জঙ্গীদের একটি অডিও টেপঃ ইন্টারনাল বিরোধ চরমে

0
10134
প্রায় ৪৫ মিনিটের উপর একটি অডিও রেকর্ড শুনলাম দুইবার। মাঝখানে কিছুটা বিরতি দিয়ে। গলার ভয়েস শুনে চেষ্টা চালালাম দু’জনের বয়স কিছুটা আন্দাজ করবার জন্য, তাদের আঞ্চলিক একসেন্ট গুলো বুঝবার জন্য। এগুলো জাস্ট আমার নিজস্ব চেষ্টা, অন্য কিছু নয়। কখনো ব্যার্থ হয়েছি কিংবা কখনো নতুন ক্লু পেয়েছি। দেশের থেকে এত দূর থেকে আইন শৃংখলা বাহিনীকে যতটুকু সাহায্য করা যায় সেটাই চেষ্টা করি। এমন এক অবস্থায় এসে আমরা সবাই পৌঁছেছি যেখানে আমাদের শার্লক হোমস হওয়া ছাড়া বোধকরি অন্য আর উপায় নেই।
 
যে অডিও রেকর্ডের কথা বলছি সেটি পাওয়া যাবে এখানে। 

 
এই ভিডিওটি দুইজন জঙ্গীর। এই দুই জঙ্গী নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে আল কায়েদার বাংলাদেশ শাখার প্রতিনিধি হয়ে যেটিকে আমরা আনসার আল ইসলাম নামে বাংলাদেশে চিনি। যদিও তারা নিজেদের নামের ক্ষেত্রে “তাঞ্জিম আল কায়েদা” বলেই অভিহিত করছিলো। একটা সময় গিয়ে তারা নিজেদের আন্সার আল ইসলাম বলে এই অডিওতে বলেছে।
 
অনেকের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি যে আল কায়েদার বাংলাদেশী সংষ্করণ এই আন্সার আল ইসলাম হলেও বাংলাদেশে এদের সাথে আরেকটি গ্রুপ আছে যারা আবার আই এস এর সহযোগী। এদের নাম দাওলাতুল ইসলাম। এই দাওলাতুল ইসলামে আবার প্রচুর জে এম বি সদস্য কাজ করে। শুধু জে এম বি-ই নয় এই দাওলাতুল ইসলামে হিজবুত তাহরীর, জামাত, শিবির ইত্যাদি গোষ্ঠী থেকেও সদস্য রিক্রুট করা হয়েছে।
 
এই আনসার আল ইসলাম এবং দাওলাতুল ইসলাম বা আই এস, এই দুইটি দলের ভেতর এখন বিরোধ চরমে। আপনারা যদি ৪৫ মিনিটের পুরো অডিওটি শোনেন তাহলে পরিষ্কারভাবে তা বুঝতে পারবেন। আন্ডারগ্রাউন্ড এই দুইটি জঙ্গী দলের ভেতর এখন তীব্র ক্ষমতার লড়াই চলছে। কে কার থেকে বেশী খুন করে ক্রেডিট নিতে পারবে, কাদের নির্দেশিত হত্যাকান্ড সবচাইতে “ভালো” ও “কার্যকরী” এই বিষয় নিয়ে এখন এই দুইটি দল চরম প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
 
আগেই বলেছি আলোচ্য অডিওটি বানিয়েছে আনসার আল ইসলাম বা বাংলাদেশের আল কায়েদা। এরা পুরো অডিওটি তৈরী করেছে সাম্প্রতিক সময়ে গুলশান হামলার ব্যাপারে তাদের মূল্যায়ন ও সেটির প্রেক্ষিতে আলোচনা করবার জন্য যেখানে তারা প্রচ্ছন্ন ভাবে এই হামলা যে আসলে অকার্যকর, আই এস এর যে আসলে বুদ্ধি নেই, তারা শুধু নাম কামাতে চায়, ক্রেডিট নিতে চায় এই রকমের তীব্র সমালোচনা করেছে।
 
গুলশান হামলার বৈশ্বিক ভ্যালু নেই, বাংলাদেশে কোনো লাভ নেই, ওদের ৫ জন মারা পড়েছে, মারা পড়বার পর ওদের ছবি প্রকাশিত হয়েছে এসব নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে আনসার আল ইসলাম। অন্যদিকে এইসব আক্রমণের বিপরীতে তারা গর্ব করে বলেছে যে তাদের করা হত্যাকান্ড-ই হচ্ছে সর্বাধিক কার্যকর।
 
এই কার্যকর বলতে গিয়ে তারা বাংলাদেশে তাদের সংগঠিত ব্লগার হত্যাকান্ডের কথা হাসতে হাসতে বলেছে, কিভাবে ১৫ দিনের জন্য অভিজিৎ দা দেশে আসবার পর সেটা তারা বের করে ফেলেছে এবং তাঁকে খুন করেছে। অভিজিৎদা’র কথা বলতে গিয়ে তারা খুব আয়েশ করে আর পশুর মত হাসতে হাসতে বর্ণনা করেছে। খুনের বর্ণনা দিতে গিয়ে সেগুলোর ফাঁকে ফাঁকে তারা নিয়মিতভাবে আল্লাহর নাম জপেছে এবং “আল্লাহর রহমতে” তারা “ভালো” ও “বেটার” খুন করেছে বলে তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছে।
 
তারা তাদের অডিওতে বলেছে নিহত সমকামী অধিকার কর্মী জুলহাজ ভাই ও তনয় ভাইকে হত্যা করেছে তারা কলাবাগানের মত ব্যাস্ত এলাকায়। এমন একটা ব্যস্ত এলাকায় খুন করে এরা পালিয়ে গিয়েছে, কেউ ধরতে পারেনি এসব বলেও তারা প্রচন্ড রকমের গর্ব করেছে। 
এই কনভার্সেশনের একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হচ্ছে যে প্রগতিশীলরা যে সরকারকে আর বিশ্বাস করতে পারছেনা এবং তারা যে সরকারকে ব্লেইম দিচ্ছে বিচার করছে না বলে এই ব্যাপারটি আন্সার আল ইসলাম খুব উপভোগ করছে। তারা মনে করছে এই প্রগতিশীলদের সাথে সরকারের ডিভাইড এন্ড রুল ব্যাপারটা তৈরী করে নিয়ে আসতে পারাটা তাদের একটা সাফল্য।
 
চিন্তা করে দেখেন কি পরিমাণ ধূর্ত এদের নেতারা। এরা যেই উদ্দেশ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে সেটা এক কথায় ভয়াবহ। এই অডিও আলাপে বয়ষ্ক কন্ঠের যে লোকটি কথা বলেছে সে কথা বলেছে অত্যন্ত শুদ্ধ ভাষায়। তার কথা, শব্দ চয়ন শুনে মনে হয় এই লোক কোনো ইউনিভার্সিটির শিক্ষক কিংবা এমন এক যায়গায় কাজ করে যেখানে খুব পরিপাটি করে কথা বলতে হয়। বেশ গুছিয়ে শব্দ চয়ন করছে, ঘটনার ভেতরে কি হতে পারে, মিডিয়ার ভূমিকা, কোন মিডিয়া কি লিখেছে সেটি এই লোক তীক্ষ্ণভাবে নজরদারি করে তা তার কথা থেকেই ক্লিয়ারলি বুঝতে পারা যায়।
 
এদের বিষয়ে শুধু দেশী মিডিয়া নয়, বিদেশী মিডিয়া কি কি লেখে বা লিখছে সেটিও তারা নজরদারি করে এবং নিউ ইয়র্ক টাইমস বা ওয়াশিংটন পোস্ট কি লিখেছে তাদের ব্যাপারে সে খবরও তারা রাখে ও রেফারেন্স দেয়। আমার ব্যাক্তিগত ধারনা এই লোক কোনো ইউনিভার্সিটির সাথে যুক্ত (শিক্ষক) এবং একই সাথে আন্ডারগ্রাউন্ড লেভেলে ওয়াজ বা বয়ান দিয়ে থাকে। পুলিশ একটু খোঁজ করলেই এই লোককে বের করতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আর একে ধরতে পারলেই আন্সার আল ইসলামের একটা বড় চাঁই কে ধরা হবে বলে আমি মনে করি। এই লোকটাকে ধরতে পারলে আনসার আল ইসলামকে একতা বড় ধাক্কা দেয়া যাবে বলেও ধারনা করা যায়।
 
তাদের করা ব্লগার হত্যাকান্ড গুলোই যে আসলে সত্যকারের জেহাদ এই কথাটি বলে এরা আই এস এর আক্রমণের সাথে নিজেদের প্রতিটি খুন ভিত্তিক পর্যালোচনা করেছে এবং আই এস বা দাওলাতুল ইসলামের খুন নিয়ে হাসাহাসি করেছে দুই বক্তা মিলে। যেমন বিভিন্ন জেলাতে পুরোহিত বা ভিন্ন ধর্মীয় ব্যাক্তিদের হত্যা ইত্যাদিকে তারা মনে করেছে “এই সময়ে” অনুচিৎ এবং এতে করে নাকি তাদের যে প্রচার হয়েছে সেখানে ভাটা পড়েছে। দাওলাতুল ইসলাম এর আগেও রাজশাহী ইউনিভার্সিটির রেজাউল সিদ্দিকী স্যারকে হত্যা করেছিলো। সে সময় যদি কেউ ভালো করে লক্ষ্য করে থাকেন তাহলে দেখবেন যে এই আন্সার আল ইসলাম এই হত্যার বিরুদ্ধে বয়ান দিয়েছিলো। আনসার আল ইসলাম কোনোভাবেই আসলে চায়না যে একই দেশে দুই খুনী থাকবে। তারা চায় তাদের নির্দেশে সব খুন হবে এবং সেটি হবে তাদের স্ট্র্যাটেজি অনুযায়ী “বেছে বেছে”।
 
অডিওটি শুনলে আপনারা আরো পরিষ্কার ধারনা পাবেন যেটি হয়ত আমি খুব বিস্তারিত লিখিনি এখানে।
 
এই পুরো ব্যাপারটি থেকে যা বুঝা গেলো সেটি হচ্ছে এই আন্ডারগ্রাউন্ড দুটি মূল দল এখন বাংলাদেশে অপারেট করছে। এদের একটির নাম আনসার আল ইসলাম এবং অন্যটি দাওলাতুল ইসলাম। আনসার আল ইসলাম আল কায়েদার অনুসারী এবং দাওলাতুল ইসলাম আই এস এর। এরা দুই দলই বাংলাদেশে তাদের কর্তৃত্ব প্রকাশ করতে চাইছে এবং কে কার থেকে “বেটার” খুনে পারদর্শী সেটার প্রমাণ দেবার পাল্লা চলছে।
 
কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ নয়।
 
এই আনসার আল ইসলাম যে হেফাজতী ইসলামের সহমর্মী তা তাদের কিছু কথাতে খুব স্পস্ট। আনসার আল ইসলাম হেফাজতীদের সাথে একসাথে কাজ করে বা তাদের থেকে রিক্রুট করে, এমনটাও এই অডিও আলাপের মাধ্যমে আভাষ পাওয়া যায়।
 
তবে আজকে বাংলা ট্রিবিউনে একটি সংবাদ পড়ে খানিকটা ভ্রু কুঁচকেছি। সেটা হচ্ছে তামিম চৌধুরী নামে একজন জঙ্গী নাকি কল্যানপুরে এই দাওলাতুল বা আই এস দের মেসে নিয়মিত যাতায়াত করত। এখন ঘটনা হচ্ছে, এই তামিম হচ্ছে আনসার আল ইসলামের কর্মী, এমন একটা তথ্য-ই আমরা এর আগে পত্রিকার বিভিন্ন রিপোর্টে পুলিশের উদ্বৃতিতে দেখেছি। সুতরাং তামীম কেন তাদের রাইভাল দল দাওলাতুল ইসলামের ডেরায় যেত সেটা ক্লিয়ার না। তাহলে কি আনসার আল দাওলা এই দুইটি দল একসাথে এটাকের চিন্তা ভাবনা করছে নাকি এই তামীম আর আনসারের তামীম আলাদা ব্যাক্তি? দুটো সম্ভাবনাই আমি আপাতত রেখে দিচ্ছি।
 
কনভার্সেশন শুনে এটিও বুঝতে পারা যায় যে আনসার আল ইসলাম একসাথে মিলিত হয়ে অপারেশন করবার ডাক দিয়েছিলো যেটা দাওলাতুল ইসলাম শুনেনি। তারা নিজেরাই নিজেদের মত খুন করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
 
আমি আমার এই লেখাটি লিখেছি কয়েকটি উদ্দেশ্য নিয়ে।
 
প্রথম উদ্দেশ্য হচ্ছে এই আন্ডারগ্রাউন্ড দুইটি দলের ভেতর যে বিরোধ লেগে গিয়েছে ক্ষমতা নিয়ে সেটি প্রকাশ করবার জন্য। এদের ভেতর থেকে এক দল আরেক দলের ব্যাপারে পুলিশে ইনফর্ম করে ধরিয়েও দিতে পারে বলে অনুমান করি।
 
দ্বিতীয়ত, আমি অনুরোধ করব যে অডিওটি শুনে আপনারা কি এই দুই কন্ঠকে নিজেদের পরিচিত মনে করেন? কেউ কি একটু হলেও চিনতে পারেন যে এই কন্ঠ কার হতে পারে? হতে পারে আপনার খুব পরিচিত কাছের কেউ। যদি পরিচিত হয়ে থাকে তাহলে দয়া করে পুলিশকে জানান।
 
তৃতীয়ত, এই দুই বক্তার বক্তব্যের আঞ্চলিক টান শুনে কি অনুমান করা যায় এরা বাংলাদেশের কোন অঞ্চলের? বয়স কেমন হতে পারে? আপনাদের অনুমানের কথাও শেয়ার করতে পারেন।
 
আপনাদের যার যতটুকু মেধা আছে, সামর্থ আছে, শক্তি আছে সেটি দিয়েই চলুন আমরা জঙ্গীবাদ মোকাবেলা করি। আমাদের সাধারণ মানুষের একটু একটু সাহায্য নিশ্চই আমাদের প্রশাষনের কাজে লাগবে। এই দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাতে এগিয়ে নিতে পারি আমরাই, এই প্রজন্মের আমরা যারা বেঁচে রয়েছি। এই দেশটাকে সুন্দর করবার দায়িত্ব আমাদেরই।
 
 
Facebook Comments

Comments

comments

SHARE
Previous articleঅনু-পরমাণু
Next articleদুই ওয়াক্তের ব্যার্থ ধার্মিকঃ ভাতের নাম যখন অন্ন
উপরের প্রকাশিত লেখাটি আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনার ফলাফল। লেখাটি আপনার ভালো নাও লাগতে পারে, পছন্দ না-ও হতে পারে। আমার সাথে হয়ত আপনি একমত হবেন না কিন্তু আমি ধন্যবাদ জানাই আপনি এই সাইটে এসেছেন, আমার লেখাটি কষ্ট করে পড়েছেন আপনার সময় ব্যয় করে, এটিও পরম পাওয়া। সবার মতামত এক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। দ্বিমত থাকবে, তৃতীয় মত থাকবে কিংবা তারও বেশী মতামত থাকবে আবার সেটির পাল্টা মতামত থাকবে আর এইভাবেই মানুষ শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের চিন্তাকে খুঁজে ফেরে নিরন্তর। আর লেখাটি ভালো লাগলে কিংবা আপনার মতের সাথে দ্বন্দ্বের তৈরী না করলে সেটি আমার জন্য বড় সৌভাগ্য। আমি সেটির জন্য আনন্দিত। আপনাদের উৎসাহে, ভালোবাসাতে আর স্নেহেই এই লেখালেখির জগতে আসা। "নিঝুম মজুমদার" পাঠ শুভ হোক, আনন্দের হোক, এই চাওয়া। আপনার এবং আপনাদের মঙ্গল ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি সব সময়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY