আলম, ন্যান্সি কিংবা কেকাদের নিয়ে ট্রল করাটাই যৌক্তিক

0
7145

ফেসবুকে ট্রল করার পরবর্তী সময়ে ট্রল হওয়া ব্যাক্তির উপর ধুম করে আবেগের বন্যায় ভেসে যাওয়া নতুন নয়। এই আবেগের বন্যায় ভাসার ক্ষেত্রে বেশী কিছু লাগে না। প্রথমে কিছু মানুষ ট্রল করবে তারপর সে ট্রলের মধ্য থেকেই কিছু মানুষের তথাকথিত “বোধদয়” হবে। সেই বোধদয় থেকে আবেগের স্ফুরন বের হতে থাকবে। ট্রল হওয়া ব্যাক্তি “অনেক কষ্ট করে জীবন সংগ্রামে বড় হয়েছেন”, “অনেক গরীব থেকে তিনি এই পর্যন্ত এসেছেন”। এই কয়েকটি ব্যাপার হলেই আবেগের বন্যায় ভাসার জন্য হয়ত যথেষ্ঠ। আমি সবিনয়ে এই আবেগের এমন উদগীরন থেকে দূরে থাকতে চাই।

সাম্প্রতিক সময়ে হিরো আলম নামে এক অভিনেতার উদ্ভব হয়েছে। উদ্ভট ও হাস্যরসাত্নক ভাঁড়ামী পূর্ন কয়েকটি ভিডিও দেখেই মনে হয়েছে এই লোকটিকে নিয়ে হাস্যরস ছাড়া আর কিছুই করবার নেই। কেউ যখন নিজের অবস্থান বুঝতে অক্ষম এবং অভিনয় নিয়ে রীতিমত মশকরা করেন সেক্ষেত্রে তাঁকে নিয়ে মশকরাই হতে পারে সত্যকারের জবাব।

অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন হিরো আলম বগুড়ার তাঁর অঞ্চলের মানুষদের জন্য এই জাতীয় ভিডিও বানিয়েছেন, তাঁর টার্গেট অডিয়েন্স তো আরবান জনপদ না, তিনি কি আমাদের কে তাঁর ভিডিও জোর করে দেখতে বলেছেন? তাহলে আমরা কেন তাঁকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করছি? সাথে এও বলেছেন যে তিনি একজন সহজ ও সরল গ্রামের ছেলে, প্যাঁচ বোঝেন না তবে কেন তাকে নিয়ে এই ট্রল

এইসব প্রশ্নগুলোও আমার কাছে অদ্ভুত লাগে এবং অযৌক্তিক মনে হয়।

এটা ঠিক যে অপমান করা আর ট্রলের মধ্যে পার্থক্য আছে। ব্যাক্তিগতভাবে কাউকে অপদস্থ করা আর ব্যাক্তির হাস্যকর কর্মকান্ড নিয়ে ট্রল করা, এই দুইটি’র মধ্যে ফাইন লাইন আছে। এখন হিরো আলম বগুড়ার তার অঞ্চলের দর্শকদের জন্য এই ভিডিও বানিয়েছে, তোমার কি? এইসব প্রশ্ন করে বগুড়ার সেই অঞ্চলের মানুষকেই আসলে আমরা খুব আন্ডারমাইন করছি। বগুড়ার সে অঞ্চলের ব্যাক্তিদের রুচিবোধ কি এতটা খারাপ যে এই ভাঁড়ের এমন ভাঁড়ামো বসে বসে টিভিতে গেলেন? সামান্য রুচিবোধের অভাব কি সেই অঞ্চলের সবার? ইনফ্যাক্ট আলম নিজেই বলেছেন যে তাঁর অঞ্চলের অনেক ব্যাক্তিরাই আলমের এই ভিডিও দেখে হাসাহাসি করেছেন। তাহলে যে বলা হচ্ছে এই টার্গেট অডিয়েন্স সবাই না, সে কথা বলার মানে কি বা যুক্তিই বা কি?

আলম সহজ, সরল, জীবন সংগ্রামে রত এক ছেলে এইসব বলে আবেগের উদগীরণ ঘটাবার কিছু নাই। প্রতিটি মানুষই জীবনে সংগ্রাম করে। অল্প বা কম। কারোটা বেশী কঠিন, কারোটা কম কঠিন। সংগ্রাম সবাই করে। এই সংগ্রাম করে কিংবা দুস্থ অবস্থা থেকে নিজের অবস্থা পরিবর্তন করেছে এই জাতীয় কথা বার্তা বলে হাস্যকর কর্মকান্ডকে এমন বিনীত নয়ন দিয়ে দেখবার কিছু আছে বলে আমি অন্তত মনে করিনা। হাসির কাজ করঞ্ছেন সুতরাং আপনাকে নিয়ে হাসাহাসি করব এটাই আপনার অর্জন। সিম্পল। আর যেহেতু তিনি তাঁর ভিডিওতে কোথাও উল্লেখ করেন নি যে তাঁর ভিডিও শুধু বগুড়ার ওই উক্ত অঞ্চলের জন্য বা এটি সবার জন্য নয় সেহেতু আমি ধরেই নেবো যে তিনি এটা সবার দেখার জন্য তৈরী করেছেন। তিনি এখানে টার্গেট দর্শক কে চিহ্নিত করেন নি কিংবা তাঁর বক্তব্যে কখনো শুনিনি। বরং তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে তিনি সবার কাছে পৌঁছুতে চান। আর যিনি সবার কাছে এইসব ভাঁড়ামো দিয়ে পৌঁছুতে চান তিনি আদরের পিতলা ঘুঘু হয়ে কোলে কোলে ঘুরবেন এমন আশা করাটাই বোকামী। সবার অভিনয় রুচিবোধ তো আলমের মত না।

আমি নিঝুম গান পারিনা, অভিনয় পারিনা কিন্তু টাকার জোরে আমি অভিনয়ে নাম লেখালাম বা গানের এলবাম বের করলাম আর মানুষ আমার এই ইচ্ছে দেখে, আমার এই চেষ্টা দেখে হাত তালি দেবে, এমন আকাশ্চুম্বী আশা আমি বা কেন করব? আমার ওজন আমি না বুঝলে সেটা আমার না বুঝতে পারার সমস্যা, আমার অবজার্ভেশন ক্ষমতা না থাকার সমস্যা। এতে যারা হাসাহাসি করছেন তারা একদম ঠিক কাজ করছেন বলে আমি মনে করি।

এইসব বিষয়ে যারা পুঁজিবাদ, মধ্যবিত্ত সমাজের বিনোদন, সাম্রাজ্যবাদ, শ্রেণীবিদ্বেষ ইত্যাদি তত্বে আখ্যায়িত করেন, আমি মনে করি এই জাতীয় ব্যাক্তিদের নিয়ে আরো বেশী ট্রল করা উচিৎ। একটা ভাঁড়ের কর্মকান্ড দেখেও পন্ডিতি করবার উদ্দেশ্যে নানাবিধ তত্বে যারা চাউর করেন এবং আবেগায়িত করে ফায়দা নেন, মূলত তাঁরা ধূর্ত। নিজেকে অনন্য প্রমাণ করতে হলে যৌক্তিক কথা বলাতেই সেই প্রমাণ নিহিত, জোর করে একটা ভাঁড়ের পক্ষে কথা বলে নয়।

আলমের ডিশের ব্যবসা রয়েছে। এই ব্যবসা তিনি খুব পরিশ্রম করে দাঁড় করিয়েছেন। আমি আলমের এই ডিশের ব্যবসা ও তাঁর পরিশ্রমকে শ্রদ্ধা করি। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি হয়ত উল্লেখ্য কিন্তু অভিনয় না জেনে ভাঁড়ের মত তিন চারটা মেয়ে নিয়ে এসে অশোভন নৃত্য, হাস্যকর ডায়ালগ সমৃদ্ধ ফাজলামোকে যিনি টিভির পর্দায় নিয়ে এসেছেন তিনি বরংচ আমাদের এই ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াকে দূষিত করছেন। তাঁর অঞ্চলের একটা কিশোর বা কিশোরী যদি এই হাস্যকর কর্মকান্ড দেখতে দেখতে বড় হয় তাহলে সেটির সামান্য হলেও তার উপর প্রভাব পড়তে পারে। এই ব্যাপারটিও আমাদের মাথায় রাখা দরকার।

এখানে একটি কথা উল্লেখু যে আলম সাম্প্রতিক সময়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মুরগী মার্কায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন। পড়া নেই, লেখা নেই, রাজনীতি নিয়ে ভাবনার লেশ নেই ধুম করে চাইলেন আর তিনি মেম্বর ইলেকশনে দাঁড়িয়ে গেলেন। এসব কারনেই আমাদের রাজনীতির আজকে এই হাল আর যেই ব্যাক্তি ইলেকশান করবার চিন্তা করেন তিনি সহজ সরল এক ফেরেশতা, কিছুই বোঝেন না এই কথা মি অন্তত বিশ্বাস করতে নারাজ।

আমরা চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা কিংবা এর মান নিয়ে কথা বলি অথচ বগুড়ার এই অঞ্চলে হিরো আলম যেমন অশ্লীল নাচ, গান আর হাস্যকর অভিনয় দিয়ে সে অঞ্চলে বিরুপ প্রভাব বিস্তার করছে সেটি নিয়ে বিজ্ঞজনের কথা নেই।

শুধু হিরো আলমই নয়, কয়দিন ধরে দেখছি ফারজানা ন্যান্সি নামের একটি মেয়ে গান গাইছেন। ফেসবুকে শেয়ার হচ্ছে খুব। তাঁকে নিয়ে ট্রল হচ্ছে খুব। হওয়াই উচিৎ। এই মহিলা কি গান গেয়েছে আর কি বলেছে সেসব শুনব কি, গানের দুই লাইন শুনেই মাথা ব্যাথা শুরু হয়ে গিয়েছিলো। দুইদিন পর নিশ্চই কেউ একজন দাঁড়িয়ে যাবেন। বলবেন ন্যান্সি সংগ্রাম করে উঠে আসা একজন নারী। তিনি হ্যান করেছেন, ত্যান করেছেন। ব্যাস আজকে যারা ট্রল করেছে তারাই তাঁর জন্য আবাগের সাগর ভাসিয়ে দেবেন। এই ভয়াবহ সঙ্গীত তখন তাদের কাছে মধুর বলে বিবেচিত হবে।

আজকে কেকা ফেরদৌসি নামের এক ভদ্রমহিলার রান্নার রেসিপি নিয়ে হাসাহাসি হচ্ছে। তিনি গরুর মাংশ দিয়ে লতি, নুডলস দিয়ে আচার কিংবা ফিরিনি বা সেমাই ইত্যাদি রাঁধেন। একটা রান্নার অনুষ্ঠানের যে পরিমিতি বোধ, যে রুচি এগুলো কিছুই এই ভদ্রমহিলার অনুষ্ঠানে নেই। হাস্যকর সব রেসিপি তিনি বানান এবং আমি নিশ্চিত এগুলো খেতেও খুব ভয়াবহ ও জঘন্য হয়।

দু’দিন পর কে জানে হয়ত কেকা ফেরদৌসীর নামে একটি আবেগের নৌকো ভাসানো হবে। কেকা ফেরদৌসী ইন দা ইয়ার এত সালে অমুক করেছেন, তমুক করেছেন। ব্যসা শুরু হয়ে যাবে জয় জয়কার। অখাদ্য সেই নুডলসের আচারের মত হাস্যকর কর্মকান্ড হয়ে উঠবে সবার প্রিয় রেসিপি।

আমি মনে করি যিনি যে কাজ করবেন তাঁর ট্রিটমেন্ট তেমনই হওয়া উচিৎ। গান গাওয়া, অভিনয় করা কিংবা উদ্ভট রেসিপি যেহেতু ক্রাইম নয় সেহেতু শাস্তির একমাত্র উপায় সামাজিক ভাবে এদেরকে হাস্যকর করে তোলা। আর তাঁরা সে পথ থেকে ফিরে ভালো কাজ করলে করতালি।

শাকিব খানকে নিয়ে আমরা ট্রল করতাম। এখন দেখেন সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর “শিকারী” ছবির একটি গান দেখে সবাই কেমন প্রশংসা করছে। প্রশংসা করছে তাঁর অভিনয়ের, গেট আপের। ভালো করছে শাকিব তাই সবাই শাকিবকে উৎসাহ দিয়েছে। কিন্তু ঠোঁটে অতিরিক্ত লিপস্টিক দিয়ে জোকার সেজে হাস্যকর অভিনয় যতদিন করেছে ততদিন ট্রলের শিকার সে হয়েছে এবং এটাই যৌক্তিক লাগে আমার কাছে। তবে ভালো করবার চেষ্টা করলে তাঁর পাশে দাঁড়াতেও কিন্তু মানুষ ভোলেনি আর সেটা উচিৎও হোতো না।

এই লেখার উদ্দেশ্য একটাই, যিনি তাঁর নিজের অপারগতাকে স্বীকার না করে সে কাজটি করতে চাইবেন এবং ওই কাজটিকে অরুচিকর করবেন ও সেটি বুঝতে চাইবেন না তখন সেই কাজকে নিয়ে ঠাট্টা করবার অধিকার স্বংক্রিয়ভাবে জন্মে। আর এই এইসব উদ্ভট কাজকে আবেগে আবেগায়িত করে নানাবিধ তত্বে ঘটনা অন্যদিকে ঘুরাবার চেষ্টা করা যায় কিন্তু হাস্যকর কাজটি মানসম্পন্ন হয়ে যায় না।

Facebook Comments

Comments

comments

SHARE
Previous articleনিজামীকে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক ও আমাদের প্রাপ্তি
Next articleMassacre to mystery: who’s the bald headed man of the Artisan Bakery?
উপরের প্রকাশিত লেখাটি আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনার ফলাফল। লেখাটি আপনার ভালো নাও লাগতে পারে, পছন্দ না-ও হতে পারে। আমার সাথে হয়ত আপনি একমত হবেন না কিন্তু আমি ধন্যবাদ জানাই আপনি এই সাইটে এসেছেন, আমার লেখাটি কষ্ট করে পড়েছেন আপনার সময় ব্যয় করে, এটিও পরম পাওয়া। সবার মতামত এক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। দ্বিমত থাকবে, তৃতীয় মত থাকবে কিংবা তারও বেশী মতামত থাকবে আবার সেটির পাল্টা মতামত থাকবে আর এইভাবেই মানুষ শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের চিন্তাকে খুঁজে ফেরে নিরন্তর। আর লেখাটি ভালো লাগলে কিংবা আপনার মতের সাথে দ্বন্দ্বের তৈরী না করলে সেটি আমার জন্য বড় সৌভাগ্য। আমি সেটির জন্য আনন্দিত। আপনাদের উৎসাহে, ভালোবাসাতে আর স্নেহেই এই লেখালেখির জগতে আসা। "নিঝুম মজুমদার" পাঠ শুভ হোক, আনন্দের হোক, এই চাওয়া। আপনার এবং আপনাদের মঙ্গল ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি সব সময়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY