অনু-পরমাণু

0
932

উৎসর্গঃ ঘানার মরমী কবি মলা গোফরুমা কে। বড় দুঃখ নিয়ে যিনি কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন। ঠিক তার পর পর তিনি এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তাঁর কোনো প্রকাশিত গ্রন্থ ছিলোনা। আমার সাথে তাঁর পরিচয় লন্ডনে। তাঁর অপ্রকাশিত গল্প “এলিজি অফ মাইসেলফ” থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই গল্পটি লেখা।

এক

আমার কিছুই ভাল্লাগেনা। এই ধরনের একটি কথা আমার মাথায় বার বার আসলেও আমি ঠিক সে রকম করে বার বার বলতে পারি না। ভালো লাগা, না লাগা, মন খারাপ কিংবা ভালো নেই এই ব্যাপার গুলো একা একা মেনে নিতে ভাল্লাগে না। কাউকে না কাউকে বলতে ইচ্ছে হয়। বলাটা ঠিক কঠিন কিছুও নয়। মুখ দিয়ে খুব সহজেই এই কাজ টি করা যায়। কিন্তু আমার আশে পাশে সব মানুষ গুলোই এমন, যাদেরও কোন কিছুই ভাল্লাগেনা। সুতরাং মন খারাপ করার অতি জরুরী সংবাদটি কিংবা আমি ভালো নেই এই ব্যাপার গুলো আজকাল ঠিক জমে উঠেনা। তারপরেও আমার না ভালো লাগার ব্যাপারটি আমি কাউকে না কাউকে জানিয়ে দেই। আমার ভালো না লাগবার কথা শুনে আমার আশে পাশের মানুষগুলোর ঠিক তেমন ধরনের ভাবান্তর হয় না কিংবা তাদের চিন্তাগত তেমন একটা পরিবর্তন হয় না বলেই আমার ধারনা। কেবল মুখের অবস্থানগত একটা পরিবর্তন হয়। “ও আচ্ছা” জাতীয় বাক্যটি বলবার কারনেই কি না , কে জানে। আমি তাই আজকাল দীর্ঘক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি আর প্রায়ই ভাবার চেষ্টা করি এর শেষ কোথায়।

অর্থহীন ভাবনা তো বটেই।

আমার এপার্টমেন্ট ঘেঁসেই হাই স্ট্রীট ধরে প্রতিদিন অসংখ্য এবং গুনতে না পারার মত প্রচুর আর অচেনা মানুষ হেঁটে চলে যেতে থাকেন। তাঁদের সবারই মনে হয় আমার মত “ভাল্লাগেনা” জাতীয় কষ্ট নেই। সবাই কেমন করে যেন হাসতে হাসতে চলে যেতে থাকে। সে হাসিকে আমি প্রায়ই খুব আনন্দি, কম আনন্দিত, উচ্ছাসিত, উৎফুল্ল, এইসব মনগড়া ধারনা দিয়ে ঠিক-ঠাক করে নেই। আমি ঠিক ভেবে বের করতে পারিনা এইসব হাসির মূল অর্থ কি, আর কিই বা এমন কারন হলে মানুষ এমন করে হাসতে হাসতে সামনে চলে যেতে পারেন। এইসব হাসির পেছনের মূল অর্থকেই কি তবে আমরা সুখ বলে থাকি? কখনো সখনো আমি মানুষের এরকম আনন্দের রহস্য ভাবতে গিয়ে চূড়ান্ত কোন একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই। তখন হেঁটে চলে যাওয়া মানুষ গুলোর মতন আমারো নাকের নীচের কাটা অংশটা লম্বায় বেড়ে যায়। আমি যাকে ক্ষীণ হাসি বলে থাকি। আমার এই হাসির পেছনে, সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাবার একধরনের নিষ্ঠুর সুখ বড় বিন্যাস্ত ভাবে কাজ করতে থাকে।

কখনো আমার খুব ইচ্ছে হয় একদিন অপরিচিত কাউকে জাপটে ধরে জিজ্ঞেস করি, “ভাই আপনার ঘটনা কি?” ব্যস এইটুকুই।

কিন্তু আমি নেহায়েত একজন ভীতু মানুষ বলেই এই ধরনের চিন্তাগুলোকে কখনই খুব একটা পাত্তা দিতে পারিনা। সভ্য সমাজে বেঁচে থাকাটাই আসলে ভীষন একঘেঁয়ে, মন যা চায় তা ঠিক করা যায় না। পাশের ফ্ল্যাটে এক বয়ষ্ক কাপল থাকেন। আমার সাথে দেখা হলেই কেমন কাঁচুমাচু করে তাকান। একটা ভীত সন্ত্রস্ত অবয়ব বৃদ্ধের চোখে মুখে নিদারুন ভাবে ফুটে উঠে। আমি দেখতে অত্যন্ত কুৎসিত। এই বৃদ্ধ কে যতবার সামনা সামনি দেখি ততবারই আমার চেহারা সম্পর্কে আমি নিশ্চিত হই। মাঝে মাঝে আমার ইচ্ছে হয় গভীর রাতে বুড়োবুড়িকে ভয়ানক রকম ভয় দেখাই। এডগার এলেন পো’র গল্পগুলোর মতন। এইরকম একটা চিন্তা করে এক হ্যালোয়েনের উৎসবে আমি কয়েকটা মুখোশ কিনে এনেছিলাম। মুখোশ না কিনলেও চলত। রাতের আলোতে আমাকে ভয়াবহ দেখায়ত। অনেক আগে এক দূর্ঘটনায় আগুনে পুড়ে যাওয়া মুখের অংশবিশেষ আয়নাতে দেখে আমি নিজেই আঁতকে উঠি।

গভীর রাতে সে উদ্দেশ্যে দরজায় টোকাও দিয়েছিলাম। এরা “হালুম” শব্দের মানে বুঝবে কিনা এই সন্দেহ দূর না করেই মৃদু স্বরে “হালুম” বলেই খানিকটা থেমে গেলাম। আমার নিজেরই কেমন যেন ভয় ভয় করছিলো। তারপর আর সাহসে কুলোয় নি। পরদিন এম্বুলেন্সের ভয়ানক বিকট চিৎকারে ঘুম থেকে উঠে শুনি, দুই বৃদ্ধের একজন হাপিস। শ্বাস কষ্ট ছিলো নাকি বুড়োর। রাত তিনটার দিকে হাঁপানীর টান উঠেছিলো। মারা গেছে ভোর ছয়টার দিকে। কি করছিলাম আমি তখন? বিকট মুখোশ টা পরে হাত পা ঝাঁকিয়ে আমার ঘরে নাচছিলাম মনে হয়। খানিকটা হেলে দুলে।

বৃদ্ধের মৃত্যুটা আমাকে আরো বেশী সাহসী করে তুলেছিলো। এরই নাম ক্রুর হাসি কিনা জানিনা, তবে আমার বীভৎষ মুখ জুড়ে একটা জঘন্য হাসি লেগেছিলো। সপ্তাহের শেষ দিনগুলোয় বুড়িকে একা পেয়ে ভয় দেখানো যাবে, এই ব্যাপারটি আমাকে প্রবল আনন্দ দিচ্ছিলো। কিন্তু দেখা গেলো পুরোপুরি নিয়ম ভেঙ্গে বুড়ির বড় মেয়ে, বেকি (যার সাথে সব সময় একটা বিশাল গ্রে হাউন্ড থাকে) মাল পত্র নিয়ে বুড়ির সাথে থাকতে চলে এলো। সারাদিন সে কি হল্লা হাটি , হাসা-হাসি। তাদের এই আনন্দ, সুখ আমার ভাল্লাগতো না।

বেকি দেখতে খুব সুন্দরী ছিলো। বেকিকে আমি তার কুকুর গুলোর জন্য ভয় পেলেও, তাঁর জন্য আমার মনে একটা প্রেম জাতীয় জায়গা ছিলো। কি সুন্দর দেখতে বেকি। মোমের মুর্তির মতন। আমি কখনো দেখিনি বেকির বুক পুরোপুরি ঢাকা। উদার গলার জামা বেয়ে বেকির বুক দেখার লোভে আমি সবসময়ই বেকি কে নিরবে অনুসরণ করতাম। এই ধরনের পার্ভার্ট মানসিকতা নিয়ে আমার কোনো অনুশোচনা ছিলোনা। আমি কি বিষ্ময়কর কারনে জগতের যাবতীয় নোংরামো নিয়ে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম। কেন চেয়েছিলান বা কেন চাই সে কথা আমি নিজেও জানতাম না।

গভীর রাতে আমি যখনই বৃদ্ধার ফোন নাম্বারে ডায়াল করতাম, প্রতিবারই আমাকে ইংরেজীতে “পুটকির ফুটা” গালিটুকু শুনেই ফোন রাখতে হতো। কেননা ফোনে আমি কোন কথাই বলতে পারতাম না। একদিন আমাকে অবাক করে দিয়ে বেকি বলে উঠল, “ইজ ইট জ্যামশেড ?”। কি এক তীব্র আতংক আমাকে ঘিরে ধরেছিলো সেদিন। বেকি কি করে যেন বুঝে ফেলেছিলো সেদিন যে এটি আমি। এরপর অবশ্য আর কোনদিন ফোন করা হয় নি। ধরা পড়ে যাবার ভয়টা আমাকে সবসময় অনুসরণ করে চলত।

এখন অবশ্য আমি প্রায় রাতে ঢাকায় ফোন দেই। গভীর রাতে ফোন করে কোন কথা বলি না। বেশীর ভাগ সময় ভাইয়া ফোন ধরেন। ভাইয়া কলতাবাজার সাহিত্য পরিষদের সভাপতি। কি সুন্দর করে কথা বলে্ন। তাঁর কবিতার ভেতর কি চমৎকার, চমতৎকার শব্দ! কি অসাধারণ গল্প লেখেন ভাইয়া। অনেক মেয়েকেই দেখেছি মন্ত্র মুগ্ধের মত ভাইয়ার কথা শোনেন, ভাইয়ার জন্য পাগল। অথচ সে ভাইয়া ফোনের মধ্যে কি বিশ্রী করে “ কোন হাউয়ার পোলা রে” বলে গালি দেয়। এরকম একজন মানুষের মুখে “ হাউয়ার পোলা” শব্দটি ঠিক মেনে নেয়া যায় না।

যখন থেকে আমার বখে যাওয়া শুরু, সব আত্মীয়-স্বজন, মা (আমার বাবাকে আমরা কেউ দেখিনি , উনি কোথায় থাকেন মা আমাদের বলেন নি ) আমাকে দেখলেই যখন আঁতকে উঠত, সে সময় গুলোতেও ভাইয়া আমাকে ছেড়ে যান নি। প্রতিদিন একে তাকে মেরে-ধরে, চাঁদাবাজি করে যখন ঘরে ফিরতাম, ভাইয়া আমার ঘরে এসে তার নতুন লেখা কবিতা শোনাতেন। আমার বালিশের নীচে রাখা রিভলবার দিয়ে আমার প্রায়ই ইচ্ছে হতো ভাইয়াকে একটা বাড়ি দেই। এতটা সুখী হয়ে কি করে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে আমি ভাইয়াকে দেখে কোনদিনই শিখে নিতে পারিনি। একটা খুনের মামলায় ফেঁসে গিয়ে আমেরিকা আসার সময় এই ভাইয়াই শুধু আমার সাথে এয়ারপোর্টে এসেছিলো। ওইদিনই প্রথমবারের মত ভাইয়াকে আমি কাঁদতে দেখেছিলাম।

দুই এবং পরিশিষ্টঃ

সুখ ব্যাপারটা সম্পর্কে আজকে আমার ব্যাপক ধারনা হলো। অথচ এতটা বছর আমাকে কি সুতীব্র এক যন্ত্রনার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিলো। কি করে যেন সব জেনে গেছি টাইপ একটা বোধ আমার মধ্যে পোলয়েড কনার মত অবিরাম দৌড়ে যেতে থাকল। এখনো আমার এপার্টমেন্টটার নীচে তাকালে দেখা যাবে হাজার হাজার সব সুখী মানুষেরা বড় রাস্তাটি ধরে সামনে চলে যাচ্ছে। আগের মতন তাদের মুখ গুলো হাসি হাসি করে রাখা। শীত-গ্রীষ্ম , বর্ষা যাদের কখনই ছোঁয় না।

আমার মুখে একধরনের ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। আমি ধীরে ধীরে এ হাসির অর্থ বুঝে নিতে পারছি। আমি হয়ত আর বড় জোর ঘন্টা তিনেক বেঁচে থাকব। যে বিষ বস্তু আমার ভেতরে গেছে সে সম্ভবত আমার মতই অসুখী। হাজার চেষ্টাতেও আর ফিরে আসা যাবেনা। ধীরে ধীরে আমি নিস্তেজ হতে শুরু করেছি। ঠিক কতদিন পর আমার সৎকার হবে সে সম্পর্কে আমার কোন ধারনাই নেই। আমার লাশের গন্ধ ছড়াতে ঠিক কয়দিন লাগবে সেটিও আমি জানিনা। পুলিশ,এম্বুলেন্স কখন আসবে সে সবের কিছুই জানি না। অনেক পরিচিত-অপরিচিত কৌতূহলী মানুষ গুলোর মধ্যে নিশ্চয়ই বেকি থাকবে। ঠিক আগের মতন। ঈষ্যৎ বুক দেখা যাবে তার জামার ফাঁক ঘেঁসে।

অথচ তাকে বলাই হলো না আমি পৃথিবীর সমস্ত সুখ সাথে করে নিয়ে চলে যাচ্ছি…

Facebook Comments

Comments

comments

SHARE
Previous articleএটি একটি গল্প হতে পারত
Next articleজঙ্গীদের একটি অডিও টেপঃ ইন্টারনাল বিরোধ চরমে
উপরের প্রকাশিত লেখাটি আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনার ফলাফল। লেখাটি আপনার ভালো নাও লাগতে পারে, পছন্দ না-ও হতে পারে। আমার সাথে হয়ত আপনি একমত হবেন না কিন্তু আমি ধন্যবাদ জানাই আপনি এই সাইটে এসেছেন, আমার লেখাটি কষ্ট করে পড়েছেন আপনার সময় ব্যয় করে, এটিও পরম পাওয়া। সবার মতামত এক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। দ্বিমত থাকবে, তৃতীয় মত থাকবে কিংবা তারও বেশী মতামত থাকবে আবার সেটির পাল্টা মতামত থাকবে আর এইভাবেই মানুষ শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের চিন্তাকে খুঁজে ফেরে নিরন্তর। আর লেখাটি ভালো লাগলে কিংবা আপনার মতের সাথে দ্বন্দ্বের তৈরী না করলে সেটি আমার জন্য বড় সৌভাগ্য। আমি সেটির জন্য আনন্দিত। আপনাদের উৎসাহে, ভালোবাসাতে আর স্নেহেই এই লেখালেখির জগতে আসা। "নিঝুম মজুমদার" পাঠ শুভ হোক, আনন্দের হোক, এই চাওয়া। আপনার এবং আপনাদের মঙ্গল ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি সব সময়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY