কেন বাংলাদেশের মানুষ DGFI-কে ভয় পায়?

0
6121
যারা গুম থেকে ফেরেন তাঁরা আর কথা বলতে চান না আমার সাথে। তাঁরা ট্রমাটাইজ হয়ে রয়েছেন বলে আমাকে জানান, এখন কথা বলবার মত অবস্থায় নেই কিংবা কঠিন কিংবা শীতল টোনে বলে দেন আমাকে যে, “পত্রিকায় যে স্টেটমেন্ট আমরা দিয়েছি এটাই আমাদের কথা। এর থেকে বেশী কিছু বলবার নেই আমাদের”
 
অথচ তাঁদের গুম হয়ে থাকবার সময় তাঁদের নিয়ে প্রচুর লিখেছি এবং বলেছি। সাম্প্রতিক সময়ে গুম থেকে ফিরে আসা কয়েকজনের ব্যাপারে আমার এই অভিজ্ঞতা হয়েছে।
 
উপরের দু’টো প্যারাতে যা লিখেছি সেটি আপাতঃ দৃষ্টিতে এক ধরনের অভিযোগের মত শোনা গেলেও আদতে এটি আমার অভিযোগ নয়। আমি বুঝতে পারি কিংবা বলা যেতে পারে অনুমান করি যে আমার সাথে কেন তাঁরা কথা বলতে অনাগ্রহ বোধ করেন কিংবা কেন এড়িয়ে যেতে চান। ভদ্রতার জন্য হয়ত ফেসবুকে ব্লক করতে পারেন না। সেটি কাটিয়ে উঠলে হয়ত, তাও করবেন।
 
এই যে গুম থেকে ফিরে একটা তীব্র ভয়, সেটি কেন? সুনির্দিষ্টভাবে তাদেরকে গুম করবার পর কি হয়েছিলো কিংবা কি বলেছিলো কিংবা কেন তাঁদের গুম করা হয়েছিলো এই ব্যাপারগুলো জানবার অদম্য কৌতূহল আমাকে ভয়ংকর রকম টানে। আমার এইসব কৌতূহল মেটাবার জন্য গুম থেকে ফেরা ব্যাক্তিরা যে বসে নেই, সেটা মেনে নিতে না চাইলেও মেনে নিতে হয়।
 
একটা অদৃশ্য ভয়, একটা ধেয়ে আসা আতংকের যে রেশ সেটি আমি অনুধাবন করতে পারি এইসব গুম থেকে ফিরে আসা ভিকটিমদের কন্ঠে কিংবা লেখনীতে।
 
বাংলাদেশের গুম কেন্দ্রিক সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা ডি জি এফ আই,-এর নাম প্রবল ভাবে উঠে এসেছে বিভিন্ন গণ মাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
 
আমি গত প্রায় বেশ কিছু মাস ধরেই ডি জি এফ আই নিয়ে পড়াশোনা করছি, জানবার চেষ্টা করছি, বুঝবার চেষ্টা করছি। আমি অনুধাবন করবার চেষ্টা করছি যে এই সামরিক গোয়েন্দাবাহিনীর জব ডেস্ক্রিপশানটা আসলে কি? অর্থ্যাৎ এই বাহিনী ঠিক কি কাজ করেন, তাদের কাজ করবার আইনী জুরিসডিকশান টা ঠিক কোন পর্যন্ত, কি নিয়ে তাঁরা কাজ করেন ইত্যাদি।
 
এগুলো খুঁজতে গিয়ে মাঝে মধ্যে অথৈ সাগরে হাবু ডুবু খাই। কেননা ইন্টারনেট, পত্র-পত্রিকা ইত্যাদিতে এই বাহিনী সম্পর্কে যা জানা যায় সেটি অত্যন্ত কম। আর ব্যাক্তি পর্যায়ে জানবার চেষ্টা করাটা অনেকটা কচ্ছপের কানের কাছে তার মাথা বের করবার অনুরোধের মত। শক্ত খোলশ ছেড়ে এই সংস্থার ব্যাপারে কেউ কথা বলতে চান না। আর এই না চাইবার পেছনে যে ব্যাপারটি কাজ করে সেটি হচ্ছে এদের ব্যাপারে এক ধরনের প্রচন্ড ভয় কাজ করে সবার ভেতর।
 
ডি জি এফ আই-কে কেন মানুষ ভয় পায় কিংবা তাঁদেরকে কেন ভয় পাওয়া উচিৎ সেটি এখনো আমার বোধগম্য নয়। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে গুমের ব্যাপারে তাদের নাম উঠে এসেছে বলে আমরা এর কারন সম্পর্কে একটা ধারনা করতে পারি কিন্তু এটি তো প্রমাণিত নয়। সুতরাং ভয়টি কি অনেকটা সারাটি জীবনের অদেখা “ভূত”-এর ভয় নাকি অস্ত্বিত্বহীন “ডাইনী” র ভয় আমরা জানিনা।
 
তবে সাম্প্রতিক সময়ে মাননীয় প্রধান বিচারপতি জনাব সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ইস্যুতে ডি জি এফ আই-এর যে প্রবল মুভমেন্ট সেটির ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কেননা এই ইস্যুতে তাঁদের হেড কোয়ার্টারে গিয়ে আমাকেও হাজিরা দিতে হয়েছে গত ১০-ই সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইং তারিখে সকাল ১০ টায়।
 
সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ইস্যু ধরেই আমি হাতড়ে হাতড়ে অনেক কিছু খুঁজে পেলাম। যেমন ধরা যাক ২০১৭ সালের ১৬-ই মার্চ আপীলেট ডিভিশনের একটা রায় রয়েছে ডি জি এফ আই-এর বিরুদ্ধে। যেখানে আমরা দেখতে পাই স্পস্ট করে বলা রয়েছে যে, ১/১১ এর সময় অর্থ্যাৎ আধা সামরিক ও আধা বেসামরিক তত্বাবধায়ক আমলে ডি জি এফ আই অনেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাপ দিয়ে ও নির্যাতনের মাধ্যমে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার উপরে টাকা নিয়েছে এবং সেটি নিবন্ধিত সরকারী কোষাগারে জমা হয়নি। আমি যে মামলার কথা বলছি সে মামলাটির নাম হচ্ছে-
 
Bangladesh Bank vs Eastwest Property Developments (Pvt) Ltd and others
 
এই মামলাটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মাননীয় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে সর্বমোট ৪ জন বিচারপতির বেঞ্চে দেয়া হয়। যেখানে আরো ছিলেন মাননীয় বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, মির্জা হুসেইন হায়দার JJ.
 
এই মামলাটির রায় পড়লে অনেক অজানা তথ্য জানা যাবে এবং ডি জি এফ আই কেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহার উপরে ক্ষেপে রয়েছে বা তাদের এই প্রবল ক্ষোভের কারন কি, সেটার একটা প্রাথমিক কারন জানা যাবে বলে আমার বিশ্বাস।
 
তার মানে দাঁড়াচ্ছে ২০১৭ সালের মার্চের এই রায়টি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলীর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যাকে বাদ দিয়ে অন্য আলচনাগুলো করা যাচ্ছে না।
 
আর এরপর তো পার্লামেন্টের ১৬ তম সংশোধনী হাইকোর্ট ও আপীলেট ডিভিশান বাতিল করেই দিলো, সুতরাং সেটিতে যেহেতু সরকারী একটা ক্ষোভ ছিলো ফলে ডি জি এফ আই সেটিকে পিক করেছে, এটা বলা বাহুল্য। অনেকটা, “এইবার তোমাকে বাগে পেয়েছি” টাইপ।
 
গতকাল মিঠুন চাকমা নামে ইউ পি ডি এফ এর এই সদস্যকে প্রকাশ্য রাস্তায় খুন করা হয়েছে। আমার ফেসবুকে বিভিন্ন বন্ধুরা, বিশেষ করে তাঁরা, যারা পার্বত্য অঞ্চলের ঘটনাগুলো নিয়ে ভাবেন, বলেন কিংবা বাম ঘরানার রাজনীতি করেন তাঁদের মধ্য থেকে বেশ কিছু লেখা উঠে এসেছে মিঠুনকে নিয়ে।
 
আজ Amit Hill নামের আমার এক ফেসবুক বন্ধুর লেখায় দেখতে পেলাম মিঠুনের হত্যাকান্ড নিয়ে তিনি ডি জি এফ আই-কে সরাসরি দায়ী করছেন।
 
একটু আগেই দেখলাম মিঠুনের সন্তান, একেবারেই দুধের শিশু। আজ ছিলো তাঁর জন্মদিন। এই জন্মদিনের দিনই তাঁকে তাঁর বাবার খুন হয়ে যাওয়া মৃত দেহের সামনে আনা হয়েছে। প্রচন্ড হৃদয় বিদারক একটা দৃশ্য, সন্দেহ নেই। ছবিটি দেখতেই নানাবিধ যন্ত্রনা আমাকে ঘিরে ধরলো যেটি থেকে এই মুহুর্ত পর্যন্ত মুক্তি পাইনি।
 
পার্বত্য চট্রগ্রামের এই অংশ নিয়ে দীর্ঘদিন নানাবিধ সংগ্রাম চলেছে প্রাক ও পোস্ট মুক্তিযুদ্ধ পর্ব থেকেই। যদিও আমি পার্বত্য চট্রগ্রাম ইস্যুতে বেশ প্রচন্ড রকমের জাতীয়তাবাদী কিন্তু অমানবিক নই। এখানে সেনাবাহিনীকে এক তরফাভাবে যে ভিলেইন হিসেবে দেখানো হয়, বরাবর আমি এই ন্যারেটিভের বিপক্ষে। এই অঞ্চলের সংঘাতে রক্ত ঝরছে সবার। সেনাবাহিনী, পাহাড়ী, শান্তি বাহিনী, ইউ পি ডি এফ কিংবা সেখানে বসবাসরত বাঙালীদের।
 
এগুলো নিয়ে আমার এক ধরনের অভিমত রয়েছে এবং অনেক বলবারও রয়েছে যেটি অন্যদিন হয়ত বলব কিন্তু আজকে বলবার বিষয় হচ্ছে কেন বার বার ডি জি এফ আই-এর নাম উঠে আসে? বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংঘাত থেকে শুরু করে যে কোনো ঘটনায় কোনো না কোনো ভাবে এই সংস্থাটির নাম বার বার উঠে আসছে।
 
এই সংস্থার নাম এইভাবে সরাসরি লেখাটাও অনেকে অত্যন্ত সাহসী কাজ বলে বলেন। ইনফ্যাক্ট আমি যে বার বার তাঁদের নাম লিখে কথা বলছি এটি নিয়েও আমার শুভাকাংখীরা আমাকে জানাচ্ছেন যে, আপনি কেন এদের নাম এইভাবে ডাইরেক্ট লিখছেন? কেন আপনি নিজের জীবন এইভাবে কন্টকময় করে তুলছেন?
 
অর্থ্যাৎ এই সংস্থাকে ভয় পেতে পেতে অবস্থা এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে এদের নাম ডাইরেক্ট লেখাটাও এখন এক ধরনের সাহসী কর্মকান্ড হিসেবে দেখা হয়। ইনফ্যাক্ট আমাদের দেশে সেনাবাহিনী বিষয়ক যে কোনো কিছু অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বলা হয়, লেখা হয়। অথচ আমি পৃথিবীর এত দেশ ঘুরে আর কোথাও দেখিনি যে সেনাবাহিনীকে মানুষ এত ভয় পায়।
 
একজন পুলিশ ধমক দিলে অনেক সময় আমি রাস্তায় মানুষকে সে ধমক শুনে হাসতে দেখেছি কিন্তু সেনাবাহিনী রাস্তায় নামলে মানুষ কেমন যেন হাসির বসলে প্রচন্ড ভয় পেতে থাকে। যে সি এন জি ওয়ালা কিংবা গাড়িওয়ালা ভদ্রলোক অন্য রাস্তায় ইচ্ছেমত গাড়ি চালান সেই একই চালকেরা জাহাঙ্গীর গেটের সামনে গেলে অন্যরকম হয়ে ওঠেন। তাঁরা তখন হয়ে ওঠেন একজন নিয়ম মান্যকারী নাগরিক, ভীত ও সন্ত্রস্ত চালক। আমার সব সময় এই একই অদম্য কৌতূহল, যে কেন এই সেনাবাহিনীকে এত ভয়? এই ডি জি এফ আই-কে এত ভয়? এরা কি আমাদের জনতা থেকে উঠে আসা কেউ নয়? নাকি তারা দূর দ্ব্বীপের কোন অধিবাসী?
 
অন্যের ভয়ের কথা কি বলব? নিজেরি একটা গল্প শোনাই। আমার নিজের কথার সাথে কন্ট্রাডীক্ট করলেও গল্প বলবার লোভ সামলাতে পারছিনা।
 
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মৌখিক পরীক্ষার দিন আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, ‘আপনি কেন সেনাবাহিনীতে জয়েন করতে চান? আমাদেরকে সত্য কারনটা বলেন। দেশ সেবা করব, হ্যান-ত্যান এসব না। সত্য কারন”
 
আমি অবলীলায় বলেছিলাম, “আমি চাই মানুষ আমাকে দেখলে ভয় পাক। আমি সেনাবাহিনীর পোষাক পড়ে দাঁড়িয়ে থাকব এবং আমাকে দেখে লোকে ভয় পাবে। সে কারনে আমি আর্মিতে জয়েন করতে চাই”
 
সেদিনের উপস্থিত আর্মি অফিসার ভদ্রলোকেরা ব্যাপক ভাবে হেসেছিলেন আমার উত্তর শুনে। শুধু ভয় দেখাবার জন্য একজন মানুষ আর্মিতে জয়েন করতে চায়, এটা খুব সম্ভবত একটা হাস্যকর ব্যাপার-ই। শুধু ডান দিকের চশমা পরা এক মেজর সাহেব বড় সন্দেহের দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণ ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। খুব সম্ভবত তিনিই মৌখিক পরীক্ষার একটা পর্যায়ে বলেছিলেন, “লইয়ারদের ছেলে পেলেদের আর্মিতে আসাটা ভয়ানক ব্যাপার। এরা মামলা টামলা করে দেয়…”
 
আজও আমি ভাবি যে, কেন আমি সেদিন বলেছিলাম সে কথা? কেন আমি চাইছিলাম ভয় দেখাতে? নিজের মাথার ভেতরের এই প্রশ্নই আমাকে ব্যাস্ত করে তুলেছে এখন।
 
আমি এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষিত, ডি জি এফ আই-এর ভূমিকা এসব নিয়ে এই যে লিখছি, বলছি কিংবা অনুসন্ধান করছি সেটি আমাকে ঠিক কোথায় নিয়ে যাবে, আমি জানিনা। আমি কি অতলে হারিয়ে যাব নাকি আরো গহীনের দিকে যাত্রা নাকি নতুন আলোর উন্মেষ এসব হয়ত সব সময় বলে দেবে কিন্তু একটি ব্যাপার আমার এখনো অজানাই রয়ে গেছে এখনো যে-
 
কেন বাংলাদেশ জলপাই রঙ্গের এই পোষাককে এত ভয় পায়? কেন এদের সামরিক গোয়েন্দাবাহিনী কে নিয়ে এত সন্দেহ? ভেতরে ভেতরে এত আতংক আর ঘৃণা?
 
এই সত্য জানতেই হবে…
 
[ Copy Right: Nijhoom Majumder, Also published in http://bit.ly/2F59IuU ]
Facebook Comments

Comments

comments

SHARE
Previous articleগবুচন্দ্র দেশের গাবিনা ও সৌমিত্র কুমার মিনহা
Next articleSynopsis of my upcoming book: Misuse of The Muslim Identity during the Trials Of 71’ War Criminals
উপরের প্রকাশিত লেখাটি আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনার ফলাফল। লেখাটি আপনার ভালো নাও লাগতে পারে, পছন্দ না-ও হতে পারে। আমার সাথে হয়ত আপনি একমত হবেন না কিন্তু আমি ধন্যবাদ জানাই আপনি এই সাইটে এসেছেন, আমার লেখাটি কষ্ট করে পড়েছেন আপনার সময় ব্যয় করে, এটিও পরম পাওয়া। সবার মতামত এক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। দ্বিমত থাকবে, তৃতীয় মত থাকবে কিংবা তারও বেশী মতামত থাকবে আবার সেটির পাল্টা মতামত থাকবে আর এইভাবেই মানুষ শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের চিন্তাকে খুঁজে ফেরে নিরন্তর। আর লেখাটি ভালো লাগলে কিংবা আপনার মতের সাথে দ্বন্দ্বের তৈরী না করলে সেটি আমার জন্য বড় সৌভাগ্য। আমি সেটির জন্য আনন্দিত। আপনাদের উৎসাহে, ভালোবাসাতে আর স্নেহেই এই লেখালেখির জগতে আসা। "নিঝুম মজুমদার" পাঠ শুভ হোক, আনন্দের হোক, এই চাওয়া। আপনার এবং আপনাদের মঙ্গল ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি সব সময়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY