জাতির পিতার হত্যাকান্ডের বিচার এবং শেখ হাসিনার ভূমিকা

0
1385
১৫-ই আগস্টের হত্যাকান্ডের পুরো বিবরণ যদি একের পর এক দৃশ্যের মত পড়া যায় তাহলে একজন সুস্থ এবং স্বাভাবিক মানসিকতার ব্যক্তি প্রচন্ড অসুস্থ বোধ করবেন এবং তাঁর বুকটি হাহাকারে পূর্ণ হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এত নিষ্ঠুর, এত ভয়াবহ কিংবা এত বেদনাময় হত্যাকান্ডের কোনো নজির অন্তত আমার দৃষ্টিতে নেই। আমাদেরই মত রক্ত মাংসের কিছু মানুষ, যারা সরকারী চাকুরী করত, যাদের হওয়া উচিৎ ছিলো সরকারের আজ্ঞাবহ, তারা কিভাবে বাংলাদেশ জাতির জনককে এইরকম নৃশংস ভাবে হত্যা করতে পারে এটা আমার কাছে আজও বিষ্ময়ের।
 
খুনীদের পরিকল্পনা, খুনের আগে তাদের একাধিক মিটিং এবং সেগুলোতে কি কি আলাপ হয়েছিলো সেসবের পূর্ণ বিবরণ আমি পেয়েছি দুটি বইয়ে। প্রথমটি ডক্টর মোহাম্মদ হান্নান এর “বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের ইতিহাস” এবং দ্বিতীয়টি এডভোকেট সাহিদা বেগমের “বঙ্গবন্ধুর দু’টি ঐতিহাসিক মামলার জেরা ও জবানবন্দী” বইতে।
আপনি যতই শক্তিশালী কিংবা দৃড় মানসিকতার ব্যাক্তি হয়ে থাকুন না কেন, বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পূত্র শিশু রাসেল কিংবা বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের অন্তত এই দুইজনকে হত্যা করবার আগের ঘটনা বা বক্তব্য আপনি যখন এই দুইটি বই থেকে জানবেন তখন আমি নিশ্চিত করে বলে দিতে পারি যে আপনি আপনার নিজের অজান্তেই কাঁদবেন। আপনার বয়স যতই হোক না কেন কিংবা আপনি যে রাজনীতিরই সমর্থন করুন না কেন, একজন সুস্থ আর স্বাভাবিক মানুষ হলে আপনি এই হত্যাকান্ডের পুরো বর্ণনায় হতভম্ব হয়ে পড়বেন।
 
৯ বছরের শিশু রাসেল বলেছিলেন, “আমি মায়ের কাছে যাবো। আমাকে মেরে ফেলবে না তো?”
 
মায়ের কাছে নেবার কথা বলে খুনীরা নৃশংস ভাবে এই ৯ বছরের নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করে। হত্যাকান্ডের পর দেখা যায় শিশু রাসেলের চোখ উপড়ে ফেলা আর মাথা ছিন্ন ভিন্ন। বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের একটু পানি খেতে চেয়েছিলো খুনীদের কাছে। খুনীরা সে পানির বদলে গুলি করে হত্যা করে শেখ নাসেরকে।
 
এই হত্যাকান্ডের সময়কালীন কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ঘটনা বর্ণনায় বঙ্গবন্ধু এবং বেগম মুজিবের সে সময় উচ্চারিত কিছু বক্তব্য ও কাজ বাঙালীর জন্য আজও গর্বের। যেমন, বঙ্গবন্ধুকে যখন মেজর মহিউদ্দিন নিয়ে যেতে আসলো, বঙ্গবন্ধু ঠিক সেসময়েও প্রচন্ড ধমক দেন এই কুলাঙ্গার সামরিক অফিসারকে, “আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস?” এই কথা বলে।
 
যে সময় বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারছিলেন ঘাতকেরা তাকে খুন করতে এসেছে, তিনি সে সময় প্রবল সাহসিকতায় খুনীদের জিজ্ঞেস করেছেন, মাথা উঁচু করে রেখেছিলেন। তখনও জাতির পিতার হাতে ছিলো তাঁর প্রিয় সেই তামাকের পাইপ।
 
এরপর যখন দোতলার সিঁড়ির নীচ থেকে বজলুল হুদা ও মেজর নূর আসছিলো বঙ্গবন্ধু তখনও হুংকার দিয়ে জিজ্ঞেস করেছেন “তোরা কি চাস?” ঠিক সেই মুহুর্তেও জাতির জনক সামান্য সেকেন্ডের জন্য ভয় পান নি এবং সেই মমতা ভরা কন্ঠে “তুই” করে এই খুনীদের জিজ্ঞেস করছিলো।
 
জাতির জনক প্রাণ বাঁচাবার জন্য মিনতি করতে পারতেন, তিনি হয়ত পালাবার চেষ্টা করতে পারতেন, প্রাণ বাঁচাবার জন্য কোথাও লুকোবার চেষ্টা করতে পারতেন। জাতির পিতা সেসব কিছুই করেন নি। বুক চিতিয়ে বরং তিনি প্রচন্ড ধমক দিয়েছিলেন খুনীদের। মৃত্যুর আগেও জাতির জনক মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন। খুনীদের কাছে তিনি পরাজিত হননি মানসিক ভাবে। এই অসীম সাহসী মানুষটি বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের মতই ছিলেন অবিচল।
 
বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখে হাহাকার করে উঠেছিলেন বঙ্গমাতা বেগম মুজিব। এই মহিয়সী নারী সে সময় প্রচন্ড দৃড় কন্ঠে বলেছিলেন, “মরতে হলে সবাই এক সাথে মরব। আমাকে এখানেই মেরে ফেল”। আমি যতবার এই কথা পড়েছি পুরো সাক্ষ্য আর জবানবন্দীতে ততবার এই মহান নারীর জন্য আমার মাথা নুয়ে এসেছে পরম শ্রদ্ধায়। একজন নারী মৃত্যুর কয়েক সেকেন্ড আগে এমন দৃড়তার সাথে কথা বলতে পারেন, এমন প্রচন্ড শক্তিতে কথা বলতে পারেন কিংবা স্বামীর সাথে সাথে তিনিও তাঁর সাথে যাবেন, এই ত্যাগ এই বলবার মানসিক শক্তি মানব সভ্যতায় হয়তবা এই ধরনের মুহূর্তে বিরল।
 
এই হত্যাকান্ড যেই মোশতাক, ফারুক, রশীদ, ডালিম, মহিউদ্দিন, কিসমত, আজিজ পাশা গং রা ঘটালো, যারা এই হত্যা করবার কথা সরাসরি ক্যামেরার সামনে অকপটে স্বীকার করলো এই খুনী আর কাপুরুষেরাই এই বিচারের কাঠগড়াতে এসে এই হত্যাকান্ড সংগঠনের কথা অস্বীকার করলো। এমনও যুক্তি এই খুনীরা দিয়েছে যেখানে তারা বলছে এটা নাকি রাজনৈতিক ভাবে তাঁদের হেয় করবার পায়তারা।
 
বাংলাদেশের পার্স্পেক্টিভে কত সহজ এসব বলা। আত্নস্বীকৃত খুনীরা কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলছে এটা রাজনৈতিক বিচার। এটা নাকি রাজনৈতিক আক্রোশ। বঙ্গবন্ধুর প্রধান খুনী ও পরিকল্পনাকারী মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান তার জবানবন্দীতে বলে,
 
“I declare to your honour in defence of my innocence in the case by stating that I am not involved in the incident and I am not holder of any such certificate so that I can be brought into this case on charge of the incident taking place in the morning of August 15,1975”
ওপেন টিভিতে স্বীকার করবার পরে কিংবা ওপেন ভাষনে যেই খুনী এক সময় স্বীকার করেছে বঙ্গবন্ধুকে খুন করবার কথা, সেই খুনী আইনের সামনে দাঁড়িয়ে বলে সে নির্দোষ আর নিষ্পাপ। কাপুরুষতার একটা প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ এটি।
আবার খুনী সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান তার জবানবন্দীতে কি লিখেছিলো? আসুন একটু দেখি।
“১৫ আগস্ট হত্যা সংক্রান্ত মামলায় মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জড়িয়ে আমাকে আসামী করা হয়েছে। আমি কোনো প্রকার হত্যাকান্ডের সহিত কখোনই কোনো প্রকারে জড়িত ছিলাম না

 
এই হচ্ছে কাপুরুষ খুনীদের আসল মানসিক অবস্থা। আর এরাই বঙ্গবন্ধুকে নানাবিধ কালিমায় লেপন করে খুন করেছিলো নৃশংস ভাবে।
বঙ্গবন্ধুর খুনের পর খুনীরা এবং সে সময়কার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানেরা রেডিওতে কি বলেছিলো কি বলেছিলো য়াসুন সেটি একবার শুনে নেই-

 
১৯৭৫ সালের ২৬ শে সেপ্টেম্বর খুনী মোশতাক তার অবৈধ ক্ষমতাবলে একটি অধ্যাদেশ জারি করে। সেই কুখ্যাত অধ্যাদেশের নাম ইন্ডেম্নিটি অধ্যাদেশ।[অধ্যাদেশ নাম্বার-৬৯২]। যেই অধ্যদেশের সারমর্ম হচ্ছে ১৫-ই অগাস্টের এই হত্যাকান্ড যারা করেছে তাদের কোনো বিচারের আওতায় আনা যাবেনা। সেই অধ্যাদেশটির একটি স্ক্যান কপি নীচে দেয়া হলোঃ
indemnity ordinance scanned
‌demnity Ordinance scanned-2
নীচে Full Text-ও দিয়ে দেয়া হোলো-

THE BANGLADESH GAZETTE

Extraordinary Published by Authority

Friday September 26, 1975

Government of the People’s Republic of Bangladesh
Ministry of Low, Parliamentary Affairs & Justice
(Law and Parliamentary Division)

NOTIFICATION Dhaka, the 26 September, 1975

NOTIFICATION
Dhaka, the 26 September, 1975

No. 692- Pub … the following ordinance made by the president of the People’s Republic of Bangladesh on the 26th September, 1975, is hereby published for general information:-

THE INDEMNITY ORDINANCE, 1975

Ordinance No. XIX of 1975

ORDINANCE

to restrict the taking of any legal or other proceedings in respect of certain acts or things done in connection with, or in preparation execution of any plan for, or steps necessitating, the historical change and the proclamation of Martial Law on the morning of the 15th August, 1975.

Whereas it is expedient to restrict the taking of any legal or other proceedings in respect of certain acts or things done in connection with or in preparation or execution of any plan for, or steps necessitating, the historical change and the proclamation of Martial Law on the morning of the 15th August, 1975:

And whereas parliament is not in session and president is satisfied that circumstances exist which render immediate action necessary;

Now, therefore, in pursuance of the proclamation of the 20th August, and in exercise of the conferred by clause (1) of article 93 of the Constitution of the People’s Republic of Bangladesh, the president is pleased to make and promulgate the following Ordinance:-

  1. Short title. This Ordinance may be called the Indemnity Ordinance, 1975.
  2. Restrictions on the taking of any legal to other proceedings against persons in respect of certain acts and thing …(a) Notwithstanding anything contained in any law, including a law relating to any defence service, for the time being in force, no suit, prosecution or other proceedings, legal or disciplinary, shall lie, or be taken, in before or by any Court, including the Supreme Court and court Martial, or other authority against any person including a person who is or has, at any time, been subject to any law relating to any defence service, for on account of or in respect of any act, matter or thing done or step taken by such person in connection with, or in preparation or execution or any plan for, or as necessary step towards, the change of Government of the People’s Republic of Bangladesh and the proclamation of Martial Law on the morning of the 15th August, 1975.

(b) For the purposes, of this section, a certificate by the president, or a person authorised by him in this behalf that any act, matter or thing was done or step taken by any person mentioned in the certificate in connection. With, of in preparation or execution of any plan for, or necessary step towards, the change of Government of the People’s Republic of Bangladesh and the proclamation of Martial Law on morning of the 15th August, 1975, shall be sufficient evidence of such act, matter or thing having been done or step having been taken in connection with or in preparation or execution of any plan for, or as necessary step towards, the change of such Government and the proclamation of Martial Law on that morning.

 

৬-ই এপ্রিল ১৯৭৯ সালে ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সংবিধানের ৪র্থ তফসিলের ১৮ নং অনুচ্ছেদে এই অবৈধ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ যুক্ত করে বাংলাদেশের সংবিধানকে কলংকিত করে তোলে। মূলত বাংলাদেশ সংবিধানকে খুনীদের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার জরা হয় সে সংশোধনীর পর থেকেই। আসুন ১৯৭৯ সালে প্রণীত সেই সময়ের সংবিধান থেকেই জেনে নেই কি লেখা ছিলো সেই অনুচ্ছেদে- 

“All amendments, additions, modifications, substitutions and omissions made in the Constitution during the period between 15 August 1975 and 9 April 1979 (both days inclusive) by any Proclamation or Proclamation Order of the Martial Law Authorities had been validly made and would not be called in question in or before any court or tribunal or authority on any ground whatsoever” 

শুধু তাই নয়, এই হত্যাকান্ডের সাথে যারা যারা সংযুক্ত ছিলো তাদের প্রত্যেককে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের বাইরে অন্যান্য দেশে বাংলাদেশের যতগুলো দূতাবাস রয়েছে সেগুলোতে উচ্চ পদে এদের চাকুরী দেয়। জিয়ার পরে এরশাদও সেসব চাকুরী বহাল রাখে কিংবা কারও কারো ক্ষেত্রে কেবল ট্রান্সফার করবার মধ্যে ঐ একই ধারা বজায় রাখে।
 
বঙ্গবন্ধু ও তাঁর হত্যাকান্ডের বিচার যখন শুরু হয় দীর্ঘ ২১ বছর পর সেসময় এই বিচার যাতে সুষ্ঠূভাবে না হয় তখন বি এন পি একের পর এক হরতাল ডাকতে শুরু করে, ভাংচুর আর অগ্নিসংযোগ করে। একটা পর্যায়ে তারা এই নিন্দা প্রস্তাবও আনে এই বিচারের ক্ষেত্রে। একটা রাজনৈতিক দল কতটা অসভ্য আর বর্বর হতে পারে সেটা বি এন পি কে না দেখলে কিংবা তাদের ইতিহাস পর্যালোচনা না করলে বুঝতে পারা যায়না।
 
যেদন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের রায় দেন বিচারক কাজী গোলাম রসুল সেদিন সারাদেশে সকাল সন্ধ্যা হরতালের ডাক দেয় বি এন পি। আদতে এই বিচার চলাকালীন সময়ে বি এন পি একটা কথাই বার বার প্রমাণ করেছিলো যে এই হত্যাকান্ডের প্রতিটি ধাপে ধাপে তাদের গুরু জিয়াউর রহমান জড়িত ছিলো।
 
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের ফলশ্রুতিতেই মূলত জিয়াউর রহমানের আজন্ম লালিত সাধ পরিপূর্ণতা পায় এবং সে বাংলাদেশের শাষন ক্ষমতা অবৈধভাবে লাভ করে। আর যেই খুনীরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে মূলত জিয়াকে এই দেশে রাজনীতি করবার সুযোগ করে দিয়েছিলো সেই ঘটনার পুরষ্কার হিসেবে আজও খালেদা জিয়া ও তার দল ১৫ ই অগাস্ট তার মিথ্যে জন্মদিন পালন করে।
 
এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের রায়ের দিন খালেদা জিয়াই সারা বাংলাদেশে হরতাল ডেকে তার স্বামীর আদর্শকে বজায় রেখেছিলো, এই খালেদা জিয়ার এক সময়ের সাগরেদ নাজমুল হুদা কিংবা জমির উদ্দিন সরকারকে দিয়ে বিবৃতি দিয়েছিলো যে এই বিচার নাকি সঠিক আইন মেনে হচ্ছেনা, এটা নাকি রাজনৈতিক প্রহসন।
 
পরিশেষে শুধু একটা কথাই বলব আজকে। সেটা হচ্ছে, বর্তমান ও বিচার চলাকালীন সময়ের প্রধাণমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকা।
 
বিচার যখন শুরু হয় তখন খুনী ফারুক রহমানের মা মাহমুদা রহমান এবং আরেক খুনী কর্ণেল শাহরিয়ার রশীদ খান বাদী হয়ে দুইটি রিট পিটিশান দাখিল করেন হাই কোর্টে। তারা ইন্ডেমনিটি অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে যে বাতিল করা হয়েছিলো ১২-ই নভেম্বর ১৯৯৬ সালে সেটির বিরুদ্ধে রিট করে।
 
১৯৯৭ সালের ২৮ শে জানুয়ারী বিচারপতি মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক এবং বিচারপতি এম এ মতিনের সমন্বয়ে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এই রিট খারিজ করে। আদালত ৮৭ পৃষ্ঠার একটা রায় দেন।
 
লক্ষ্য করে দেখেন যে ইচ্ছে করলেই সে প্রধানমন্ত্রী আইন, কানুন এগুলোর তোয়াক্কা না করেই এই খুনীদের প্রকাশ্য রাস্তায় ঝুলিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারতেন। অতীতে আমরা দেখেছি জিয়াউর রহমান কিভাবে অবৈধভাবে কর্ণেল তাহেরের বিচার করেছে ৭ দিনে কিংবা একজন পঙ্গু লোককে ফাঁসী দিয়েছে। বাংলাদেশের আইন কানুন বা ট্রেন্ড বিচার করলে প্রধান্মন্ত্রী তাঁর পিতা হত্যার এই শোধ নানানভাবেই নিতে পারতেন।
 
কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য যে তিনি বরাবরই এই বিচারের ভার আইনের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। একটা পুরো ক্ষমতার টার্ম প্রধানমন্ত্রী পার করেছেন ১৯৯৬ থেকে ২০০১। কিন্তু কখোনোই তিনি এই বিচার নিয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ করেন নি, তাড়াহুরো করেন নি কিংবা আইনকে প্রভাবিত করেন নি।
 
এই বিচারে কত কি হোলো। আপীলেট ডিভিশান বিভক্ত রায় দিলো, রায় ঝুলে রইলো, মাঝখানে তত্বাবধায়ক সরকার এলো, নতুন সরকার আসবার পরে ২০০৯ সালে গিয়ে এই দীর্ঘ বিচারের অবসান হোলো।
 
আমি আসলেই মুগ্ধ শেখ হাসিনার এমন ভূমিকায়। সরকার পরিচালনায় কিংবা নানাবিধ কার্যপরিচালনায় একজন সাধারন নাগরিক হিসেবে শেখ হাসিনার সমালোচনা করি নানা ক্ষেত্রে, নানান ভাবে তার অনেক মন্ত্রী অকার্যকর হলে আমরা প্রতিবাদ করি, প্রতিবাদ করি তাঁর নানান সিদ্ধান্ত ও নীতির। কিন্তু এই পার্টিকুলার বিচারটি তিনি যে সততা, যে পদ্ধতি কিংবা যেভাবে বিচারবিভাগের উপর সামান্যতম চাপ প্রয়গ ছাড়াই করেছেন সেটি আসলেই আইনের শাষন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রবে চিরকাল।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পুরো বিচারকালীন প্রক্রিয়ার একটি সংক্ষিপ্ত ক্রমান্বয়।
[সূত্রঃ ডক্টর মোহাম্মদ হান্নান এর “বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের ইতিহাস”]
BB1
234BB-3
১৯৯৮ সালে এই মামলার রায় দেয়া হলেও আসামীরা উচ্চ আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করে। পরবর্তীতে আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ এ মামলায় বিভক্ত রায় দেন৷ এর মধ্যে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. রুহুল আমিন ১০ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন৷ অপরদিকে সহযোগী বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ১৫ জনের মৃতু্যদণ্ড বহাল রেখে রায় প্রদান করেন৷ বিধি অনুযায়ী বিষয়টি একটি তৃতীয় বেঞ্চে পাঠানো হলে ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিমকে নিয়ে গঠিত একটি একক বেঞ্চ ১২ আসামির মৃতু্যদণ্ড বহাল রেখে অন্য ৩ জনকে খালাস দেন৷ এর মধ্যে কারাবন্দী সৈয়দ ফারুক রহমান, শাহরিয়ার রশীদ খান, বজলুল হুদা ও মহিউদ্দিন আহমেদ ২০০১ সালেই হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ-টু-আপিল দায়ের করেন৷ আরেক আসামি একেএম মহিউদ্দিন আহমেদকে ২০০৭ সালের ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশে ফেরত পাঠালে বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়৷ ওই বছরের ২৪ জুন তিনি জেল আপিল করেন৷ ৯ বছর ৭ মাস ১৬ দিন বিলম্ব মার্জনার জন্য মহিউদ্দিন আপিল বিভাগে আবেদন পেশ করেন৷ ২০০৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ তার আবেদন গ্রহণ করে তাকে লিভ-টু-আপিল দায়েরের অনুমতি দেন৷[সূত্র]
এই সময়কালীন মামলার কার্যক্রম সেক্ষেত্রে দাঁড়ায়-
২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর_ হাই কোর্ট বেঞ্চ ২৪ দিনের শুনানি শেষে বিভক্ত রায় প্রদান করেন৷ বিচারক এম রুহুল আমিন অভিযুক্ত ১৫ আসামীর মাঝে ১০ জনের মৃতু্যদণ্ডাদেশ বজায় রাখেন৷ কিন্তু অপর বিচারক এবিএম খায়রুল হক অভিযুক্ত ১৫ জনকেই সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করেন৷
২০০১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী_ বিভক্ত রায় প্রদানের ফলে মামলাটির ডেথ রেফারেন্স ও আপীল শুনানী দ্বিতীয় বেঞ্চের তৃতীয় বিচারকের কাছে স্থানান্তরের প্রয়োজন দেখা দেয়ায় এর শুনানী আরেকটি উচ্চ আদালতে শুরু হয়৷
২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল_ তৃতীয় বিচারক মোহাম্মদ ফজলুল করিম ২৫ দিন শুনানীর পর অভিযুক্ত ১২ জনের মৃতু্যদণ্ডাদেশ নিশ্চিত করেন৷
২০০৭ সালের ১৮ জুন_ যুক্তরাষ্ট্র সাবেক লেঃ কর্নেল একেএম মহিউদ্দিনকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে ৩বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেয়৷
২০০৭ সালের ২৩ আগস্ট_ রাষ্ট্রপক্ষের মুখ্য আইনজীবী আনিসুল হক সুপ্রিম কোর্টে সংক্ষিপ্ত বিবৃতি প্রদান করেন৷
২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর_ আপীল বিভাগের তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ ২৭ দিনের শুনানী শেষে ৫ আসামীকে নিয়মিত আপীল করার অনুমতিদানের লিভ টু আপীল মঞ্জুর করেন৷ [সূত্র]
বি এন পির শাষনামলে (২০০১-২০০৬) এই মামলা ঝুলে থাক। ২০০৮ এর শেষ দিকে আওয়ামীলীগ বাংলাদেশে সরকার গঠন করলে শেষ পর্যন্ত এই মামলাটি আবার নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আবার শুরু হয় এবং সকল চড়াই-উৎরাই শেষে সর্বশেষে আপীলেট ডিভিশান এই মামলার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত রায় দেন। এরপর মামলার পর্যায়ক্রমিক ঘটনাগুলোকে নীচে উল্লেখ করা হচ্ছে-
২০০৯ সালের ২৪ আগস্ট_ আপিল বিভাগ ৫ অক্টোবর আপীল শুনানী শুরুর তারিখ নির্ধারণ করেন৷
২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর_ মামলার চুড়ান্ত শুনানী আপীল বিভাগে শুরু শুরু হয়৷
২০০৯ সালের ১২ নভেম্বর_ ২৯ দিনের শুনানীর পর চূড়ান্ত আপীল শুনানি শেষ হয় এবং আদালত ১৯ নভেম্বর রায়ের তারিখ নির্ধারণ করেন৷
২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর_ বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চে হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রেখে মৃতু্যদন্ডপ্রাপ্ত ৫ আসামীর দায়ের করা আপীল আবেদন খারিজ৷  [সূত্র]
জাতির জনকের হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় (৪১৩ পৃষ্ঠা) যেটি আপীলেট ডিভিশান কতৃক প্রদত্ত, সেই রায়টি আমি সকল পাঠক ও পাঠিকার জন্য নীচে সংযুক্ত করে দিচ্ছি। 
Facebook Comments

Comments

comments

SHARE
Previous articleদুই ওয়াক্তের ব্যার্থ ধার্মিকঃ ভাতের নাম যখন অন্ন
Next articleStory of the "pale blue dot"
উপরের প্রকাশিত লেখাটি আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনার ফলাফল। লেখাটি আপনার ভালো নাও লাগতে পারে, পছন্দ না-ও হতে পারে। আমার সাথে হয়ত আপনি একমত হবেন না কিন্তু আমি ধন্যবাদ জানাই আপনি এই সাইটে এসেছেন, আমার লেখাটি কষ্ট করে পড়েছেন আপনার সময় ব্যয় করে, এটিও পরম পাওয়া। সবার মতামত এক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। দ্বিমত থাকবে, তৃতীয় মত থাকবে কিংবা তারও বেশী মতামত থাকবে আবার সেটির পাল্টা মতামত থাকবে আর এইভাবেই মানুষ শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের চিন্তাকে খুঁজে ফেরে নিরন্তর। আর লেখাটি ভালো লাগলে কিংবা আপনার মতের সাথে দ্বন্দ্বের তৈরী না করলে সেটি আমার জন্য বড় সৌভাগ্য। আমি সেটির জন্য আনন্দিত। আপনাদের উৎসাহে, ভালোবাসাতে আর স্নেহেই এই লেখালেখির জগতে আসা। "নিঝুম মজুমদার" পাঠ শুভ হোক, আনন্দের হোক, এই চাওয়া। আপনার এবং আপনাদের মঙ্গল ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি সব সময়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY