালে আবার মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলে-

We maintain and hold that Muslims and Hindus are two major nations by any definition or test of a nation. We are a nation of hundred million and what is more, we are a nation with our own distinctive culture and civilization, language and literature, art and architecture, names and nomenclature, sense of values and proportions, legal laws and moral codes, customs and calendar, history and tradition, and aptitude and ambitions. In short, we have our own outlook on life and of life.

আগেই বলেছি যে ইতিহাসের এসব সব অধ্যায় বিস্তারিত লেখা এই লেখার মূল উদ্দেশ্য নয়। সে কারনেই ঐতিহাসিক উল্লেখিত এই পটভূমিতে আমি বিস্তারিত লিখছি না শুধু ঐতিহাসিক মূল ঘটনাগুলোর একটা ফ্রেম দাঁড় করবার চেষ্টা করা ছাড়া।সুতরাং উপরের আলোচনা আসলে এই লেখার বিষয় বস্তুর সাপেক্ষে সামনে এসেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পেছনে যেসব ঐতিহাসিক পটভূমিগুলো রয়েছে এবং যেসব দর্শন গুলোর ভিত্তিতে স্বাধিকারের, মুক্তির প্রশ্ন এসেছে সেগুলো আলোচনা না করলে এই লেখাটির পরবর্তী অধ্যায়গুলো বুঝতে পারা যাবে না।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এই তত্বের ব্যর্থতাঃ

প্রশ্ন এসেই যায় দেশভাগের পর মুসলমানরা আলাদা যে জাতিসত্বার বিকাশ চেয়েছিলো সেটি কতটুকু উত্তীর্ণ হয়েছে? পূর্ব পাকিস্তান মানে আমাদের আজকের বাংলাদেশ এবং পশ্চিম পাকিস্তান মানে আজকের পাকিস্তান যে মূলত ধর্মের ভিত্তিতে একটি স্বতন্ত্র জাতি গঠিত করে আগের বঞ্চনা আর আধিপত্যবাদের নির্মূল চেয়েছে সেটি কি কার্যকরী ছিলো?

প্রশ্নটির সহজ উত্তর হচ্ছে, না সেটা কার্যকর হয়নি। কার্যকর তো হয়-ই নি বরং দ্বি জাতি তত্ব যে আসলে একটা ভুল তত্ব সেটি বার বার প্রমাণিত হয়েছে। দেশভাগের পর হয়ত হিন্দু আধিপত্যবাদের ও তাদের এলিট, সামন্তদের কাছ থেকে দূরে সরে থাকা গেছে কিন্তু এই আধিপত্যবাদ আবারো নতুন এই পাকিস্তানে আবারও ফিরে এসেছে আরো তীব্র হয়ে।

সাতচল্লিশ এর দেশভাগের মূল দর্শন ধর্মের ভিত্তিতে জাতি গঠিত হলেও এখানে সাম্প্রদায়িক ভাবনার ভয়াবহ আধিপত্য ছিলো শুরু থেকেই। সাম্প্রদায়িকতার নানান রূপের সাথেই বরংচ বাংলাদেশ পরিচিত হয়েছে নানান ফরম্যাটে।যে সমাজে সাম্যবাদ অনুপস্থিত, সকলের কথা বলবার অধিকার, মতামত দেবার, টলারেন্স প্রবণতা শূন্যের কোঠায় সেখানে ধর্ম ভিত্তিক জাতি গঠন আসলে আধিপত্যবাদের নতুন মোড়ককেই উদ্ভোধন করে।

আগেই বলেছি শুধু কি ধর্মীয় ভিত্ততে সম্প্রদায় গঠিত হয়, শুধু কি জাতীয়তার ভিত্তিতে সম্প্রদায় গঠিত হয়? উত্তর হচ্ছে না। তা নয়। সম্প্রদায় গঠিত হ্তে পারে একই ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে আরো উপ-দর্শনের ফলশ্রুতিতে, সম্প্রদায় গঠিত হতে পারে চিন্তার ঐক্যের ফলে, সম্প্রদায় হতে পারে পেশার ঐক্যে, আঞ্চলিকতার ঐক্যে। সুতরাং সম্প্রদায় যতই গঠিত হোক কিংবা যতই ধর্ম ভিত্তিক পার্থক্য থাকুক না কেন যদি এই হাজারো সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা কিংবা সাম্যের ভিত্তিতে বা পারষ্পরিক শ্রদ্ধাবোধের যায়গাটা শক্তিশালী একটি ভিত্তিতে পরিণত না হয় তবে আলাদা জাতি গঠন-ই সমাধান নয়।

হায়দার আকবর আলী খান রনো’র ভাষায়,

পাকিস্তানের দাবি ছিল আসলে অবাঙালি উঠতি বুর্জোয়া ও জমিদার শ্রেণির দাবি। শ্রেণিগতভাবে মুসলিম লীগ তাদেরই দল। ভারতের মুসলমান উঠতি বুর্জোয়ারা (যারা আবার অবাঙালি) চেয়েছিল অধিকতর শক্তিশালী ভারতীয় অমুসলমান বুর্জোয়াদের প্রভাবমুক্ত এলাকা, যেখানে থাকবে তাদের একচ্ছত্র শোষণ ও লুণ্ঠনের অধিকার। কিন্তু বাঙালি উঠতি মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ ভেবেছিল অন্য কিছু। মুসলমান কৃষক প্রজা চেয়েছিল, হিন্দু জমিদারদের কাছ থেকে মুক্তি। আর মুসলমান বাঙালি মধ্যবিত্ত ভেবেছিল চাকরি ও ব্যবসার ক্ষেত্রে দ্রুত উন্নতি লাভ করতে পারবে। সেই সময় চাকরি ও ব্যবসার ক্ষেত্রে হিন্দুরা অগ্রসর ছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ফলে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের কিছুটা উন্নতি হলেও তারা এক নতুন ধরনের ঔপনিবেশিক শোষণের শিকার হলো। তাই পাকিস্তানের মোহ দ্রুতই কেটেছিল। এবার তারা নিজেদের জাতি হিসেবে ভাবতে শিখল। বাঙালি জাতি, যারা বাংলা ভাষায় কথা বলে। এখানে হিন্দু-মুসলমানের বিভেদ

সুতরাং দেশভাগের পর ধর্মের উপর ভিত্তি করে একটিও একক জাতির একক দেশ গঠিত হলেও সেখানে ছিলো সাম্প্রদায়িকতার বীজ, সেখানে ছিলো আধিপত্যবাদের, ক্ষমতার একচ্ছত্র নোংরামো। মুসলমানরা আগে যেখানে অপবিত্র ধ্যান হয়েছে, স্লেচ্ছ নির্নীত হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের দারা সেখানে এই পাকিস্তানে এক অংশের মুসলমান আরেক অংশের মুসলমানকে “হিন্দু প্রভাবিত মুসলমান” মনে করেছে, বাঙালীকে অগ্রাহ্য করেছে সমাজের সব ক্ষেত্রে নানান অবহেলায়।

ভাষা আন্দোলোন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের হেজিমোনিঃ

এই অবহেলা, আধিপত্যবাদ, বঞ্চনার প্রেক্ষিত রচনার পথে একটা বড় ঘটনা হচ্ছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন।দেশভাগের মাত্র ৫ বছরের মধ্যেই বাঙালীর নিজস্ব মাতৃভাষা যেটি তার সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান উপকরন সেটিকে তীব্র লাঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানী শাষকদের কাছ থেকে। বাংলা ভাষা হচ্ছে হিন্দুদের ভাষা এই ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানীদের মূল উপজীব্য।উর্দূ, যেটি ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানীদের প্রধান ভাষা ছিলো সেটিকে জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিলো এই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালী অধ্যুষিত অঞ্চলে। বাঙালীর মুসমানিত্বের প্রশ্নে নয়, বরং একই ভাষাভাষী এই রকম একটা সম্প্রদায়ও যদি বিবেচনা করি তবে তার উপর পশ্চিম পাকিস্তানের এই অমার্জনীয় আঘাত কিন্তু শুরুতেই দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তি কিংবা পাকিস্তানের কবর রচনা করে দিয়েছিলো। যে ২৪ টি বছর আমরা পশ্চিমের সাথে ছিলাম সেটি ছিলো আসলে অনেকটা জোর করেই থাকা। আগেই বলেছি ৫২’র ভাষা আন্দোলন খুব স্পস্ট করে দেখিয়ে দিয়েছিলো বিদায়ের রাস্তা। চাপিয়ে দেবার ইচ্ছে ব্যাক্তই নয় বরং জিন্নাহ এই বিষয়কে উপজীব্য করে তার ক্ষেদের অনলে হত্যা করেছিলো সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, শফিক সহ নাম না জানা আরো অনেককেই। বাংলাদেশ ভাষার জন্ত, নিজের সংস্কৃতি রক্ষায় রক্ত দিয়ে জানান দিয়েই জানিয়ে দিয়েছিলো ভবিষ্যতের বার্তা।

এই বিষয়েও হায়দার আকবর খান রনোর ভাষ্য আমার দৃষ্টিতে জরুরী,

ভাষা আন্দোলন তাই পাকিস্তানি ভাবধারাকেই আঘাত করেছিল। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে চলে আসা মুসলিম জাতীয়তাবাদ, যার প্রধান প্রবক্তা হয়ে দাঁড়ালেন জিন্নাহ সাহেব, সেটাকেই কার্যত অস্বীকার করে ভাষা আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, যদিও তখনো পর্যন্ত সরাসরি পাকিস্তানবিরোধী কোনো বক্তব্য আসেনি। প্রতিটি দেশের জাতীয়তাবাদের নিজস্ব কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকে। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম উপাদান হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। পাকিস্তানি ভাবধারার মুসলিম জাতীয়তাবাদকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়েই তদানীন্তন পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমান নতুন করে তার জাতীয় সত্তাকে খুঁজে পেয়েছিল।

ঐ একই লেখাতে তিনি বলেন-

একুশের চেতনার মধ্যে অবশ্য এই বহুমাত্রিক দিক ছিল না। কিন্তু যেটা ছিল তা হলো পাকিস্তানি চেতনার ঠিক বিপরীতটি। এটা ভাবতে অবাক লাগে যে ১৯৪৭ সালে যারা পাকিস্তানের জন্য সোচ্চারে স্লোগান দিয়েছিল, তাদেরই সন্তানরা মাত্র ২৪ বছর পর সেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্রটির বিরুদ্ধে ঘৃণা এবং ক্রমেই সংগ্রামের আকাঙ্ক্ষা বিকাশ লাভ করেছিল এই ২৪ বছরে; যার সূচনা হয়েছিল ভাষা আন্দোলন থেকেই। এটাও ভাবতে অবাক লাগে যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই পাকিস্তানি চেতনা এভাবে হারিয়ে গেল কিভাবে? পাকিস্তানি চেতনা বলতে কী বুঝি? পাকিস্তান আন্দোলনের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা তো পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নিজেই দিয়ে গেছেন। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা নয়, ধর্মীয় সম্প্রদায়ভিত্তিক জাতীয়তা। বাঙালি যে একটি স্বতন্ত্র জাতি তার অস্বীকৃতি ছিল পাকিস্তানি ভাবধারার মধ্যে। বাঙালি ভাষা হিন্দুদের ভাষা- এমন কথা শোনা গিয়েছিল। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে সরাসরি তুচ্ছ করার ঘটনাও আমরা দেখেছি। ঘরে উর্দুতে কথা বলাকে মুসলিম উচ্চবিত্তের সমাজে আভিজাত্যের লক্ষণ বলে মনে করা হতো। তথাকথিত অভিজাত মুসলমানরা ঘরে উর্দুতে কথা বলতেন। একুশের আন্দোলন এই ধারাটির পতন ঘটিয়েছিল। জাতি হিসেবে আমরা বাঙালি বলতে গর্ববোধ করতে শুরু করি। আমাদের ভাষা বাংলা ভাষা, যা ছিল পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষেরও ভাষা, তাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার জন্য দাবি জানাই। জনগণের মানসিকতা ও চেতনার ক্ষেত্রে এই যে বিরাট পরিবর্তন, একুশের আন্দোলনের সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় তাৎপর্যপূর্ণ দিক।

[সূত্রঃ অসাম্প্রদায়িকতা ও একুশের চেতনা, হায়দার আকবর খান রনো, লেখার লিঙ্ক]

ব্যর্থতার আলোকে লব্ধ অভিজ্ঞতাঃ

১৯৪৭ এর দেশ ভাগের পরবর্তী সময়ে খুব সুক্ষ্ণভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে মননশীলতা, প্রগতিশীলতা কিংবা সুস্থ চিন্তার একটা বিশাল ফারাক। শিল্প, সংস্কৃতি কিংবা সাহিত্য চর্চার দিক থেকেও এই ফারাক খুব সুস্পস্ট ছিলো। উপরে এই সুনির্দিষ্ট বিষয়ে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ হায়দার আকবর খান রনোর বক্তব্য তাই খুব তাৎপর্যপূর্ণ বলেই আমার মনে হয়েছে। ধর্মভিত্তিক মুসলমান জাতি সত্তায় শুধু নাম হিসেবেই পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তান ছিলো মুসলমান। কিন্তু এই ধর্মের চর্চা, নানাবিধ সংস্কৃতিক চর্চা, ঐতিহ্যের দিক থেকে, চিন্তা, চেতনা কিংবা মননশীলতার ফারাক বিবেচনায় ছিলো যোজন যোজন দূরত্ব। ভাষার উপর পাকিস্তানীদের প্রথম আঘাতেই যেটা স্পস্ট হয়েছিলো যে “হারমোনাইজেশন থিওরী” পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা নিতে অপারগ বরংচ ভাষার উপর হেজিমোনিক অস্ত্রকে ক্ষমতার স্থায়ী সূত্র বলেই তারা মনে করেছিলো।

পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তানের মৌলিক পার্থক্য যা ছিলো সেটি আমার পর্যবেক্ষনে বরাবরই মনে হয়েছে চিন্তা আর দর্শনে। আমাদের এই অঞ্চল, মানে পূর্ব পাকিস্তানের চিন্তা আর চেতনার বিকাশ পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় ছিলো অধিকতর অগ্রগামী। অগ্রগামী বলছি পূর্বের ফিলোসোফিকাল যে দৃষ্টি ভঙ্গি আছে সেটা ছিলো মানবিক এবং অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতাকে এখানে অতিক্রম করবার বাসনাও ছিলো প্রকট। সেটা কিভাবে তা হয়ত সামনে কিছুটা আলোচনা করব। কিন্তু এই যে বলেছি অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা সেটি বলছি প্রাক ১৯০৫ থেকে ৪৭ এর আগ পর্যন্ত যে নানাবিধ বঞ্চনা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের অভিজ্ঞতা কিংবা রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের একটা বিস্তার এই আমাদের এইদিকের জনপদকে ঘিরে তীব্র হয়েছিলো সে কথা মাথায় রেখে।

আগেই বলেছি দেশভাগের পর যে স্বপ্ন পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ দেখেছিলো বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ জনতা সেটি ছিলো অতীতের নানাবিধ ঘটনাক্রমের ফলে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার আলোকে।১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলোন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮ সালে সামরিক শাষন বিরোধী আন্দোলোন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলোন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলোন, ১৯৬৯ সালের গন অভ্যুত্থান ও ১১ দফা এগুলো আমাদের এই অঞ্চলকে জাতীয়তাবাদী চিন্তাকে, একটি একক সত্ত্বায় যেমন একত্রিত করেছে তেমনি এসব আন্দলনের ফলে অসাম্প্রদায়িক চেতনারও বিকাশ ঘটেছে সেই পূর্ব অভিজ্ঞতার ফলাফল হিসেবে।

সরদার ফজলুল করিম স্যারের এই বিষয়ক আরেকটি অবজার্ভেশন এই সুনির্দিষ্ট অবস্থানে জরুরী-

আবার একই সাথে বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসী জাতিসত্বাদের দীর্ঘ সংগ্রামী ইতিহাসও এখানে উল্লেখযোগ্য। চাকমা বিদ্রোহ,সাঁওতাল বিদ্রোহ, হাতি খেদা বিদ্রোহ,মুন্ডা বিদ্রোহ,হদি আন্দোলণ, টংক আন্দোলোন এসব নানাবিধ চড়াই উৎরাই পার হয়েও এই সুনির্দিষ্ট এলাকার অধিবাসীরাও যোগ দেন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র সৃষ্টিতে। সক্রিয় হন মুক্তিযুদ্ধে।

দুইটি ধর্মের একসাথে থাকবার সময়ও যে বঞ্চনার শিকার এই জনপদের মানুষেরা প্রত্যক্ষ করেছে এবং সেটির সমাপ্তি প্রকল্পে দেশ ভাগের সারকথা যখন ব্যার্থতায় পর্যবসিত হোলো তখন উপলব্ধিটুকু আমাদের যা হয়েছে তা হচ্ছে সাম্যের, সংহতির এবং পারষ্পরিক শ্রদ্ধাবোধের যায়গা থেকে সহবস্থান। ধর্মীয় বিশ্বাসের আলোকে গঠিত পাকিস্তানের এই ভীষন ব্যার্থতা এই অঞ্চলের মানুষদের মানসিকতায় এটি সুনিশ্চিতভাবে নির্ধারিত করে দিলো যে অসাম্প্রদায়িক চেতনাই আসলে পারে মুক্তি দিতে। উপলব্ধির যায়গা থেকে বাঙালী এই দর্শনকেই বরং তাদের চেতনায় ঠাঁই দিয়েছে। এটা এমন একটা দর্শন যেটা আসলে আরোপিত নয় বরং অতীতের ব্যার্থতাগুলোর ফলে এক ধরনের বাস্তব অভিজ্ঞতা।

দফা, দাবী, দাওয়ার মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চিন্তার বহিঃপ্রকাশঃ

পিনাকীদা আমার কাছে অসাম্প্রদায়িক চেতনা যে আসলে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি ছিলো তিনি সেটার প্রমাণ চান কাগজে লিখিত কোনো দাবীতে, দাওয়াতে, ঐতিহাসিক ডকুমেন্টে। এই প্রমাণ চাইতে গিয়ে তিনি এও বলেছেন-

“আমি নিঝুমকে আহবান করছি, যুক্তি নয় ঐতিহাসিক ডকুমেন্ট থেকে প্রমাণ করে দেবার জন্য “অসাম্প্রদায়িকতা” মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি হিসেবে ১৯৭১ এর ১৬ ই ডিসেম্বরের আগে উচ্চারিত হয়েছিল”

পিনাকীদার বক্তব্য অনুযায়ী তাঁকে এইসব ঐতিহাসিক ডকুমেন্ট যেগুলোর মধ্যে আমাকে দেখাতে হবে যে সেগুলোতে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের সু-স্পস্ট ঘোষনা রয়েছে। সে ঐতিহাসিক ডকুমেন্টের কথা বলতে গিয়ে পিনাকীদা সুনির্দিষ্ট ভাবে উল্লেখ করেন-

“১/ ৬ দফা, ১১ দফায়।

২/ মুজিবনগর সরকারের ঘোষণা।

৩/ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্র, দাবিনামা, কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক প্রকাশিত লিফলেট, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পত্রিকা বা প্রকাশনা।

৪/ মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য, সাক্ষাৎকার, লেখা।

মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি প্রচ্ছন্নভাবে থাকতে পারেনা। এটা হতে হবে প্রকাশিত, উচ্চারিত এবং স্পষ্ট” 

পিনাকীদার বেঁধে দেয়া শর্তগুলো আমাকে আসলেই ব্যাথিত করে। তিনি চান প্রকাশিত ঐতিহাসিক দাবীর শব্দমালায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার বয়ান। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমার একটাই সেটা হচ্ছে পিনাকীদা রাষ্ট্রের ভিত্তি, রাষ্ট্রের দর্শন এইসব ইন্ট্যাঞ্জিবল ধারনাকে দাবী আকারে দেখতে চান। দেখতে চান এক দুই তিন এইভাবে পয়েন্ট আকারে। পিনাকীদার দাবী অনুযায়ী যদি ৬ দফা কল্পনা করি তবে ব্যাপারটা কি দাঁড়ায়? একটা উদাহরন দেই-

 “দফা নাম্বার ৩। পূর্ব পাকিস্তানকে অসাম্প্রদায়িক চিন্তার বিকাশে কোনোরূপ বাঁধা দেয়া চলিবে না” 

ব্যাপারটা কল্পনা করেই এক ধরনের কৌতুক বলে বিভ্রম হয়। এটাকে ঠিক হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিব কিনা এমনটা ভাবতেই মনে হোলো, যদি হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিতেই চাইতাম তবে হাজার হাজার শব্দে এই খাটা খাটুনীর লেখারই হয়ত আর দরকার পড়ত না।

উল্লেখিত ভিন্ন ভিন্ন দলিলের আলাদা স্বকীয়তা এবং তার “অদ্ভুত” একীভূতকরণঃ

পিনাকীদা যে ৬ দফা, ১১ দফা কিংবা আরো নানাবিধ দলিলের কথা উল্লেখ করে পয়েন্ট আকারে উঠিয়ে দিলেন এবং এগুলোর মধ্যে সাম্প্রদায়িক চেতনা দেখিয়ে দিতে বললেন কষ্টের বিষয় হচ্ছে তিনি খোদ এই দলিলগুলোর এক একটি আলাদা স্বকীয়তা, আলাদা বৈশিষ্ট্য কিংবা আলাদা মেরিট বিবেচনা করে বলেছেন বলে মনে হয়না। যদি করতেন তাহলে এইভাবে পয়েন্ট আকারে যা মনে এসছে সেসব সব দলিলের ভেতরেই লিখিত আকারে সাম্প্রদায়িক চেতনা খুঁজতে যেতেন না।

৬ দফার যেই মেজাজ বা যে প্রেক্ষাপট ১১ দফার প্রেক্ষাপট তার অত্যন্ত সমসাময়িক হলেও এর কলেবর আরো বিস্তারিত। ১১ দফা ৬ দফাকে গ্রহন করেছে উপরন্তু আরো সুনির্দিষ্ট করে রাষ্ট্রের ফিজিকাল কাঠামোকে প্রকাশ করে। খুঁজলে এখানেও সাম্য, সমান অধিকারের বক্তব্য পাওয়া যায়। কিন্তু কথা সেটা নয় এই অংশে। কথা হচ্ছে ৬ দফা, ১১ দফা, স্বাধীনতার ঘোষনা, আওয়ামীলীগের মেনিফেস্টো এগুলো প্রত্যেকটির আলাদা আলাদা নিজস্ব স্বকীয়তা আছে। একটি পুরো বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় এসব দলিল, দাবী উত্থাপিত হলেও প্রত্যেকটির উপ-প্রেক্ষাপট রয়েছে। আলাদা সময়ের সাথে সাথে দাবীগুলোর আলোচনা বিশ্লেষিত হতে হবে।

কিন্তু পিনাকীদা যখন সব কিছুকে একত্রীভূত করে নিজস্ব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবার জন্য লিটারেল চিন্তার ও তার প্রেক্ষিতে লিটারেল টেক্সট দেখার মনোভাব ব্যাক্ত করেন তখন সেট কি আসলে তাঁর বুঝবার সমস্যা নাকি ইতিহাসকে অস্বীকার করবার ইচ্ছে, এটি আমার বুঝতে সমস্যা হয়।

লিটারেল এপ্রোচঃ

উপরে যে পয়েন্ট টি আলোচনা করেছি সেটির সাথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ থীওরী এখানে প্রাসঙ্গিক। সেটি হচ্ছে লিতারেল এপ্রোচ। আমি ইংলিশ আইন পড়তে গিয়ে এই থিওরীর সাথে ব্যাপক ভাবে পরিচিত হই। একটি আইনকে একজন বিচারক ঠিক কোন আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করছেন সেটি এই থিওরীর উপজীব্য। যদিও আমাদের আলোচনাতে এই থিওরী কিভাবে কাটায় কাটায় যায় এটি নিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু এটির একটা সিমিলার প্রেক্ষাপট যে এখানে তৈরী হয়েছে এটি বলা বাহুল্য।

পিনাকীদা ইতিওহাসকে অনুবাদ করবার যে পদ্ধতি ধারন করছেন সেটি আমার মতে বিপদজনক। বিপদ জনক এই সেন্সে যে ইতিহাস আসলে এভাবে অক্ষর বাই অক্ষর বিবেচ্য হয়না। একটা জাতির অন্যতম স্পিরিট, তাড়না, চরিত্রকে লিখিত আকারে প্রকাশিত থাকতে হবে যত ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে গেছে তাদের সবার মধ্যে এই চাওয়া একটি বেশীই সিলি।

অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তি, এর বিকাশ মূলত ঐতিহাসিক ঘটনার বিশ্লেষনের ফলাফল হিসেবে সামনে আসবে এমনটাই যৌক্তিক। আর এই বিশ্লেষনের জন্য এই অঞ্চলের মানুষদের চরিত্র, তার সংস্কৃতি, তার অভিজ্ঞতা, এডপ্টেশনের ক্ষমতা, ইতিহাসের পাঠ এগুলো জরুরী।

কিন্তু এসব না করে, পারপাসিভ কিংবা কি কারনে কি হচ্ছে এই রাস্তায় না গিয়ে “কি লেখা রইলো” থীওরী আসলে এই ধরনের বিমূর্ত প্রকরণের অস্ত্বিত সন্ধানে আরো বেশী জটিল করে তোলে। আর এই জটিল করাটা পিনাকীদা যদি নিজে নিজেই করে ক্ষান্ত হতেন সেখানেও আপত্তি থাকতো না। মুশকিল হচ্ছে তিনি অন্যের চিন্তার ক্ষেত্রেও এই লিটারেল এপ্রোচের প্রয়োগ চান। অন্য চিন্তা এখানে তাঁর কাছে যৌক্তিক নয়। এটিও কিন্তু চিন্তার দৈন্যতা বলে আমি মনে করি। পিনাকীদার নীচের বক্তব্যে আমি তার রেশ পাই-

আমি নিঝুমকে আহবান করছি, যুক্তি নয় ঐতিহাসিক ডকুমেন্ট থেকে প্রমাণ করে দেবার জন্য

স্বায়ত্ব শাষন, স্বাধীনতা, আত্ননিয়ন্ত্রনের অধিকার এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলার এস্টাব্লিশমেন্টঃ

আমি উপরে যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের এবং সেখান থেকে ধীরে ধীরে আমাদের এই অঞ্চলে একটা বাস্তব অভিজ্ঞতায় পূর্ণ চিন্তার বিকাশের কথা বলেছি সেটা কিন্তু একটা কল্পিত রাষ্ট্র বা ইউটোপিয়ার সূচনা করে। এই কল্পিত রাজ্যের চিন্তার বিকাশ ঘটবার পেছনে যে ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে সেটি ব্যাক্তিকে ডিটারমাইন্ড করে ঐ অভিজ্ঞতার আলোকে রাষ্ট্রের জন্য ফিজিকাল সংবিধি প্রণয়ণে কিংবা দাবী উত্থাপনে।

এইসব দাবী ম্যাটারিয়াল প্রকরনে আদৃত থাকলেও সেটির পেছনে থাকে সেসব ইন্ট্যাঞ্জিবল প্রকরন।৬ দফা বা মূলত স্বায়ত্ব শাষনের দাবী। যদিও এখানে অর্থনৈতিক, প্রতিরক্ষা নানা বিষয়ে দাবী উল্লেখিত হয়েছে।

৬ দফা হচ্ছে একটি আকাংখিত রাষ্ট্রের ফিজিকাল কাঠামোর একটা প্রকাশমাত্র। এই প্রকাশের অন্তরালে যে স্পিরিট কিংবা যে দর্শন চালিকা শক্তি হিসেব কাজ করেছে সেটিকে অনুধাবন না করে প্রকাশ্য দেখতে চাই বলে প্রমাণ চাওয়ার পুরো ব্যাপারটির মধ্যে যেমন রয়েছে কৌতুক তেমন রয়েছে চাতুরী।

পাল্টা প্রশ্ন করবার তীব্র ইচ্ছে থেকে পিনাকীদার এইসব বয়ানের প্রেক্ষিতে বলা যায় ৬ দফার মধ্যে যে উপকরনগুলো রয়েছে সেসবকেই কি তবে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সোল ভিত্তি বলে মনে করেন কিনা? যদি করে থাকেন তবে এই ঐতিহাসিক দলিলে আমি যদি “লিটারেল ইন্ট্রাপ্রিটেশন” ধারনাকে উপজীব্য করে বলি এই ৬ দফায় যেহেতু দুইটি পৃথক মুদ্রাব্যবস্থার কথা বলা রয়েছে সুতরাং দুইটি মুদ্রা ব্যাবস্থার এই পদ্ধতি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি। কেননা এই দফা ৬ দফার মধ্যে সন্নিবেশির রয়েছে। ব্যাপারটা সেক্ষেত্রে হয়ে উঠবে হাস্যকর এবং খেলো।

অথচ যদি “অর্থনৈতিক মুক্তি”র একটা বৃহৎ ধারনাকে এখানে বিবেচনা করি তাহলে দেখতে পাব এই ধারনাগত প্রকরণটি কিভাবে কয়েকটি ম্যাটারিয়াল দফার মাধ্যমে ৬ দফায় প্রকাশিত হয়েছে।আমার এই ব্যাখ্যার অনুরন কিন্তু পাই ১৯৭০ সালের আগের নির্বাচনী ভাষনে। যেখানে বঙ্গবন্ধু বলেন-

তার মানে কি দাঁড়াচ্ছে। অর্থনৈতিক অন্যায় আর অবিচারের প্রেক্ষাপটে তার ফিজিকাল একটা রূপ হচ্ছে ৬ দফা আর ১১ দফা। ঠিক একই ভাবে অসাম্প্রদায়িক চেতনার যে বিকাশমান ধারা পূর্ব বাংলায় বজায় রয়েছে এবং যে চেতনাটি পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত সেটির স্থায়ী একটা রূপ কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ব শাষনের মধ্য দিয়ে নিশ্চিত হয়। আর ৬ দফার প্রথম দুইটি দফা স্বায়ত্বশাষন ইচ্ছেকে প্রকাশ করে।

সুতরাং অসাম্প্রদায়িক চেতনার ইচ্ছেটুকু ঐতিহাসিক এই জাতীয় দলিলগুলোতে মৌনভাবে প্রকাশিত হয়েছে সেটি বলা বাহুল্য মাত্র। প্রশ্নটা আমি উপরেও করেছি এবং এখন আবারও করি যে অসাম্প্রদায়িক একটা সমাজ ব্যবস্থা যে স্বায়ত্বশাষন কিংবা স্বাধীনতার আন্দোলনের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং সে উপলব্ধি যে বাংলাদেশীরা পাকিস্তান গঠনের পর দীর্ঘ ২৪ বছর ধরেই করে এসেছে সেটি একজন বাংলাদেশীর চোখ এড়ায় কি করে?

আবার ১১ দফার উল্লেখিত দফাগুলো ভালো করে বিচার বিশ্লেষন করলে এটির উত্থাপনের প্রেক্ষাপট পরিষ্কার হবে। ৬ দফা আর ১১ দফা সম সাময়িক হলেও এবং ৬ দফার মূল ইচ্ছে ১১ দফায় সন্নিবেশিত হলেও ১১ দফা আরো অনেক বেশী বিস্তারিত আকারে এবং নতুন কিছু দাবী দাওয়াকে তুলে ধরার মাধ্যমেই উপস্থাপন করা হয়েছিলো।

এই ১১ দফায় যেমন একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক, গণতান্ত্রিক, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতিকল্পের দাবী ছিলো ঠিক একই ভাবে কৃষক সম্প্রদায় কিংবা পেশাজীবি সম্প্রদায়ের অধিকারকেও সুনির্দিষ্টভাবে বলবৎকরবারও সুস্পস্ট ইঙ্গিত ছিলো যা আমরা দেখি ১১ দফার ছয় এবং সাত দফার বক্তব্যে। সরল বক্তব্যে এটিকেও বলা যায় যে ১১ দফাও একটি দেশের শাষন্তান্ত্রিক কাঠামো কেমন হবে তার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্র কেমন হবে সেটি এই জাতীয় ম্যাটারিয়াল দাবী দাওয়ার ভেতর থাকেনা। থাকলে সেটি হয় অনুনয়।

৬ দফার ট্যাসিট উদ্দেশ্য নিয়ে পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুই নিজে বলেন-

অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বাংলাদশের চরিত্র হিসেবে থাকবার যে প্রবণতা এটা কোনো একক সিদ্ধান্ত নয়। এটা সম্মলিত মানুষের যৌথ চিন্তা। এই চিন্তা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কিংবা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষেত্রে পরিস্ফুটিত হবার একমাত্র পথ ছিলো শায়ত্বশাষনের মাধ্যমে আত্ননিয়ন্ত্রনের অধিকার আদায়ের পরবর্তী পথ পরিক্রমায়।

১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ ৬-দফা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য অবশ্য এই আলোচনার ক্ষেত্রে জরুরী। যেখানে তিনি বলেন-

আমার প্রিয় দেশবাসী ভাই ও বোনেরা, আমি পূর্ব পাকিস্তানবাসীর বাঁচার দাবীরূপে ৬-দফা কর্মসূচী দেশব্যাপী ও ক্ষমতাসীন দলের বিবেচনার জন্য পেশ করিয়াছি। শান্তভাবে উহার সমালোচনা করিবার পরিবর্তে কায়েমি স্বার্থবাদীদের দালালেরা আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা শুরু করিয়াছে। অতীতে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর নিতান্ত সহজ ও নায্য দাবী যখনই উঠিয়াছে, তখনই এই দালালরা এমনিভাবে হৈচৈ করিয়া উঠিয়াছেন। আমাদের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী, পূর্ব পাক জনগণের মুক্তি-সনদ একুশদফা দাবিযুক্ত নির্বাচন প্রথার দাবী, ছাত্র-তরুণদের সহজ ও স্বল্পব্যয়ে শিক্ষা লাভের দাবী, বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করার দাবী ইত্যাদি সকল প্রকার দাবীর মধ্যেই এই শোষকের দল ও তাহাদের দালালেরা ইসলাম ও পাকিস্তান ধ্বংসের ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করিয়াছেন।

মুজিবনগর সরকারের ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্র, দাবিনামা, কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক প্রকাশিত লিফলেট, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পত্রিকা বা প্রকাশনা, মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য, সাক্ষাৎকার, লেখা

পিনাকীদা ১১ দফা আর ৬ দফার পর পর উপরে উল্লেখিত (এই অংশের শিরোনামে) দলিলে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি হিসেবে চাক্ষুস দেখতে চেয়েছেন। এইভাবে আসলে দলিল ধরে ধরে অসাম্প্রদায়িক চেতনার মত এমন একটা ইন্ট্যাঞ্জিবল, একটা সুপ্ত দর্শন, ইচ্ছে বা আকাংখাকে চাক্ষুস দেখতে চাওয়ার মধ্যে কোথায় যেন একটা কৌতুক আছে কিংবা একটা শিশুসুলভ অভিব্যাক্তি আছে।

আমি তার মানে এটা বলছিনা যে এই চিন্তার ফিজিকাল প্রকাশের দরকার নেই। দরকার আছে এবং সেটা হয়েছেও। কিন্তু এই যে দলিল ধরে ধরে জিজ্ঞাসা এবং সবখানেই এটিকে টেক্সট আকারে দেখতে চাওয়া এটিতেই আমার ঘোর আপত্তি। এই ধরনের তাত্বিক আলোচোনা ও চিন্তায় খানিকটা বেমানান লাগে। তথাপিও বিতর্কের খাতিরে আমি সেটিকেও মেনে নিচ্ছি।

আমরা যদি মুজিব নগর সরকারের স্বাধীনতার ঘোষনা পত্রের দিকে তাকাই তাহলে দেখব সেখানে লেখা রয়েছে-

সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি যে ম্যান্ডেট দিয়েছেন সে ম্যান্ডেট মোতাবেক আমরা, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, আমাদের সমবায়ে গণপরিষদ গঠন করে পারষ্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে 

স্পস্ট আকারেই মুজিব নগর সরকারের স্বাধীনতার ঘোষনাপত্রে রয়েছে সাম্যের কথা, মানবিক মর্যাদার কথা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা। এই তিনটি উপাদানই অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে বর্ণনা করে। অসাম্প্রদায়িক চেতনার যে বিস্তারিত প্রকাশ ও আলাদা আলাদা ধাপ তার প্রতিটিই এই ঘোষনাপত্রের উল্লেখিত লাইনগুলোতে স্পস্ট।

সাম্যবাদ দর্শনটি এক অর্থে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যাবস্থাকেও নির্দেশ করে। ইনফ্যাক্ট মুক্তিযুদ্ধের চারটি ভিত্তির একটিই হচ্ছে সমাজতন্ত্র। এই বিষয়ে বাংলাদেশের অন্যতম প্রখ্যাত তাত্বিক ও দার্শনিক সরদার ফজলুল করিম তাঁর সমাজতন্ত্র-গণতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা প্রবন্ধে বলেন-

এই লেখাতেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলেন সরদার ফজলুল করিম। এই অসাম্প্রদায়িক চেতনা যে যুগ যুগ ধরে আমাদের চিন্তায় বিকশিত হয়েছে তারই অভিজ্ঞতালব্ধ প্রকাশ-

আবার আমরা যদি স্বাধীনতার ঘোষনা পত্রের শেষাংশে কিন্তু জাতীয় সংঘের একটা সদস্য রাষ্ট্র হতে হলে যে নিয়ব, বিধি বা এর নীতির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে হয় সেটিও কিন্তু এই ঘোষনা পত্রে রয়েছে।

এবার যদি জাতিসঙ্ঘের নীতি, বিভিন্ন চার্টার এগুলোকে পর্যালোচনা করি তবে জাতিসঙ্ঘের একটা বড় প্রিন্সিপালই হচ্ছে সকল সম্প্রদায় সেটি ধর্মের ভিত্তিতে হোক, জাতিগত ধ্যান ধারনায় হোক সবার প্রতি সুবিচার, সকলের অধিকার রক্ষার কথাই কিন্তু সেখানে বলা রয়েছে। সুতরাং সেইসব নীতির প্রতি আনুগত্য মানে খুব স্পস্ট ভাষায় নিজস্ব চিন্তা ও চেতনায় তা র‍্যাটিফাই করা, এডপ্ট করাই বোঝায়।রাষ্ট্র তার জন্মের সাথে সাথে সু-স্পস্টভাবেই এর অসাম্প্রদায়িক চরিত্রকেও এভাবে স্পস্ট করেছে।

সুতরাং উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে এই বিষয়ে আমার ব্যাক্তিগত অভিমত হচ্ছে স্বাধীনতার ঘোষনাপত্রে অসাম্প্রদায়িকতার চেতনা প্রসুত যে ধরনের চরিত্র রাষ্ট্র তার শুরুতেই ধারন করতে চেয়েছিলো সেটি সে জানান দিয়েছে তার আনুষ্ঠানিক প্রথম দলিলেই।

৭০ এর নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধুর যে বেতার ভাষন সেটি যেহেতু উপরেই দিয়েছি এবং সেখানে দলিল-দস্তাবেজ সহ স্পস্ট দেখিয়েছি যে রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক ভাবনা কি করে নির্বাচনী বক্তব্যে স্থান পেয়েছে, দেখিয়েছি কি করে তা রাষ্ট্রের চরিত্র হিসেবে অন্যতম ভিত্তি হয়ে থাকবে সেটির স্পস্ট নিদর্শন। সুতরাং আলোচনার এই স্থানে আর নতুন করে সেগুলোকে আবার বলবার প্রয়োজন দেখিনা।

৭০ এর নির্বাচনের প্রাক্কালে সামরিক শাষক আইয়ূব খান শাষনতন্ত্রের মূলনীতিতে কি কি থাকতে হবে এবং সেই প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক দলগুলো কোন কি গাইডলাইন মেনে চলবে সেটির একটি নীতি ঘোষনা করেন।

যদিও সে সময়কার ছাত্র-জনতা এমন বেঁধে দিয়ে, উদ্দিষ্ট করে মূলনীতির ঘোষনার তীব্র প্রতিবাদ জানায় তথাপিও বঙ্গবন্ধু বিচক্ষন রাজনীতিবিদের মত তাঁর লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হন। তিনি জানতেন যে সামরিক শাষনের সমাপ্তি এখন সবচাইতে জরুরী এবং এর মাধ্যমেই আসলে রাষ্ট্রের চরিত্রকে তিনি নির্ধারন করতে পারবেন। আয়ুইবের মূলনীতিগুলো ছিলো-

৭০ এর নির্বাচনী মেনিফেস্টোর কথাও অনেকেই বলেন যে এই মেনিফেস্টিতে নাকি অসাম্প্রদায়িক চেতনার কোনো নিদর্শনই ছিলোনা। অসাম্প্রদায়িক চিন্তার প্রতিফলন নাকি হয়নি। এই ক্ষেত্রে আমি আওয়ামীলীগের সে সময়কার নির্বাচনী মেনিফেস্টো টি-ই পুরোটা উঠিয়ে দিচ্ছি। এটা না বললে অত্যন্ত অপরাধ হবে যে এই অতি দুষ্প্রাপ্য দলিলটি আমাকে সংগ্রহ করে দিয়েছেন শ্রদ্ধেয় বড় ভাই এনায়েত উল্লাহ। তাঁকে আমি আমার গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

উপরে আমরা যে ডকুমেন্ট গুলো দেখলাম আয়ুইব খানের বেঁধে দেয়া শাসনতন্ত্রের মূলনীতির পরেও আওয়ামীলীগের ৭০ এর নির্বাচনের মেনিফেস্টোতে সকল ধর্ম ভিত্তিক, জাতি ভিত্তিক তথা স্কল সম্প্রদায়েরই অধিকার রক্ষার কথা সন্নিবেশিত রয়েছে। অসাম্প্রদায়িক চেতনার লালন যে দীর্ঘ সময় ধরেই সাধারন জনতা করে আসছে সেটি আইয়ুব খানের এই ধরে বেঁধে দেয়া মূলনীতি ছাপিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। এটি যে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক নেতাদের জ্বালার কারন হয়ে দাঁড়িয়েছিলো সেটির প্রকাশ আমরা পাই জামায়াতে ইসলাম, মুসলীম লীগের মত দলের নেতাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত বক্তব্যে।

১৯৭০ সালে আওয়ামীলীগ যে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র-ই গঠনে সচেষ্ট ছিলো তার প্রমাণ আমরা পাই স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর একটি বক্তব্যে। বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ ৭-৮ ই এপ্রিল চলা বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কাউন্সিল অধিবেশনে বলেন-

এই সময়ে জামাতের ধর্মীয় গুরু মওদুদী বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করে বলে-

কুখ্যাত রাজাকার, গনহত্যাকারী ও তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীও বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামীলীগের প্রতি বিষেদগারে মেতে ওঠেন-

এখানেও অত্যন্ত সুস্পস্ট হয়ে উঠেছে তৎকালীন সময়ে ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতির ফায়দা লুটবার। মুসলিম লীগ এবং জামায়াতের এই যে পাকিস্তানী ধারার রাজনীতি এবং এটির যে ব্যবহার প্রক্রিয়া সেটিকেই কিন্তু বাঙালী জাতীয়তাবাদে আলোড়িত মানুষ ঘৃণা করে এসেছে।আমি এ কারনেই বার বার আমার লেখায় টেনে এনেছি পুরো পূর্বের অভিজ্ঞতার কথা, পাকিস্তানের সাথে থাকবার ২৪ বছরের কথা। এই ত্যাক্ত আর বিরক্ত মানুষেরাই কিন্তু দাবী তুলেছে ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতিকে সম্পূর্ন ভাবে ত্যাগ করবার। উপরে সরদার ফজলুল করিম স্যারের খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবজার্ভশেনটি আসলে সত্যকার অর্থেই প্রাল মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মানুষের ইচ্ছেকে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করে।

এইসব তুমুল প্রোপাগান্ডার প্রেক্ষিতে ৭০ এর নির্বাচনী প্রচারণার সময় বঙ্গবন্ধু বলেন-

এই বক্তব্যের সাথে বঙ্গবন্ধুর আগের দর্শনটিকে সামনে তুলে ধরা যায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রটিকেই কেমন দেখতে চাইতেন বঙ্গবন্ধু?বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্নজীবনীতে লেখা কিছু বক্তব্য এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বক্তব্যতে বঙ্গবন্ধুর অভিজ্ঞতা আর সে প্রেক্ষিতে তাঁর যে আকাংখা পুরো পাকিস্তানকে ঘিরে সেটি বিশ্লেষিত হওয়া জরুরী। তিনি লিখেছেন-

বঙ্গবন্ধুর এই অবজার্ভেশন কতটা স্পস্ট করে দেশ গঠনে তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা তথা এটি-ই যে এই অঞ্চলের মানুষের আকাংখা সেটি। ৭০ এর নির্বাচনকালীন সময়ে জনসভা গুলোর বক্তব্য গুলোতেও তার প্রকাশ ঘটেছে বার বার।

১৯৭২ সালের ১০ ই জানুয়ারী বাংলাদেশে ফিরেই বঙ্গবন্ধু লক্ষ জনতার সামনে বলেন একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের কথা। তিনি সে ভাষনে বলেন-

বাংলাদেশে ফিরবার আগে যখন তিনি ভারতে বক্তৃতা দিয়েছিলেন সেখানেও লক্ষ জনতার সামনে তিনি তাঁর বিশ্বাস ব্যাক্ত করেন। বলেন সেক্যুলার বাংলাদেশের কথা। তিনি বলেন গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা।

দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা অসংখ্যবার তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতায়, বিবৃতি, ভাষনে উল্লেখ করেন। সে ভাষন, বক্তব্যগুলোকে আমি ছবি আকারে নীচে দিচ্ছি। সবগুলো ভাষনের এই বক্তব্যের সূত্র বঙ্গবন্ধুর ভাষনের উপর শুরুতে উল্লেখ করা বইটি। তারপরেও আমি সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ করছি কোন কথাটি কোন ভাষনে, কবে বলেছেন। এইসব বক্তব্যগুলোতে বার বার প্রতিফলিত হয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। বার বার স্পস্ট হয়েছে জনগণের সর্বোচ্চ চাওয়ার পূর্ণ রূপ হচ্ছে বাংলাদেশ সংবিধানে প্রনীত রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তিগুলো। সংবিধানে উল্লেখিত রাষ্ট্রীয়নীতি গুলো বাংলাদেশের মূল স্তম্ভ হিসেবেই বঙ্গবন্ধু বার বার বলে গেছেন। এক একটা ভিত্তিকে তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন, স্পস্ট করেছেন। আমি আগেই বলেছি ৭২ এর সংবিধান মূলত বাংলাদেশের জনতার যে তীব্র প্রত্যাশা তারই কাগজ কলমের বহিঃপ্রকাশ। তাজ উদ্দিন আহমেদ এই প্রসঙ্গে ১৯৭২ সালের ৩০ শে অক্টোবর সোমবার সংসদের অধিবেশনে বলেন-

বঙ্গবন্ধুর যে ভাষন আর তার বক্তব্যের কথা বলছিলাম সেগুলো নীচে ধাপে ধাপে দিয়ে দিচ্ছি। ১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ সালে আওয়ামীলীগের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে-

৭-ই জুন ১৯৭২ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভাষনে-

১৯ শে অগাস্ট ১৯৭২ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভাষনে-

১১ নভেম্ভর জাতীয় সংসদে সংবিধানের খসড়া অনুমোদন উপলক্ষ্য ভাষনে-

ঐ একই ভাষনে বঙ্গবন্ধু এটাই উল্লেখ করেন যে রাষ্ট্র পরিচালনার ৪টি স্তম্ভ যেখানে ধর্ম নিরপেক্ষতা অন্যতম, সেটি সাধারন জনতার আশা ও আকাংখার বহিঃপ্রকাশ-

১২ই অক্টোবর ১৯৭২ সালে বিভিন্ন শোক প্রস্তাব ও খসড়া সংবিধান নিয়ে আলাপ কালে বঙ্গবন্ধু আবারো বলেন ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা এবং এই চেতনার ভিত্তিমূলে যে রয়েছে জনতার সর্বোচ্চ আশা সেটিও তিনি ব্যাক্ত করেন জাতীয় সংসদে-


পরিশেষঃ

বক্তব্য এরই মধ্যে বেশ দীর্ঘ হয়ে গেছে। লেখার শুরুতে এতটা ইচ্ছে না থাকলেও কোন ফাঁকে এত দীর্ঘ লেখা হয়ে গেলো অনুধাবনই করতে পারিনি। ইনফ্যাক্ট যে বিষয় নিয়ে এই লেখাটা সেটি যে খানিকটা দীর্ঘ আলোচনার দাবী রাখে এটিও আসলে বাস্তবতা তবে ঐতিহাসিক আলোচনার প্রেক্ষাপট হলেও পাঠক কিংবা পাঠিকা কতটা মনসংযোগ ধরতে রাখতে পারবেন এই লেখার ক্ষেত্রে সেটির ভার আমি তাঁদের উপরেই ছেড়ে দিচ্ছি। তবে শেষ করবার আগে কয়েকটি বিষয় দিয়েই শেষ করতে চাই।

২০১৩ সালের ১ লা ডিসেম্বর পিনাকীদা ইউকে বেঙ্গলী নামে একটি অনলাইন পোর্টালে “বাংলাদেশ ও সাম্প্রদায়িকতাঃ একটি নতুন পাঠ ও বিশ্লেষন” শিরোনামে একটি কলাম লিখেন। কলামটি আমি বেশ মন দিয়ে পড়লাম এবং কিছু ব্যাপারে আমার প্রশ্ন জেগেছে। তিনি এই লেখার এক লাইনে বলেছেন-

মুক্তিযুদ্ধের পরে ‘বাঙালী’ প্রকরণ যে ‘সেন্স’ মেইক করার কথা ছিল, আমাদের রাষ্ট্রনায়কদের ঐতিহাসিক ভুলগুলোর কারণে সেটা আর হয়ে উঠতে পারেনি।


স্বাভাবিক ভাবেই আমার প্রশ্ন  আসে মুক্তিযুদ্ধের পরে বাঙালী প্রকরণ যে সেন্স মেইক করার কথা ছিলো বলে পিনাকীদা এখানে বলছেন সেটি আসলে কি? তিনি কোন সেন্স মেইক হবে বলে আশা করছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা তাঁর এই একই লেখার পরবর্তে অংশে যাই। সেখানে দেখি লেখা রয়েছে-

প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক, ‘বাঙালী’ পরিচয় ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে জাতি-রাষ্ট্র গঠনের পরও ‘বাঙালী’ প্রকরণ কেন নতুন রাষ্ট্রে ‘সেন্স’ মেইক করতে পারলো না? কারণ, বাঙালী পরিচয়ের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার উপাদান শাসকদের জন্য সবসময়েই বিপদ্‌জনক।

সেন্স মেইক করতে পারেনি বলে পিনাকীদার আফসোস এখানে উল্লেখযোগ্য। এতটুকু উপলব্ধি যদি আমি নিজেও করি তবে প্রশ্ন জাগে তাঁর লেখার শেষের লাইনটিতে। যদি সেন্স মেইক করতে নাই পারলো বলে তিনি মনে করে থাকেন তবে কি করে বাঙালীত্বের ভেতর শাষকেরা ধর্মনিরপেক্ষতার উপাদান খুঁজে পেয়ে শাষকেরা সেটিকে বিপদজনক ভাববে? তবে কি বাঙালী আসলে তাঁর নামের মধ্যে আসলে কোনো “সেন্স মেইক” করেছে? একটা সিগ্নেচার বহনে সক্ষম হচ্ছে?

যুক্তিতে ব্যাপারটা কিন্তু তা-ই দাঁড়ায়। আবার একই ভাবে প্রশ্ন করা যায় যে যে “সেন্স মেইক” করবার প্রত্যাশা ছিলো, মানে ধর্মনিরপেক্ষতার একটা সিগ্নেচার, এই পর্যন্ত পিনাকীদা যে চিন্তা করছেন, প্রত্যাশা করছেন, আকাংখা করছেন সেটি তিনি কেন করছেন? তিনি তো অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে প্রাক মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি তথা জনগনের আশা আকংখার যে মূর্ত ইচ্ছে ও সেটি ধারন করা একটা চরিত্র (যেটি আমি বার বার দাবী করেছি) সেটিকে উড়িয়েই দিচ্ছেন। উড়িয়ে দিয়ে তিনি আবার প্রত্যাশাও করে বসছেন? এই দর্শন কি কন্ট্রাডিক্টরী?

তিনি আবার বলেন-


সাম্প্রদায়িকতার অচলায়তন ভাঙ্গতে হলে এ-ভূখণ্ডের মানুষের বৃহত্তর ধর্মনিরপেক্ষ মহৎ আত্মপরিচয়ের উপাদানগুলোকে শক্তিশালী করা ছাড়া আর কোন সহজ পথ নেই। এই কাজটিই বাঙালী পরিচয়ের সকল প্রগতিশীল শক্তির প্রধান কর্তব্য হবার উপযোগিতা রাখে।

পিনাকীদা এটিই অনুধাবন করতে ব্যার্থ যে বাঙালী বরাবরই ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাকে তাঁর রাষ্ট্রিক ফ্রেম গঠনের চিন্তায় স্থান দিয়েছে আর সেক্ষেত্রে অসাম্প্রদায়িক চেতনারও বিকাশ ঘটেছে এই রাষ্ট্রে।

ফলাফল হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি স্তম্ভের ভেতর একটি স্তম্ভ হচ্ছে ধর্ম নিরপেক্ষতা। এটি যেমন আজও আছে তেমনি আগেও ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই জাতীয়তাবাদে উজ্জীবিত বাঙালী-ই বানিয়েছিলো এমন চমৎকার পোস্টার, হানাদারদের দিয়েছিলো এমন তীব্র অথচ চমৎকার স্পস্ট বার্তা।

মজার ব্যাপার হচ্ছে যদিও তিনি বলেছেন ২০১৩ সালে যে-

সাম্প্রদায়িকতার অচলায়তন ভাঙ্গতে হলে এ-ভূখণ্ডের মানুষের বৃহত্তর ধর্মনিরপেক্ষ মহৎ আত্মপরিচয়ের উপাদানগুলোকে শক্তিশালী করা ছাড়া আর কোন সহজ পথ নেই।

অথচ পিনাকীদাই এখন ধর্মনিরেপক্ষতা আর অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে বলছেন –

যেটি তার আগের লেখার সাথে এখনকার স্ট্যাণ্ডকে কন্ট্রাডিক্ট করে। দু’টোর মিনিং যদি আলাদাই হবে কিংবা সংগাও আলাদা হবে বলে পিনাকীদা মনে করছেন তবে কি করে সাম্প্রদায়িকতার অচালয়াতন ভাঙতে ধর্মনিরপেক্ষতার মহৎ আত্ন পরিচয়গুলোকে শক্তিশালী করে উঠাতে বলছেন তিনি? সূত্র কিন্তু একেবারেই মিলছে না।

পিনাকীদা আমাকে তাঁর পোস্টে বলেছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা মুক্তিযুদ্ধের পরের রচিত সংবিধানে থাকবে না। তিনি আমাকে এটি খুঁজতে ঐতিহাসিক দলিলের দিকে যেতে বলেছিলেন।

কিন্তু মুশকিল হচ্ছে সংবিধান যে দীর্ঘ সংগ্রাম আর জনতার আশার একটা ফলাফলের প্রতীক এটা পিনাকীদা মানতে চান না সংবিধানে সেটি গোটা হরফে লেখা থাকবার পরেও, লক্ষ লক্ষ জনতা এই সংবিধানকে ম্যান্ডেট দেবার পরেও।

আমাদের চিন্তার পার্থকটা বোধ করি এখানেই…



লেখায় ব্যবহৃত সহায়ক গ্রন্থঃ

১) বঙ্গবন্ধুর ভাষন, নভেল পাব্লিল্কেশন্স, [মিজানুর রহমান মিজান সম্পাদিত]

২) তাজউদ্দিন আহমেদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, মাওলা ব্রাদার্স ,ড মোহাম্মদ কামাল হোসেন

৩) তাজউদ্দিন আহমেদের সমাজ ও রাষ্ট্র ভাবনা, নির্বাচিত বক্তৃতা, প্রকাশকঃপ্রতিভাস

৪) অসমাপ্ত আত্নজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড

৫) সরদার ফজলুল করিম, শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ, কথা প্রকাশ

৬) পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, সৈয়দ মুজতবা আলী, একুশে পাব্লিকেশন্স

৭) শত বর্ষ পরে ফিরে দেখা ইতিহাস, বঙ্গভঙ্গ ও মুসলিম লীগ, ড নূরুল ইসিলাম মঞ্জুর, গতিধারা প্রকাশনী

৮) শতাব্দী পেরিয়ে, হায়দার আকবর খান রনো, তরফদার প্রকাশনী

৯) পলাশী থেকে একাত্তর, শাহাদত হোসেন খান,আফসার ব্রাদার্স

১০)বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিকথাম রইস উদ্দিন আরিফ, পাঠক সমাবেশ

১১) আমার দেখা রাজনীতির ৫০ বছর, আবুল মনসুর আহমদ, খোশরোজ কিতাব মহল

১২)যদ্যপি আমার গুরু, আহমদ ছফা,মাওলা ব্রাদার্স

১৩)লেনিন কেন জরুরী, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, নালন্দা প্রকাশনী

১৪) মূলধারা ৭১, মঈদুল হাসান, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড

১৫)আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, হুমায়ুন আজাদ,আগামী প্রকাশনী

১৬) আগরতলা মামলা ও আমার নাবিক জীবন, আব্দুর রঊফ, মীরা প্রকাশন

১৭) গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান

১৮)সমাজ চিন্তা ও সমাজ তাত্বিক মতবাদ, প্রফেসর ড এ এফ ইমাম আলি,নভেল পাব্লিশিং হাউস

১৯)বাংলাদেশের আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা, সফিউদ্দিন তালুকদার, কথা প্রকাশ

২০) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ, সরদার ফজলুল করিম, সাহিত্য প্রকাশ

২১) সাম্প্রতিক বিবেচনা, বুদ্ধি বৃত্তির নতুন বিকাশ, আহমদ ছফা,খান ব্রাদার্স এন্ড কোম্পানী

২২) জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান,আগামী প্রকাশনী (শেখ হাসিনা ও বেবী মওদুদ সম্পাদিত)

২৩) বঙ্গবন্ধু, ২য় বিপ্লবের রাজনৈতিক দর্শন, আবীর আহাদ, জ্যোৎস্না পাব্লিশার্স

২৪) নির্বাচিত প্রবন্ধ, আহমদ ছফা্‌, মাওলা ব্রাদার্স

২৫) দেশ ভাগ, ফিরে দেখা আহমদ রফিক, অনিন্দ প্রকাশ


অনলাইন যেসব উপাদান ব্যাবহার করেছি সেসবের লিংক লেখাতেই যেহেতু দিয়েছি তাই আর এই অংশে উল্লেখ করছিনা।

Facebook Comments

Comments

comments

SHARE
Previous articleTaking the New York Bar as a Foreign Lawyer
Next articleআন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের থিওরেটিকাল কাঠামো ও বাংলাদেশের ট্রাইবুনালঃ আইনী পর্যবেক্ষণ
উপরের প্রকাশিত লেখাটি আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনার ফলাফল। লেখাটি আপনার ভালো নাও লাগতে পারে, পছন্দ না-ও হতে পারে। আমার সাথে হয়ত আপনি একমত হবেন না কিন্তু আমি ধন্যবাদ জানাই আপনি এই সাইটে এসেছেন, আমার লেখাটি কষ্ট করে পড়েছেন আপনার সময় ব্যয় করে, এটিও পরম পাওয়া। সবার মতামত এক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। দ্বিমত থাকবে, তৃতীয় মত থাকবে কিংবা তারও বেশী মতামত থাকবে আবার সেটির পাল্টা মতামত থাকবে আর এইভাবেই মানুষ শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের চিন্তাকে খুঁজে ফেরে নিরন্তর। আর লেখাটি ভালো লাগলে কিংবা আপনার মতের সাথে দ্বন্দ্বের তৈরী না করলে সেটি আমার জন্য বড় সৌভাগ্য। আমি সেটির জন্য আনন্দিত। আপনাদের উৎসাহে, ভালোবাসাতে আর স্নেহেই এই লেখালেখির জগতে আসা। "নিঝুম মজুমদার" পাঠ শুভ হোক, আনন্দের হোক, এই চাওয়া। আপনার এবং আপনাদের মঙ্গল ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি সব সময়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY