এটি একটি গল্প হতে পারত

0
406

উৎসর্গঃ রাহীন কাদরীকে। রাহীন কাদরী নামে কেউ নেই এই পৃথিবীতে, অন্তত এই গল্প আমি যেই রাহীন কাদরী ছদ্ম নামে লিখেছিলাম প্রথমে, পৃথিবীতে এই নামে কোনো গল্পকার নেই। তবুও এই লেখাটি রাহীন কাদরীকেই উৎসর্গ করা। মাঝে মধ্যে ভাবতে ভাবতে ভালোই লাগে রাহীন কাদরী নামে কেউ রয়েছে, যিনি দুঃখ দুঃখ গল্প লিখেন, কবিতা লিখেন…

নিউ মার্কেটের চার নাম্বার গেটে মীরাকে দেখে একবার ভাবলাম দৌড় দেই। পরক্ষণেই মনে হলো, দৌড় দেয়ার হয়ত দরকার নেই একেবারেই। আমার পরিচিত আত্নীয়রাই আমাকে চিনতে পারেনা আজকাল আর মীরার সাথে সম্পর্ক চুকেছে সেই কতকাল আগে। বছর পনেরো হবে কি? নাকি তার চাইতেও বেশী? আমার মনে পড়ে না। সময় বুঝি এই করেই যায়। আজ থেকে বছর পনেরো আগে এই আমিই কি মীরাকে একবার দেখার জন্য নির্ঘুম রাত কাটাতাম না? বড় রাস্তার মোড়ে কি তীব্র এক ধরনের আবেগ নিয়ে মীরার স্কুলে যাওয়া দেখার জন্য দুপরের রোদ গুলো, রোদের ঝাঁঝালো রশ্মিগুলো ধরে এগুতাম না? হাতের সিগারেট টা নিভে গেছে। আমি লক্ষ্য করিনি। নিজের অজান্তেই আমার মুখখানার এক দিকে একটি অযাচিত হাসি এসে যায়। ম্রিয়মান সে হাসি। তাচ্ছিল্যে ভরা। আমি ভাবি আর নিউ মার্কেটের চার নাম্বার গেটে দাঁড়িয়ে মীরার বাজার করা দেখি। গোল গোল মুখ করে দোকানীর সাথে মুলোমূলি করছে মীরা। পাশেই লাল ফ্রক পরা তিন-চার বছরের একটি মেয়ে। অবিকল মীরার মত দেখতে। ফর্সা, গোলগাল।

আমি যদিও নিঃসংকোচে দাঁড়িয়ে আছি, তারপরেও বুঝতে পারলাম আজ ১৫ বছর পরেও মীরাকে দেখলে বুকে সেই ব্যাথাবোধটা এখনো অদম্য। গত পনেরো বছরে যাযাবর হয়ে ঘুরেছি এই পৃথিবী। সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে কিয়েভ, কিয়েভ থেকে বুদাপেস্ট তারপর লিজবন,নেপোলী, বুখারেস্ট, ভিয়েনা। ফ্রাঙ্কফুর্টে একবার এক বিক্ষোভ মিছিলে অবিকল মীরার মত এক মেয়েকে বলেছিলাম, ‘তোমাকে আজ না দেখলে, আমার ভালই চলে যেত”, মেয়েটি অবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞেশ করেছিলো, “কেন?” আমি উত্তর না দিয়ে হাজার মানুষের স্রোতে মিশে গিয়েছিলাম সেদিন। সে রাতের প্লেনেই চলে গিয়েছিলাম বার্সিলোনা। আমার পুরোনো আস্তানায়।

ল্যুভ-এ মোনালিসার সামনে দাঁড়িয়ে বিদ্রুপ মিশ্রিত একটি কিদ্ভুত হাসি এসেছিলো আমার। মীরার খুব ইচ্ছে ছিলো, এই ছবিটার সামনে আমরা দাঁড়িয়ে থাকব হাতে হাত ধরে। সেদিন আমার সামনে মোনালিসা ছিলো, মোনালিসার সামনেও ছিলাম আমি। শুধু মীরা পাশে ছিলোনা। আমাকে দেখে মোনালিসাও কি খানকটা বিদ্রুপের হাসি হেসেছিলো? কি জানি…

আমি পুরোদস্তুর যাযাবর হয়ে গিয়েছিলাম। ইউরোপে শেষ দিকটায় শুধু মীরার কথা মনে হতো। মীরা, মীরা আর মীরা। কেমন যেন অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলো সব কিছু। মনে হচ্ছিলো ইউরোপের বাতাসে কে যেন বিষাক্ত সীসা মাখিয়ে দিয়েছে। ভেবেছিলাম মেলবোর্ন আমাকে দু’দন্ড শান্তি দেবে মীরার সেই প্রাচীন ব্যথা থেকে। দেয়নি। মেলবোর্ণের রৌদ্রকজ্জল রাস্তার প্রতিটি ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে যেন মীরা মিশে আছে। ক্যাফেতে, রেস্তোঁরায়, সরাই খানায়। কোথায় মীরা নেই? আমাকে একা করে হুট করে চলে যাওয়া মেয়েটি আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিলো অন্ধ চালকের মত। এতটা বুঝিনি কখনো… আহ মীরা… আমার মনে পড়ে, আমার একটা আঁকা পোট্রেট কিনেছিলেন কলারাডোর মধ্য বয়ষ্ক এক মহিলা। দারুন শীতের এক দুপুরে। আমাকে জিজ্ঞেশ করেছিলো, ছবির এই মায়াবতীর মত আসলেই এই পৃথিবীতে কেউ আছে কি না…আমি সযত্নে কঠোর হয়ে দূর্দান্ত মিথ্যে বলেছিলাম সেদিন। অস্ফুট স্বরে আমার মুখ দিয়ে বের হয়েছিলো, “না, কেউ নেই”

আহ জীবন…

* * * *

-রাশেদ!! তুমি?

আমি চমকে উঠি। আমার সারা শরীরে এক ধরনের কাঁপুনি এসে উপস্থিত হয়। এত দেশ, এত অভিজ্ঞতা, এত কষ্ট, এই একা হয়ে যাওয়া কোনটিই আমার ভেতর থেকে মীরাকে না চেনার ভান করতে শেখাতে পারেনি। আমার মুখে যেই পরিমাণ দাড়ি গোঁফের জঙ্গল, আমার মা-ই আমাকে চিনতে পারেন নি। মীরা ঠিকি চিনেছে।

আমি চুপ করে থাকি। উত্তর দেই না।

-একি হাল হয়েছে তোমার? তোমার এই অবস্থা কেন?

আমি হাসার চেষ্টা করি। মীরার সাথের বাচ্চা মেয়েটি আমাকে দেখে সম্ভবত ভয় পেয়েছে। কেমন যেন আতংক ছড়িয়ে পড়েছে তার মুখে। আমি মাথা নীচু করে বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে থাকি।

-আপনি ভুল করছেন। আমি রাশেদ নই।

-রাশেদ…

কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে আমাকে দেখে মীরা। একটি পাজেরো মীরার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। ড্রাইভার দরজা খুলে মীরার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। কান্নার আওয়াজ শোনা যায়। মীরার মেয়েটা কেঁদে উঠেছে। আমাকে দেখে ভয় পেয়েছে নিশ্চই।

আমি সাহস করে আর তাকাই না। পনেরো বছর আগে যা চলে গেছে, তাতো গেছেই। তাকালেই সেই পুরোনো দুঃখ। খুঁড়ে খুঁড়ে সেই পুরোনো যন্ত্রণা… কোন কবি যেন বলেছিলো একবার, “যাওয়া বলে কিচ্ছু নেই, সবই ঘুরে ফিরে আসা”।

কি দূর্দান্ত মিথ্যে কথা। এমন মিথ্যে হয়ত কবিরাই লিখে কেবল…কেন লেখে কে জানে…

Facebook Comments

Comments

comments

SHARE
Previous articleOur selective regrets & selective protests
Next articleঅনু-পরমাণু
উপরের প্রকাশিত লেখাটি আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনার ফলাফল। লেখাটি আপনার ভালো নাও লাগতে পারে, পছন্দ না-ও হতে পারে। আমার সাথে হয়ত আপনি একমত হবেন না কিন্তু আমি ধন্যবাদ জানাই আপনি এই সাইটে এসেছেন, আমার লেখাটি কষ্ট করে পড়েছেন আপনার সময় ব্যয় করে, এটিও পরম পাওয়া। সবার মতামত এক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। দ্বিমত থাকবে, তৃতীয় মত থাকবে কিংবা তারও বেশী মতামত থাকবে আবার সেটির পাল্টা মতামত থাকবে আর এইভাবেই মানুষ শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের চিন্তাকে খুঁজে ফেরে নিরন্তর। আর লেখাটি ভালো লাগলে কিংবা আপনার মতের সাথে দ্বন্দ্বের তৈরী না করলে সেটি আমার জন্য বড় সৌভাগ্য। আমি সেটির জন্য আনন্দিত। আপনাদের উৎসাহে, ভালোবাসাতে আর স্নেহেই এই লেখালেখির জগতে আসা। "নিঝুম মজুমদার" পাঠ শুভ হোক, আনন্দের হোক, এই চাওয়া। আপনার এবং আপনাদের মঙ্গল ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি সব সময়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY